উঙ্কো-খুশকো দীর্ঘ চুল। তাদের পা থেকে গলা পর্যন্ত কাঠ ও পুঁথির মালা প্যাচানো। এক হাতে তামার চুড়ি আর এক হাতে ত্রিশূল। তাদের পিছনে রয়েছে অনুরূপ বেশধারী কয়েকজন অনুচর। হিন্দু সাধু দলের গুরু আকাশের দিকে তাকিয়ে দু’হাত উঁচিয়ে চিক্কার করছে “লোক সকল! অপরাধের ক্ষমা ভিক্ষা করো! বিপদ ধেয়ে আসছে!!”
মানুষ তাকে ফেরাতে চেষ্টা করতো, থামাতে চেষ্টা করতো। কিন্তু কারো কথা তার কানে যায় বলে মনে হতো না। সে তার দু’হাত আকাশের দিকে উঠিয়ে কতগুলো হুশিয়ারবাণী উচ্চারণ করে আপন মনে হাঁটতে থাকতো আর বলতো, “হে শহরবাসী! পালাও, শহর ছেড়ে চলে যাও! আগুন, আগুন আসছে। পাথর…। আসমান থেকে পাথর পড়বে।”…
তার বলার ভঙ্গিটাই এমন ছিল, যেই তার কথা শুনতো, তার মনে ভয়ানক ভীতির সঞ্চার হতো। সাধারণ লোকেরা তার অনুসারীদের জিজ্ঞেস করতো, এই সাধু বাবাজী কোথেকে এসেছেন? তিনি কি বলেন? এ সবের অর্থ কি?” তার অনুসারীরা লোকজনকে বলছিল, “বাবাজী তিন চার মাস যাবত চুপচাপ ছিলেন। কোন কথাই বলতেন না। হঠাৎ আসমানের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন, “আসমান থেকে পাথর পড়বে… আগুন আসছে… ভগবানের বাহিনী আসছে!! পাপের প্রায়শ্চিত্ত করো, শহর ছেড়ে দাও।”
নিরূন শহর রাজা দাহিরের অধীনে থাকলেও এখানকার শাসক ছিলেন একজন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। রাজা দাহির কট্টর ব্রাহ্মণাবাদী ছিল। সে প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দীরগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। কিন্তু তারপরও সেখানে প্রচুর সংখ্যক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বসবাস করতো এবং তাদের মতো করে ইবাদত উপাসনা করতো। এমন জায়গার মধ্যে নিরূন ছিল একটি। এখানে ছিল যথেষ্ট সংখ্যক বৌদ্ধের বসবাস।
দিনে দিনে সারা শহর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল সাধু সন্ন্যাসীর ভবিষ্যদ্বাণী। লোকজনের মধ্যে দেখা দিলে ভয়ংকর ভীতি। সাধুর প্রচারিত কথা নিক্সনের শাসককে জানানো হলো। সন্ন্যাসী সাধুর প্রচারিত শঙ্কাবাণীতেও সারা শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। লোকজন ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। একথা শুনে নিরূনের শাসক সন্ন্যাসীকে তার সকাশে হাজির করার নির্দেশ দিলেন। তার সৈন্যরা সন্ন্যাসীকে তার দরবারে নিয়ে গেল।
শাসক সাধুকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি আশঙ্কা বাণী প্রচার করছে সন্ন্যাসী!”
“এসব কথা আমার নয়। আসমানী কথা। আসমান থেকে পাথর পড়বে, সাগরের তীর থেকে এক শক্তিশালী রাজা আসবে। আগুনের মতো সব তছনছ করে তারা অগ্রসর হবে। কেউ তাদের মোকাবেলায় টিকতে পারবে না।
তার পথ রোধ করলে আসমান থেকে পাথর নিক্ষিপ্ত হবে…।” “সন্ন্যাসী! তুমি কি আরব বাহিনীর কথা বলছো? যে বাহিনী কন্নৌজ দখল করে নিয়েছে?”
