“প্রিয় ভাতিজা বিন কাসিম! তোমার ওপর আল্লাহ রহম করুন। মনে হচ্ছে, বয়সের তুলনায় তুমি অনেক বেশী বুদ্ধিমান ও সতর্ক। শোন, আমার
ও আমার সাথীদের মনে বনী উমাইয়ার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ঘৃণা ও ক্ষোভ আছে। তুমি নিজেও তো উমাইয়া গোত্রের ছেলে ও ছাকাফী বংশের সন্তান।”
বিন কাসিম…তোমার চাচা হাজ্জাজ আমাদের সাথে শত্রুতা সৃষ্টি করেছে। সে আমাদের কবিলার এক সর্দার সুলায়মান আলাফীকে প্রথমে কয়েদ করেছে। অতঃপর তার মাথা কেটে আমাদের বংশের ছেলেদের হাতে নিহত মাকরানের গভর্নর সাঈদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল গভর্নরের স্বজনদের সন্তুষ্ট করার জন্য।”
“এসবই আমাদের গোত্রীয় শত্রুতা।” বললেন বিন কাসিম। কিন্তু আমি আপনাকে এমন এক দুশমনের কথা বলছি, যে দুশমনের কারণে আমরা পারস্পরিক শত্রুতা ভুলে বন্ধুতে পরিণত হতে পারি।” “এসব কথা আমাকে বলতে হবে না বিন কাসিম! তুমি এমনটি মনে করো
যে, খান্দানী শত্রুতার কারণে আমি চিহ্নিত শত্রুকেই বন্ধু বানিয়ে ফেলব” বললেন আলাফী। তোমার হতাশ হওয়ার কারণ নেই বিন কাসিম! আমি ধর্মীয় শত্রুকে আমার জাতির বিরুদ্ধে গিয়ে দোস্ত হিসাবে কোলে তুলে নেব না। আমি তোমাদের সহযোগিতা করবো বটে। তবে তোমাদের সঙ্গ দেবো না। একথা স্মরণ রেখো, আমাদের শত্রুতা শাসকদের সাথে আমার দেশ, আমার জাতি ও ধর্মের সাথে আমার কোন শত্রুতা নেই। অহংকারী ও জালেম শাসকদের বিরোধিতা করা গাদ্দারী নয়, বরং অযোগ্য ও অপরিণামদর্শী শাসকদের কব্জা থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করা দেশ প্রেমের অংশ। আমরা আমাদের শাসকদের বিদ্রোহী ঠিক; কিন্তু শাসন ব্যবস্থার বিদ্রোহী নই। আমরা তাদেরই প্রতিবাদ করেছিলাম, যারা শাসক হওয়ার যোগ্য ছিল না, অথচ জোর করে খেলাফতের মসনদ কব্জা করে রেখেছিল।” ঐতিহাসিক বালাজুরী লিখেন, এই সাক্ষাতে হারেস আলাফী বিন কাসিমের কথায় প্রভাবিত হয়েছিলেন। বিন কাসিমও হারেস আলাফীর আচরণে মুগ্ধ হয়েছিলেন। আলাফী বিন কাসিমকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি রাজা দাহিরকে কোন ধরনের সহযোগিতা করবেন না, বরং নেপথ্যে দাহিরের বাহিনীকে দুর্বল করার জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করবেন। তবে আলাফী একথা বলেননি কিভাবে তিনি রাজার বাহিনীকে দুর্বল করার জন্য চেষ্টা করবেন। একথাও তিনি জিজ্ঞেস করেননি, বিন কাসিম কখন কিভাবে কোথায় আক্রমণ করবেন। কারণ তাতে সংশয় ও সন্দেহ দানা বাধতে পারে, সৃষ্টি হতে পারে পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসের উপাদান।
এখানকার সেনাবাহিনী কতটা লড়াকু? আলাফীর কাছে জানতে চাইলেন বিন কাসিম। আসলেই কি এখানকার বাহিনী এতোটা সাহসী, যার ফলে এরা দু’বার আমাদের দুটি অভিযানের সেনাপতিদের হত্যা করেছে এবং শোচনীয়ভাবে তাদের কাছে আমাদের সেনারা পরাজিত হয়েছে?
