তখন কুবলার সাথে বন্দিশালার কয়েকজন কর্মকর্তা ছিল। কুবলাকে থমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তারা বিস্মিত হয়ে তার মুখের দিকে তাকালো।
“এরা আজকের আনা নতুন কয়েদী। মনে হচ্ছে এরা আরব ও মুসলমান। যখন থেকে এদেরকে এখানে আনা হয়েছে তখন থেকেই তাদের মতো করে জপতপ করছে।” বলল এক কর্মকর্তা।
কুবলা ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভেঙ্গে নীচে নামতে লাগল। যতোই এগুতে লাগলো তার কানে গুঞ্জন আরো বেশী পরিষ্কার হয়ে ওঠল। আরো বেশী আকর্ষণীয় মনে হতে থাকল। জেলখানার ছোট্ট কক্ষগুলোর সামনে দিয়ে কুবলা পায়চারী করতে থাকে। কোন কক্ষে ছিল দু’জন বন্দি, কোন কক্ষে তিনজন আবার কোন কক্ষে গোটা একটি দল। বন্দিরা সবাই কিবলামুখী হয়ে কলেমা তাইয়্যেবা জপছে। তাদের কেউ দরজার দিকে তাকিয়ে দেখারও প্রয়োজনবোধ করেনি, কে এসেছে? কুবলা শেষ কক্ষের পাশে গিয়ে এক প্রহরীর কানে কানে কি যেন বলল। প্রহরী চেচিয়ে বলল, “সকল বন্দি খামোশ হয়ে যাও। জেলার সাহেব সবার উদ্দেশ্যে কথা বলবেন।”
বন্দিরা নীরব হয়ে গেল। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল কেউ কেউ। ক্ষোভ, ঘৃণা ও নিন্দায় মুখরিত হয়ে উঠলো কয়েকজন। তাতে এতোটাই শোরগোল শুরু হয়ে গেল যে কে কি বলছে কিছুই বোঝা গেল না। কক্ষগুলোর দরজা ছিল তালাবদ্ধ, প্রহরীরা লোহার ডাণ্ডা পেটাতে লাগল। কিন্তু চেচামেচি নিয়ন্ত্রণে আনার কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছিল না।
“সবাই একসাথে চেচামেচি করলে তো কিছুই শোনা যাবে না। তোমাদের একজন কথা বলো” গম্ভীর কণ্ঠে বলল কুবলা। আমি তোমাদের কাছে কিছু কথা জিজ্ঞেস করতে চাই।” “এদিকে এসো” কুবলাকে নিজের দিকে ইঙ্গিত করলেন এক আরব বৃদ্ধ। কে তুমি? কথা যা বলার আমার কাছে বলো।”
কুবলা বৃদ্ধের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে বৃদ্ধ বলল, “তুমি কি এই কয়েদখানার দারোগা? এটা কেমন জুলুম বলল, আমাদের কেন কয়েদখানায় বন্দি করা হলো?” “আমি কাউকে কয়েদখানায় বন্দি করতে পারি না, আর ইচ্ছে করলেই কাউকে এখান থেকে ছেড়ে দিতেও পারি না” বলল কুবলা। আমি নিছক
হুকুমের তাবেদার। তোমরা আমাকে গালিগালাজ করলে লাভ হবে না। আমি তোমাদের কাছে কিছু কথা জানতে চাই। আচ্ছা, তোমরা সবাই মিলে কি গাইছিলে? এ আওয়াজ আমার খুব ভালো লেগেছে।”
“এ আওয়াজ কি তোমার অন্তরকে মোমের মতো নরম করে দেয়নি?” জিজ্ঞেস করলো বৃদ্ধ। “হ্যাঁ, অবশ্যই আমি কিছুটা প্রভাবিত হয়েছি। আমাকে বলো তো তোমরা কি বলছিলে?”
