“হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তৎকালীন খলিফার সমান্তরাল ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন কিন্তু খলিফার মতো তিনি দোস্ত-দুশমন চিনতে ভুল করতেন না। কারা তার শত্রু, আর কারা মিত্র, এ ব্যাপারে তার হিসাব ছিল নির্ভুল। মুসলমানদের জাহাজ লুণ্ঠনকারী রাজা দাহিরকে চরম শিক্ষা দিতে তিনি অতিমাত্রায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন। প্রতিশোধ স্পৃহা তাকে পাগলপ্রায় করে তুলেছিল। “ইবনে তোফায়েল! সেনাপতি বুদাইলের উদ্দেশ্যে বললেন হাজ্জাজ। তুমি আর আম্মান ফিরে যাবে না। তোমাকে মাত্র তিনশ অশ্বারোহী দিচ্ছি। আমি মাকরানের শাসক মুহাম্মদ বিন হারুনকে পয়গাম পাঠিয়েছি, সে তোমাকে তিন হাজার সৈন্য দেবে। তুমি সোজা মাকরানে চলে যাবে। সেখানে গেলে মুহাম্মদ বিন হারুন তোমার ওখানে করণীয় কি তা বলে দেবে। আমার সকল গোয়েন্দা কর্মীরা তার সাথে যোগাযোগ রাখে।
রাজা দাহির তার উজির বুদ্ধিমানকে ডেকে পাঠালো।
“বিজ্ঞ উজির কি ভবিষ্যত সম্পর্কে কিছু বলতে পারেন?” উজিরকে জিজ্ঞেস করল রাজা দাহির। উজির কি মনে করেন, আরব দেশের দিক থেকে আরেকটা তুফান আসবে?”
“তুফান আসাটা তো খুব স্বাভাবিক ঘটনা মহারাজ! তুফান কখনো পূর্বদিক থেকে আসে কখনো পশ্চিম দিক থেকে আসে। তুফান যেদিক থেকেই আসুক না কেন, সেটা লক্ষণীয় বিষয় নয়। আসল ব্যাপার হচ্ছে আমরা সেই তুফান মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুতি কতটুকু নিয়েছি। আমি একথা বলতে পারি, আরব দেশ থেকে একটা ঝড় অবশ্যই আমাদের দিকে আসবে, এজন্য আমাদের সতর্ক থাকতে হবে মহারাজ!” “রমলের রাজার আক্রমণ প্রতিরোধে তুমি আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলে আশ্রিত আরব মুসলমানদের সহযোগিতা নেয়ার জন্য। তোমার পরামর্শে আমি তাদের সহযোগিতা চাইলে তারা রমলের বাহিনীকে শোনচীয়ভাবে পরাজিত করেছিল। এবার সম্ভাব্য আরব আক্রমণে আমি আরব সর্দারকে ডেকে এনে সহযোগিতা চেয়েছিলাম। আরব সর্দার আমাকে সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সে আমাকে উল্টো আরব বন্দীদের মুক্ত করে দিতে বলেছে। আরো জানিয়েছে, মুসলমান মুসলমানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে না। এখন তুমিই বলল, এদের ব্যাপারে আমি কি করতে পারি? আমি কি এদের অকৃতজ্ঞতার স্বাদ বুঝিয়ে দেবো?”
