পালনে সফল হবো ইনশাআল্লাহ। সকল যোদ্ধাদের বুঝিয়ে দিন, আমরা এখানে রাজ্য বিস্তারের জন্যে খলিফা কিংবা শাসক হাজ্জাজের জন্য লড়াই করছি না, কুফরিস্তানে আল্লাহর রাজত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য, মানুষকে আল্লাহর পথ দেখানোর জন্যে আল্লাহর দুশমনদের সাথে লড়াই করছি।
ঐতিহাসিক মাসুমী লিখেন, এসব কথা বলতে বলতে বিন কাসিম আবেগ আপুত হয়ে উঠলেন। তাঁর চেহারা রক্তিম হয়ে গেল। সেই রাতেই সেনাপতি ও কমান্ডারগণ নিজ নিজ ইউনিটের যোদ্ধাদের একত্রিত করে বিন কাসিমের দেয়া নির্দেশনা জানিয়ে দিলেন।
বস্তুত এ সময় যোদ্ধাদের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌছেছিল যে অবস্থায় পৌছানোর পরিকল্পনা করেছিল রাজা দাহির। একাধারে যুদ্ধের পর যুদ্ধ ও বিশ্রাম না করার কারণে প্রত্যেক যোদ্ধার শরীর ক্লান্তি ও অবসন্নতায় কাবু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাদের মনের শক্তিতে কোন ঘাটতি ছিল না। দীর্ঘ দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে তাদের দেহ ভেঙ্গেচুরে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়লেও তাদের মনের আবেগ, উদ্দীপনা সেই প্রথম দিনের সিন্ধু অভিযানের মতোই উজ্জীবিত ছিল। মুলতান যুদ্ধের সূচনায় বিন কাসিমের এই আবেগপূর্ণ নির্দেশনা তাদের অচল ও অবসাদগ্রস্ত দেহেও নতুন প্রাণ ও শক্তি সঞ্চার করল।
ভোরবেলায় একটি উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে কোন এক যোদ্ধা ফজরের আযান দিল। আজকের আযানে আবারো সেই উদ্দীপনা ও নতুন প্রাণময় দো্যতনা ছড়িয়ে পড়ল মুসলিম শিবিরে। আযানের দোতনা ইথারে ভাসতে ভাসতে মুলতান দুর্গের প্রাচীরে ধাক্কা খেয়ে দুর্গের ভিতরেও ছড়িয়ে পড়ল। ক্লান্ত শ্রান্ত যোদ্ধারা রাতের আড়মোড়া ভেঙ্গে অযু এস্তেঞ্জা সেরে সবাই নামাযের প্রস্তুতি নিয়ে এসে জড়ো হলো। সেনাপতি বিন কাসিমের নেতৃত্ব ও ইমামতিতে সবাই নামায আদায় করতে কাতারবদ্ধ হলো।
ফজরের নামাযের পর দ্রুত পানাহারের পর্ব শেষ করে মুসলিম যোদ্ধারা অবরোধ আরোপের জন্যে প্রস্তুতি নিলো। সেনাপতি ও কমান্ডারগণ যখন নিজ নিজ যোদ্ধাদের নিয়ে দুর্গের দিকে রওয়ানা হলো, তখন শিবিরে অবস্থানরত নারী ও শিশুরা তাদের হাত নেড়ে আল্লাহ সহায় হোন, তোমরা কামিয়াব হও ইত্যাদি বলে দোয়া ও শুভ কামনায় বিদায় জানালো। এমন সময় পূর্বাকাশে সকালের সূর্য আলো বিকিরণ করতে শুরু করেছে।
মুসলিম যোদ্ধারা কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পর এক পাশের দুর্গফটক খুলে গেল। সাথে সাথে কিছু সংখ্যক সৈন্য দুর্গ থেকে দ্রুতবেগে বের হয়ে এলো। হিন্দু সৈন্যরা দুর্গ থেকে বেরিয়েই যুদ্ধের প্রস্তুতিতে কাতারবন্দি হয়ে গেল। আজকের এই যোদ্ধাদেরও কমান্ড দিচ্ছিল বজরা। এদিকে দুর্গপ্রাচীরের ওপর ছিল তীরন্দাজ, বল্লম ও বর্শাধারীদের মানব প্রাচীর। দুর্গপ্রচীরের উপরে দাঁড়ানো হিন্দুদের