মুহাম্মদ বিন কাসিম যে দিন মাকরান থেকে ডাভেলের উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনী নিয়ে রওয়ানা হলেন তখন তিনি দেখলেন মাকরানের শাসক বিন হারুনও অশ্বপৃষ্ঠে চড়ে এগুচ্ছেন। তিনি মাকরানের শাসককে আসতে দেখে ঘোড়া হাঁকিয়ে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। বিন হারুন ছিলেন খুবই অসুস্থ। “আমীরে মাকরান। আপনি অসুস্থ। এখন আপনি গিয়ে আরাম করুন। তিনি আমীরে মাকরানের কাছ থেকে বিদায় নেয়ার জন্য দু’হাত বাড়িয়ে দিলেন। আপনি আমার ও সেনাবাহিনীর জন্য দোয়া করুন। “তুমি কি দেখতে পাচ্ছো না আমি কোন পোশাকে এসেছি?” তোমাকে একাকী বিদায় করে আমি আরাম করতে পারি না।” বললেন আমীরে মাকরান মুহাম্মদ বিন হারুন। মুহাম্মদ বিন কাসিম ছিলেন বয়সে আমীরে মাকরানের ছেলের বয়সী। বহুবার নিষেধ করা সত্ত্বেও আমীরে মাকরান যখন বাড়িতে ফিরে যেতে সম্মত হলেন না, তখন বিন কাসিম তাকে সাথে নিয়েই রওয়ানা করলেন। মুহাম্মদ বিন কাসিমের গন্তব্য ছিল ডাভেল। কিন্তু পথিমধ্যে তাকে কন্নৌজ পেরিয়ে যেতে হবে। কন্নৌজপুর ছিল রাজা দাহিরের একটি শক্ত ঘাঁটি। শহরটির পুরোটাই ছিল দুর্গ ঘেরা। দুর্গপ্রাচীর ছিল যথেষ্ট মজবুত। ইচ্ছা করলে বিন কাসিম কন্নৌজ এড়িয়ে ডাভেল যেতে পারতেন কিন্তু দুর্গম এ শহরে রাজা দাহিরের যথেষ্ট সেনা সমাবেশ করার আশঙ্কা ছিল। যার ফলে বিন কাসিম এ শহরকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া সমীচীন মনে করেন নি। তাই কন্নৌজ দুর্গকে শত্রু মুক্ত করার জন্য দুর্গ অবরোধ করা হলো।
মুহাম্মদ বিন কাসিমের নির্দেশে তার এক ঘোষক কন্নৌজ দুর্গের সদর দরজার কাছে গিয়ে উচ্চ আওয়াজে ঘোষণা করলো, “দুর্গ আমাদের
কব্জায় ছেড়ে দাও, তাহলে শহরের বাসিন্দাদের জান-মালের নিরাপত্তা দেয়া হবে। আমাদের যদি দুর্গ কব্জা করতে হয়, তাহলে কারো জীবন সম্পদের নিরাপত্তার কোন দায় দায়িত্ব আমাদের ওপর থাকবে না। তখন আমাদেরকে কর দিতে হবে।” বিন কাসিমের ঘোষকের এ ঘোষণার জবাবে দুর্গপ্রাচীরের ওপর থেকে তীরবৃষ্টি নিক্ষেপ করা হলো। এর অর্থ হলো, শক্তি থাকলে দুর্গ দখল করে নিতে পারো, আমরা দুর্গ তোমাদের হাতে ছেড়ে দেবো না।” মুহাম্মদ বিন কাসিমের সেনারা অবরোধ অক্ষুন্ন রেখে দুর্গের প্রধান ফটকের দিকে অগ্রসর হলে দুর্গপ্রাচীরের ওপর থেকে বিপুল পরিমাণ তীর ও বর্শা নিক্ষেপ করা হলো। যারা প্রধান ফটকের দিকে অগ্রসর হয়েছিল তাদের কিছুসংখ্যক নিহত হলো। আর অধিকাংশই মারাত্মকভাবে আহত হলো। কয়েকবার দুর্গপ্রাচীরে ভাঙ্গন সৃষ্টির জন্য চেষ্টা করা হলো, কিন্তু প্রতিবারই মারাত্মক প্রতিরোধের মুখে পড়ে অধিকাংশ সৈন্য মারাত্মকভাবে