“না মহারাজ! বলল উজির। শত্রু সংখ্যা বাড়াবেন না। এদেরকে শত্রু বানালে এরাও সুযোগ বুঝে পিছন দিক থেকে আঘাত হানবে। তাদের সাথে বন্ধুত্ব আরো মজবুত করুন, আর গোয়েন্দা লাগিয়ে ওদের মনোভাব বুঝতে চেষ্টা করুন। অবশ্য এদেরকে বন্ধু মনে করে কখনো বিশ্বাস করবেন না। মুসলমানদেরকে সব সময় শত্রু ভাবতে হবে। সেই সাথে ওদেরকে মাকরানেই সীমাবদ্ধ থাকার নির্দেশ করুন। তাদেরকে যদি অবাধ যাতায়াতের অনুমতি দেন, তাহলে তারা ইসলামের প্রচার করতে শুরু করবে। আসলে এরা এমন শত্রু যে শত্রু মহারাজের ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠছে। আর এটি এমন অন্ধকার যে অন্ধকার মহারাজের প্রদীপের নীচেই বিরাজ করছে।”
“এরা যদি আরব আক্রমণ কারীদেরকে গোপনেও কোন সহযোগিতা করে, তাহলে আমি ওদের সবাইকে খুন করে ফেলব। সিন্ধু ও সারা ভারত বর্ষে শুধু হিন্দু ধর্ম থাকবে, আর কোন ধর্ম থাকবে না।” বলল রাজা দাহির। বন্দীদের ছেড়ে দিলে এর কি প্রতিক্রিয়া হবে এ নিয়ে কি মহারাজ কোন চিন্তা ভাবনা করেছেন?” বলল উজির। “না উজির! এ নিয়ে আমি কোন চিন্তা-ভাবনা করিনি।” বলল রাজা দাহির। বন্দীদেরকে আমি মুক্ত করে দিলে আরব শাসকরা আমাকে দুর্বল
ভাবতে থাকবে। তাছাড়া আমি আরব দূতের কাছে তো অস্বীকার করেছি বন্দিরা আমার নাগালের ভিতরে নেই, আমি তাদের বন্দি করিনি। এখন আমি কোন মুখে ওদের মুক্ত করে ওরা আমার কাছেই বন্দি ছিল একথা প্রমাণ করব।, এটা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বন্দীদের বাকী জীবন বন্দিশালাতেই কাটাতে হবে।”
ইতিহাস থেকে জানা যায়, আরব মুসাফিরদেরকে অরুঢ়ের এক দুর্গম বন্দিশালায় বন্দি করে রাখা হয়েছিল। বন্দিশালার প্রশাসকের নাম ছিল কুবলা। সে ছিল কট্টর হিন্দু। রাজা দাহিরের সময় অঢের জেলখানা ছিল খুবই বিখ্যাত। বন্দিশালার ভিতরটা ছিল বিশাল। এতে কোন মানুষকে ঢুকানো হলে, সে আর সভ্য জগতের বাসিন্দার মধ্যে গণ্য হতো না। বন্দিশালায় কয়েদীদের সাথে অমানবিক আচরণ করা হতো যা সভ্য জগতের মানুষ ভাবতেও শিউরে উঠতো। বন্দিশালার একটি গারখানায় ছিল অনেক কক্ষ। আরব বন্দীদেরকে এসব কক্ষে রাখা হয়। একেকটি কক্ষে এক একটি কবিলা রাখা হয়েছিল।
সে রাত ছিল বন্দীদের প্রথম রাত। মধ্য রাতের পর বন্দিশালার দারোগা বন্দীদের দেখতে এলো। বন্দীদের যখন কয়েদখানায় ঢুকানো হচ্ছিল কয়েদখানার দারোগা কুবলা তাদের দেখেছিল। বন্দীদের মধ্যে ছিল যুবতী সুন্দরী তরুণী। এদের দেখার উদ্দেশ্যেই রাতের দ্বিপ্রহরে দারোগা কুবলা বন্দিশালায় নতুন বন্দীদের দেখতে এসেছিল। কুবলা বন্দিশালার বন্দীদেরকে নিজের কেনা গোলাম বাদী ভাবতো। কোন বন্দি কোন দিন কুবলার কাছ থেকে কোন মানবিক আচরণের প্রত্যাশা করতো না। আরব মুসাফির বন্দিরা মুসলমান হওয়ার কারণে অমুসলিম কুবলার কাছ থেকে সদাচারের প্রত্যাশা করার কোনই অবকাশ ছিল না। মাটির নীচের বন্দিশালার সিঁড়িতে পৌছলে কুবলার কানে ভেসে এলো ক্ষীণ আওয়াজের গণসঙ্গীতের মতো আওয়াজ। কবলা আওয়াজ শুনে থেমে গেল এবং আওয়াজটি বুঝার চেষ্টা করল। সমবেত কণ্ঠের এ আওয়াজ তার ভালো লাগল। সাধারণত বন্দীদের শিকলের আওয়াজ, চাবুক পেটানোর শব্দ ও আর্তচিৎকার শুনতে সে অভ্যস্ত। কিন্তু জাহান্নাম সদৃশ এই জিন্দানখানায় সঙ্গীতের মতো মিষ্টি মধুর আওয়াজ নির্মম নিষ্ঠুর কুবলার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হলো।