জোশ ও তাদের দুর্নিবার স্লোগান চিঙ্কার বলে দিচ্ছে, তারা পরাজয় বরণ করতে মোটেও প্রস্তুত নয়। অন্যান্য দুর্গের মতোই এই দুর্গপ্রাচীরে থেকে মুসলমানদের প্রতি নানা বিদ্রুপাত্মক কটাক্ষবান উচ্চারিত হচ্ছিল। এদিকে মুসলিম যোদ্ধাদের একটি ইউনিট দূর দিয়ে দুর্গের পেছন দিকে গিয়ে অবরোধ আরোপের জন্য এগিয়ে যাচ্ছিল। বিন কাসিম আগেই বলে দিয়েছিলেন, যথাসম্ভব আক্রমণাত্মক যুদ্ধ না করে আত্মরক্ষামূলক কৌশল অবলম্বন করবে।
শত্রু বাহিনী যাতে অগ্রসর হয়ে আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় সেই সুযোগ দিতে হবে। বিন কাসিম যথাসম্ভব তার সেনাদের শক্তিক্ষয় রোধ করতে চাচ্ছিলেন, সেই সাথে তিনি এই মোকাবেলাকে দীর্ঘায়িত করতে চাচ্ছিলেন। এ জন্য দুর্গ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থেকে সৈন্যদেরকে অবরোধ আরোপের নির্দেশ করেছিলেন। আর অগ্রগামী দুই কমান্ডারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, সুযোগ মতো আক্রমণ করতে এবং আত্মরক্ষামূলক ভূমিকা নিতে। এ দিন সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত লড়াই চলল। মুসলিম সৈন্যরা আত্মরক্ষামূলক লড়াই বজায় রাখল, সেই সাথে সুযোগ মতো আক্রমণও করল। অন্যান্য দুর্গের মতো এখানেও দুর্গপ্রাচীরের কাছাকাছি যাওয়া ছিল সংকটজনক। ফলে তাদেরকে দুর্গ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে লড়াই করতে হলো। শত্রু বাহিনী পুরোপুরি দুর্গের সুবিধা পাচ্ছিল। তাদেরকে পিছন দিক থেকে ঘিরে ফেলার কোনই অবকাশ ছিল না।
বেলা ডুবে যাওয়ার সাথে সাথে বজরার সৈন্যরা একে একে সবাই দুর্গে ফিরে যেতে শুরু করল। বিন কাসিমের কয়েকজন জানবাজ যোদ্ধা তাদের তাড়া করে দুর্গফটক দিয়ে ভিতরে ঢোকার জন্য প্রস্তুতি নিল কিন্তু বিন কাসিম তাদের নিবৃত করলেন। বিন কাসিম গোটা রণাঙ্গন ঘুরে ঘুরে শত্রুবাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ করলেন। তাঁর সেনাদের ক্ষয়ক্ষতিও তিনি নিরূপন করলেন। সকল ঐতিহাসিকগণই বলেছেন, দ্বিতীয় দিন শত্রুবাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হলো। তারা বহু লাশ ও আহত সৈন্যকে রণাঙ্গনে ফেলে দুর্গের ফটক বন্ধ করে দিল।
বিন কাসিম তার সৈন্যদের ক্ষয়ক্ষতি ও শত্রুবাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে খুবই আশ্বস্ত হলেন। রাতের বেলায় সেনাপতি ও কমান্ডারদের ডেকে তিনি বললেন, যুদ্ধ কৌশল এমনটাই থাকবে। নাটকীয় কোন ঘটনা না ঘটলে এর তেমন ব্যত্যয় ঘটবে না। তোমরা শত্রু সেনাদের বোঝাতে চেষ্টা করবে, তোমরা ক্লান্ত, আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার সামর্থ তোমাদের নেই। তাহলে শত্রুবাহিনী অগ্রগামী হয়ে তোমাদের ওপর আক্রমণ করবে আর তোমরা তাদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হত্যা করতে চেষ্টা করবে। আমরা ধীরে ধীরে ওদের জনবল নিঃশেষ করে দিতে চাই।