আহত কিংবা নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। এমতাবস্থায় মিনজানিক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলো। সবচেয়ে বড় মিনজানিকটির ব্যবহার মোটেই সহজসাধ্য ছিল না। তাই ছোট ছোট মিনজানিক দিয়ে দুর্গের ভিতরে পাথর নিক্ষেপের সিদ্ধান্ত হলো। ঠিক করা হলো মিনজানিক। পাথর নিক্ষেপ শুরু হলো। কিন্তু দুর্গরক্ষীরা খুবই সাহসিকতার পরিচয় দিলো। মিনজানিক চালকদের বেকার করে দেয়ার জন্য প্রধান ফটক খুলে ঝড়ের মতো কিছু সংখ্যক অশ্বারোহী বেরিয়ে এসে দ্রুতগতিতে মিনজানিক পরিচালকদের ওপর তীরবৃষ্টি নিক্ষেপ করে আবার ঝড়ের বেগে কেল্লায় ফিরে যেতো। মুসলমান সৈন্যরা তাদের তাড়া করেও নাগাল পেতো না।
এভাবে টানা কয়েকদিন ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়া চললো। দুর্গপ্রাচীরে যেমন ছিল তেমনই রয়ে গেল। দুর্গবাসীদের মধ্যে তেমন কোন ভাবান্তর দেখা গেল না। মুহাম্মদ বিন হারুন অসুস্থ শরীর নিয়ে ঘোড়া হাঁকিয়ে দুর্গপ্রাচীরের চতুর্দিকে ঘুরে ঘুরে সৈন্যদের নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। বিন কাসিম প্রতিবারই তাকে তার তাঁবুতে বিশ্রাম নেয়ার জন্য অনুরোধ করতেন। কিন্তু বিন হারুন তাকে এই বলে নীরব করে দিতেন, “বাবা! তুমি আমার ছেলের বয়সী। আমি এ অবস্থায় তোমাকে ঠেলে দিয়ে আরাম করতে পারি না।”
দীর্ঘ একমাস কন্নৌজ দুর্গ অবরোধ করে রাখার পরও দুর্গবাসীদের মধ্যে পরাজয় বরণ করার কোন লক্ষণ দেখা গেল না। কন্নৌজে সবচেয়ে দুপ্রাপ্য জিনিস ছিল পানি। খোঁজ নিয়ে বিন কাসিম জানতে পারলেন দুর্গের ভিতরে পানিরও কোন সমস্যা এ যাবত দেখা দেয়নি। তার অর্থ ছিল দুর্গবাসীরা দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকার প্রস্তুতি আগেভাগেই সেরে নিয়েছিল। একদিন মুহাম্মদ বিন হারুন মুহাম্মদ বিন কাসিমকে বললেন, “বিন কাসিম! আমার মনে হয় এ দুর্গ সহজে জয় করা যাবে না। আমার মতে দুর্গপ্রাচীরে আংটা লাগিয়ে ওপরে ওঠার ব্যবস্থা করা উচিত। নয়তো প্রচণ্ড আঘাত করে প্রধান ফটক খোলার উদ্যোগ নেয়া দরকার। এখানে আর কতদিন বসে থাকা যায়।” “সম্মানিত আমীর! আমি অল্প সময়ের মধ্যেই এ দুর্গ জয় করতে পারি। কিন্তু এখানে আমি শক্তিক্ষয় করতে চাই না। কারণ সামনে আমার আরো কঠিন প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হবে। দেখা যাক না, এরা আর কতদিন অবরুদ্ধ জীবন কাটাতে পারে। দুর্গের রক্ষিত খাবার ও পানি এক সময় অবশ্যই শেষ হবে। আমি চাই, দুর্গবাসীরা পানি ও খাবারের অভাবে সৈন্যদের জন্য মুসীবত হয়ে উঠুক। ততোদিন আমি আমার সেনাদের সুরক্ষিত ও নিরাপদে সংরক্ষণ করতে চাই।