“তুমি যদি এদের ওপরে তোমার ভীতি ছড়িয়ে দিতে পারো তাহলে সহজেই রাজার বাহিনীকে কাবু করা সম্ভব।” বললেন আলাফী। এখানকার সেনাবাহিনী বাহাদুর নয় বটে তবে একেবারে কাপুরুষও নয়। আগের দুটি অভিযানে এজন্য এরা বাহাদুরী করেছে যে, তোমাদের সৈন্য সংখ্যা ছিল কম এবং আক্রমণে ছিল তাড়াহুড়া। হাজ্জাজ দাহির বাহিনীর শক্তি সম্পর্কে সঠিক ধারণা করতে পারেনি। এতোটা দূরে এসে যুদ্ধ করার প্রস্তুতিটাই অন্য রকম হওয়া উচিত ছিল। আমি তোমাদের সৈন্যবাহিনী ও সাজ-সরঞ্জামের খবর পেয়েছি। এ বিপুল সৈন্যবাহিনীও সাজ-সরঞ্জামের সাথে যদি তোমাদের মধ্যে লড়াই করার মতো আবেগ ও চেতনা থেকে থাকে তাহলে তোমাদের বাহিনীকে ঠেকানোর মতো বাহাদুর সেনা এ অঞ্চলে নেই। আর যদি তোমার চাচা হাজ্জাজ ও খলিফাকে খুশী করার জন্য তোমরা যুদ্ধে এসে থাকো, তাহলে রাজা দাহিরের বাহিনীকে তোমাদের মোকাবেলায় বেশী শক্তিশালী দেখতে পাবে, আর পরাজয়ই হবে তোমাদের বিধিলিপি।
মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু অভিযানে হারেস আলাফী ও বিন কাসিমের সাক্ষাতটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। সেদিন যদি বিন কাসিম আলাফীকে তাদের সহযোগিতার প্রশ্নে সম্মত ও রাজা দাহিরের পক্ষাবলম্বন না করতে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ না করতে পারতেন, আর হারেস আলাফীর নেতৃত্বে পাঁচ ছয়শ বিদ্রোহী আরব রাজা দাহিরের পক্ষে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতো, তাহলে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু অভিযানের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারতা, ইতিহাস হতে পারতো অন্য রকম। আলাফীকে রাজার পক্ষাবলম্বন থেকে বিরত রাখার কূটনৈতিক আলোচনা পর্বটি ছিল বিন কাসিমের সিন্ধু অভিযানের সাফল্যের অন্যতম একটি দিক। কারণ তিনি একটি পরীক্ষিত ও অভিজ্ঞ শত্রুবাহিনীকে মায়া ও মমতা দিয়ে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে পক্ষে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন।
অবশ্য মাকরানের শাসক বিন হারুন আলাফীর প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থাবান ছিলেন না। তিনি মনে করেছিলেন আলাফীর কথা সঠিক নাও হতে পারে; অতএব তাকে বিরোধী শিবিরে রেখেই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।
মুহাম্মদ বিন কাসিম আলাফীর সাক্ষাতের পর আক্রমণের জন্য সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করলেন বটে কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কিছু সামরিক সরঞ্জাম জাহাজে পৌছার জন্য অন্তত আরো মাস খানিক মাকরানে তাঁকে অপেক্ষা করতে হলো। গুরুত্বপূর্ণ এসব সামরিক সরঞ্জামের মধ্যে অন্যতম ছিল মিনজানিক। বিন কাসিমের এ অভিযানে কয়েকটি মিনজানিক ব্যবহৃত হয়েছিল। তবে সবচেয়ে বড় ছিল “উরুস” নামের মিনজানিক। অবশেষে প্রায় মাসখানিক পর মিনজানিক বহনকারী জাহাজও পৌছে গেল। এসব সামরিক সরঞ্জাম জাহাজ থেকে নামানোর পরই বিন কাসিম তার সেনাদের অভিযানের নির্দেশ দিলেন।