“আমি কন্নৌজ যাইনি। আমি দুনিয়ার কোন খবর রাখি না। আমরা জঙ্গলে থাকি। জঙ্গলের মধ্যে আমি আসমানী আওয়াজ শুনেছি।”
“সন্ন্যাসী মহারাজ! বললেন, নিরূনের শাসক সুন্দরী। আমার শহরের প্রতি আপনি কেন এতোটা দরদী হয়ে উঠলেন? আপনি কি অন্য শহরেও গিয়েছিলেন? অন্য কোন শহরেও কি আপনি এ সতর্কবাণী প্রচার করেছেন?”
“হায়! সব পাগল। রাজাও পাগল। শোন বোকা! আমি এ শহরে এসেছি এখানকার রাজা বৌদ্ধ বলে। বৌদ্ধ ধর্ম শান্তির ধর্ম। শ্রী গৌতম বুদ্ধ সাম্যের বাণী প্রচার করতেন, কোন সংঘাত সংঘর্ষে যেতেন না। তোমার মনে যদি শান্তি প্রত্যাশা থাকে, তাহলে আসমানী গযব থেকে প্রভুর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো। আমাদের কথা না মানলে নিজেও ধ্বংস হবে, শহরের বাসিন্দা এবং সকল সৃষ্টিকেও ধ্বংস করবে। তোমার মেয়েদেরকে জালেমরা কব্জা করে নেবে, শহরের কোন যুবতী নিরাপদ থাকবে না। খুনাখুনি হবে, লুটতরাজ হবে, আগুন জ্বলবে, আসমান থেকে পাথর পড়বে। শুভ কাজ করো, আসমানী গযব থেকে প্রভুর সৃষ্টিকে বাঁচাও, নিজেও শান্তিতে থাকো।”
বৌদ্ধরা শান্তি প্রিয়। যুদ্ধ বিগ্রহ, খুনোখুনিতে গৌতম বুদ্ধের ভক্তরা মোটেও আগ্রহী নয়। রাজা দাহির যেমন কট্টর ব্রাহ্মণাবাদী ছিল, নিরূনের শাসক সুন্দরী ততোটাই ছিলেন বৌদ্ধমতের প্রতি বিশ্বাসী। দাহিরের বৌদ্ধ পীড়ন এবং বৌদ্ধদের ধর্মালয় বিনাসের কারণে নিরূনের শাসক সুন্দরী রাজার প্রতি রুষ্ট ছিলেন। সন্ন্যাসী সুন্দরীর দরবার থেকে বিদায় হওয়ার পরই নিরূনে প্রবেশ করলো কয়েকজন হিন্দু বেশধারী উষ্ট্রারোহী। খুবই ছন্নছাড়া অবস্থা তাদের। এই উষ্ট্রারোহীরা লোকজনকে জানালো, “তারা কন্নৌজের বাসিন্দা। জীবন নিয়ে পালিয়ে এসেছে ওখান থেকে। তারা লোকজনকে মুসলিম সেনাদের ভয়াবহ আক্রমণের কথা শোনালো। জানালো এরা যখন কেল্লা অবরোধ করে, তখন আসমান থেকে বড় বড় পাথর বৃষ্টি হয়, সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়।”
মুসাফিরদের এই ভয়াবহ কাহিনী আগ্নেয়গিরির মতো মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়লো সারা শহরে। এমনকি শাসক সুন্দরীর কানেও গেল এদের কথা। অবশ্য এর আগেই রাজা দাহির নিরূনে দূতের মাধ্যমে খবর পাঠিয়েছে, “মাকরানে আরব সৈন্য অবতরণ করেছে। এই সৈন্য আগের মতো নয় অনেক বেশী সাহসী এবং খুব শক্তিশালী।
কন্নৌজ যখন বিন কাসিম দখল করে নিলেন, তখন দেশের সকল দুর্গে রাজা দাহির এই বলে পয়গাম পাঠালো, মুসলমানরা কন্নৌজ দখল করে নিয়েছে। তাদের কাছে দুর্গের ভিতরে পাথর নিক্ষেপক যন্ত্র রয়েছে। অবশ্য এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সবাই কেল্লাবন্দি হয়ে থাকবে। কেল্লার বাইরে গিয়ে কেউ যুদ্ধ করার চিন্তা করবে না।”