“এ আরব বৃদ্ধ মালাবার অঞ্চলে দীর্ঘদিন কাটিয়েছেন। ভারতীয় অঞ্চলে তার ব্যবসাও দীর্ঘদিনের। এজন্য সিন্ধু অঞ্চলের ভাষা তার জানা ছিল। তিনি সিন্ধি ভাষা যেমন বুঝতে পারেন অনুরূপ বলতেও পারেন। বৃদ্ধ বললেন, এটা কোন সঙ্গীত নয়। এটা আমাদের কলেমা। এর মর্মার্থ হলো, আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন মা’বুদ নেই, ইবাদত করার যোগ্য আর কেউ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। তাছাড়া আমাদের ধর্মগ্রন্থ কুরআন শরীফের কিছু আয়াত সবাই মিলে পড়ছিলাম।”
“এর দ্বারা তোমাদের কি উপকার হবে?” জানতে চাইলো কুবলা।
“সবচেয়ে বড় কথা হলো বিপদে এ কলেমা পাঠ করলে অন্তরে প্রশান্তি আসে, আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হন। তাছাড়া এর বরকতে এই জাহান্নাম থেকেও মুক্তির ব্যবস্থা হবে” বললেন আরব বৃদ্ধ।
“তোমরা কি বিশ্বাস করো, তোমাদের সবাইকে এখান থেকে ছেড়ে দেয়া হবে? জিজ্ঞেস করল কুবলা।
“আমরা যদি অপরাধী হতাম, তাহলে এই বন্দিদশা থেকে আর মুক্তির জন্য প্রার্থনা করতাম না, তখন আল্লাহর কাছে কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমা ভিক্ষা চাইতাম। আমরা নিরপরাধ। অন্যায়ভাবে আমাদেরকে বন্দি করা হয়েছে। আমাদের সহায়-সম্পদ লুটে নিয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি মহান আল্লাহ তাআলা অবশ্যই আমাদের সাহায্য করবেন। তোমাদের কাছে এবং তোমাদের রাজার কাছে আমরা কোন সাহায্যই চাইবো না। তোমাদের রাজার ধ্বংস লেখা হয়ে গেছে” বললেন বৃদ্ধ। “তোমরা কি মহারাজের ধ্বংসের জন্য তোমাদের প্রভুর কাছে প্রার্থনা করছ?” জিজ্ঞেস করল কুবলা।
“না, আমরা কারো অমঙ্গল কামনা করি না। শাস্তি ও পুরস্কারের ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। তুমি যদি নেক কাজ করো তার পুরস্কার পাবে আর জুলুম অত্যাচার করলে তোমার ওপরও জুলুম করা হবে।”
আরব বৃদ্ধের এ কথা শুনে কুবলা যে অসৎ ইচ্ছা নিয়ে বন্দি পরিদর্শনে এসেছিল তার মন থেকে সব কুচিন্তা দূর হয়ে গেল। রাজা দাহিরের নির্দেশ ছাড়া সে কোন কয়েদীকে মুক্তি দিতে পারত না ঠিক; তবে কুবলা কুরআন শরীফের তেলাওয়াত ও আরব বন্দির কথা শুনে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হলো তা বন্দীদের জন্য খুবই ইতিবাচক প্রমাণিত হলো। ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, রাজা দাহিরের প্রধান জেলখানার দারোগা কুবলা ছিল জ্ঞানী, বিদ্বান ও একজন লেখক ব্যক্তি। জেলখানার প্রশাসনে সাধারণত এমন লোকেরাই নিযুক্ত হয়ে থাকে, যারা নিরীহ বন্দীদের ওপর অমানবিক অত্যাচার করে নির্দোষ মানুষের হাড় গুড়ো করে প্রশান্তি লাভ করে থাকে। কিন্তু কুবলার মতো পণ্ডিত মানুষকে রাজা দাহির জেলখানার দারোগা নিযুক্ত করেছিল কেন তা বলা মুশকিল।
সেনাপতি বুদাইল বিন তোফায়েল যেদিন মাত্র তিনশ অশ্বারোহী নিয়ে বসরা থেকে রওয়ানা হলেন, সেদিন রাতে মায়ারাণীর বিশেষ নিরাপত্তারক্ষী বেলাল বিন উসমান তার তিন সাথীকে নিয়ে আরব মুসাফিরদের বন্দি করে রাখা জেলখানার দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল। জায়গাটি ছিল অন্ধকার। সেখানে ছিল কয়েকটি জানালা। দিনের বেলায়ই বেলাল জায়গাটি দেখে গিয়েছিল। কয়েদখানার দেয়ালে মাঝে মাঝে বুরুজ। চার কোণের চারটি বুরুজের ওপর পাহারারত সশস্ত্র প্রহরী। বেলাল তার সাথীদেরকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে গেল যেটি ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। বেলাল দেয়ালের নীচে দাঁড়িয়ে হুক লাগানো রশি দেয়ালের উপরে ছুড়ে মারলে হুক দেয়ালের ওপরে আটকে গেল। রাতের নিস্তব্ধ নীরবতায় দেয়ালের ওপরে লোহার হুক নিক্ষিপ্ত হওয়ার আওয়াজটি হয়তো প্রহরীরাও শুনতে পেয়েছিল। বেলাল ও সাথীরা দেয়ালের সাথে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে হুকের ঝংকার ধ্বনীতে প্রহরীদের প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্য উৎকর্ণ হয়ে রইল। দীর্ঘক্ষণ তারা উৎকর্ণ থেকেও ওপরে কোন শব্দ পেলো না। সবার আগে বেলাল রশিটা শক্তভাবে ধরে দেয়ালে পা ঠেকিয়ে রশি বেয়ে দেয়ালের ওপরে উঠে পড়ল।
