দেয়ালের ওপরের অংশটি ছিল যথেষ্ট চওড়া। অনায়াসে দেয়ালের ওপর দিয়ে কেউ ঘোড়া হাঁকাতে পারতো। দেয়ালের ওপরে উঠে বেলাল একটি ছোট বুরুজের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। একে একে বেলালের তিনসঙ্গীও ওপরে উঠে এলো। তাদের সবারই হাতে তরবারী আর কোমরে গুঁজে রাখা খঞ্জর। তাদের কারো কয়েদখানার ভিতরের অবস্থা জানা ছিল না। কয়েদখানার কোথায় কি সে সম্পর্কে তাদের কোন ধারণা ছিল না। আরব মুসাফিরদের কোথায় বন্দি করে রাখা হয়েছে এ সম্পর্কেও তারা ছিল অজ্ঞাত। বিশাল জেলখানা। জেলখানার দেয়ালের ওপরে জায়গায় জায়গায় মশাল জ্বলছে। আসলে ভাবাবেগে বেলাল বন্দীদের মুক্ত করতে এ অভিযানে নেমে পড়েছিল। অভিযান শুরু করার আগে তার প্রয়োজন ছিল জেলখানার ভিতরের অবস্থা জেনে নেয়া। সে হারেস আলাফীকে বলেছিল, জেলখানার প্রহরীদের হত্যা করে সে ওদের হাতিয়ার বন্দীদের দিয়ে দেবে, এরপর সবাই মিলে বাকী প্রহরীদের পরাস্ত করে প্রধান গেট খুলে বন্দীদের মুক্ত করে মাকরানে পৌছে দেবে।
বেলাল তার তিনসঙ্গীকে দেয়ালের ওপরে ওঠার জায়গাতে রেখে এক কোণের বুরুজের দিকে অগ্রসর হলো। পা টিপে টিপে অগ্রসর না হয়ে এমনভাবে অগ্রসর হলো, তাকে দেখে মনে হবে সে যেন জেলখানার কোন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বেশ কবছর যাবত রাজমহলে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য থাকার কারণে বেলাল নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ কোড ও সাংকেতিক ভাষা জানতে এবং বলতে পারত। সে যখন বুরুজের কাছাকাছি পৌছল প্রহরী তাকে দেখে হাঁক দিলো।
“কে রে ওখানে?” হাঁক দিলো প্রহরী। “হ্যাঁ, হঁা, ওখানেই দাঁড়িয়ে থাক।” বলল বেলাল।
“প্রহরী তাকে জেলখানার কোন পদস্থ কর্মকর্তা মনে করে বুরুজের ভিতরেই দাঁড়িয়ে রইলো। বেলাল তরবারী কোষমুক্ত করে ধীরে ধীরে বুরুজের দিকে অগ্রসর হলো। বুরুজের ভিতর দিকটা ছিল অন্ধকার। চারটা খুঁটির ওপরে গম্বুজ আকার ছাদ দিয়ে তৈরী বুরুজ চতুর্দিকে খোলা। বেলাল প্রহরীর কাছে গিয়ে তরবারীর আগাটা বুকে চেপে ধরে বলল, তোমার অস্ত্র ফেলে দাও। সে কোমরে কোষবদ্ধ তরবারী ও খঞ্জর হাতে নিয়ে দূরে নিক্ষেপ করল। বেলাল
তাকে মেঝের ওপরে ফেলে তরবারীর আগা তার ঘাড়ের ওপরে চেপে ধরে বলল, “আরব কয়েদীরা কোথায়? সত্যিকথা বলবে এবং গড়িমসি না করে এক্ষুণিই বলবে।”
প্রহরী বলল, “আরব বন্দিরা মাটির নীচের কয়েদখানায়।” “সেখানে যাওয়ার পথ কি? নীচের কয়েদখানার চাবি কার কাছে?”
“আমি তোমাকে সব বলছি, কিন্তু আমার ঘাড় থেকে তরবারী সরিয়ে নাও। তুমি আমার জীবন কেড়ে নিও না। আমি তোমার কাজে কোন অসুবিধা করবো না। কারণ এই বন্দিশালাটা আমার বাবার সম্পত্তি নয়, আর আমার বাবা এদেশের রাজাও নয়। আমরা তো পেটের দায়ে চাকরী করি মাত্র।”
প্রহরীর কথায় বেলাল তার ঘাড় থেকে তরবারী সরিয়ে নিলো। “ঠিক আছে, এখন বল।” তাড়া দিলো বেলাল।
“আমি তোমার সাথে বন্ধুর মতো কথা বলছি, তুমিও আমার সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করবে এটাই প্রত্যাশা করি। তুমি যদি একা হও, কিংবা তোমরা পাচ সাতজন হয়ে থাকে, তাহলে আমি পরামর্শ দেবো, তোমরা ফিরে চলে যাও।”
“কেন?” জিজ্ঞেস করল বেলাল।
“তোমরা যদি বন্দীদের মুক্ত করতে এসে থাকো, তা তোমরা করতে পারবে না। আমি তোমাকে সরলভাবে বলছি, তোমার এখানে আসার উদ্দেশ্যটা কি বললো, তাহলে আমি তোমাকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারব। আমাকে যদি বিশ্বাস করো তাহলে যা জিজ্ঞেস করবে, আমি তা তোমাকে বলে দেবো। তবে আমি তোমাকে বলতে পারি উদ্দেশ্যে সফল হতে পারবে না তোমরা, খুবই শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হবে।” বলল প্রহরী।
“আগে বলো তো হঠাৎ করে আমার প্রতি তোমার এতোটা হৃদ্যতা কেন সৃষ্টি হলো?” জিজ্ঞেস করলো বেলাল। তুমি কি মৃত্যুর ভয়ে এতোটা সহজ হয়ে গেলে? মৃত্যুকে তোমরা এতোটাই ভয় কর? আমাকে দেখো, স্বজাতি বন্দীদের মুক্ত করতে জীবন বাজি রাখছি আর তোমরাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু..?”
“আরে দোস্ত…! কিসের জন্য জীবন বাজি রাখব আমি?” বলল প্রহরী। এদের আটকে রাখার জন্য? যেসব নিরপরাধ মানুষকে ডাকাতি করে অন্যায়ভাবে এখানে আটকে রাখা হয়েছে। এসব হচ্ছে রাজা মহারাজাদের
পাপ। এসব পাপের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে আমি কখনও প্রস্তুত নই। নিরপরাধ আরব বন্দীদের মুক্ত করতে কেউ আসলে আমি কেন সে পথে বাধা হয়ে দাঁড়াব। আমার সাধ্য থাকলে তালা খুলে আমি ওদের মুক্ত করে দিতাম। কারণ আমি জানি এদের আটকে রাখার কারণে আমাদের দেশের বিরুদ্ধে একটা মহাবিপদ ধেয়ে আসছে, আর এ বিপদ আসছে তোমাদের দেশ থেকে।”
“আমি মনে করেছিলাম তুমি এতোটা বুদ্ধিমান হবে না। কিন্তু তুমি বুদ্ধিদীপ্ত কথা বলছ,” বলল বেলাল।
“ঠিকই বলেছ। এগুলো আমার কথা নয়। আমাকে এসব সম্পর্কে জ্ঞান দিয়েছেন আমার বাবা। বাবা বলেছেন, আমাদের রাজা একবার আরব সৈন্যদের পরাজিত করে মনে মনে খুব উৎফুল্ল। হয়েছেন কিন্তু তিনি আরবদের মানসিকতা সঠিক জানেন না। আরব সৈন্যরা নিশ্চয়ই আবার আঘাত হানবে, তখন আর রাজার পক্ষে তাদের প্রতিরোধ সম্ভব নাও হতে পারে। আমাদের রাজা নিজেকে আসমানের দেবতা মনে করছে। কিন্তু সে যে অপরাধ করেছে, যে পাপ করেছে এর শাস্তি তাকে ভোগ করতেই হবে। সে তার বোনকে বিয়ে করেছে, এই অপরাধের শাস্তি না হয়েই পারে না।” “আমি তোমাকে যা জিজ্ঞেস করব, এখন এর ঠিক ঠিক জবাব দেবে? প্রহরীকে সতর্ক করল বেলাল। প্রহরী বেলালকে নীচে নামার রাস্তা দেখিয়ে দিলো এবং পাতাল কক্ষের চাবি সম্পর্কে বলল, পাতাল কক্ষের চাবি কোন প্রহরীর কাছে থাকে না। ওইসব চাবি একটি কক্ষে রাখা আছে। সেই কক্ষ বাইরে থেকে তালাবদ্ধ থাকে। চাবির ঘরটিই কয়েদখানার দফতর। সেখানে দুই প্রহরী থাকে। তারা সাধারণ সিপাই নয় উঁচুপদের কর্মকর্তা। জেলখানার কোথায় কোথায় প্রহরী পাহারারত রয়েছে তাও জানিয়ে দিলো।
