কিন্তু কুরসিয়া মুসলিম সেনাদের দুর্গে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা আগেই আন্দাজ করতে পেরেছিল। তাই সে একটি সেনাদলকে দুর্গের বাইরে যুদ্ধরত সৈন্যদেরকে দুর্গে প্রবেশে সহযোগিতার জন্য ফটকের কাছে পাঠিয়ে দিলো এবং দুর্গপ্রাচীরের ওপরে অবস্থানরত শত শত তীরন্দাজ ও বর্শাধারী সৈন্যকে নির্দেশ দিলো শত্রু সেনারা আয়ত্ত্বের ভিতরে আসলেই তোমরা তীরবৃষ্টি ও বল্লম নিক্ষেপ করতে শুরু করবে।
অবস্থা তাই হলো। বজরার সৈন্যরা দ্রুত গতিতে দুর্গে প্রবেশ করতে শুরু করে। মুসলমানদের ঘেরাও পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে ওরা দেয়নি। তদুপরি কিছু সংখ্যক জানবাজ মুসলিম যোদ্ধা দুর্গফটকে চলে গেল এবং হিন্দু সৈন্যদের তাড়া করে দুর্গে প্রবেশের চেষ্টা করল। কিন্তু তারা সফল হলো না। সফল হওয়ার মতো কোন অবস্থাও ছিল না। দৃশ্যত এটা ছিল এই জানবাজদের জন্য আত্মহুতির নামান্তর। কারণ হিন্দু সৈন্যরা যখন এক সাথে দুর্গে প্রবেশের জন্য তাড়াহুড়ো করছিল তখন ওদের মধ্যেই জট সৃষ্টি হয়ে যেত। এমতাবস্থায় যে মুসলিম যোদ্ধা সেখানে চলে যেতো সেও জটে আটকে যেত। জট ভেঙ্গে কেউ ভিতরে প্রবেশ করলেও তার নিহত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকত না। যে জানবাজ মুসলিম যোদ্ধা সর্বাগ্রে মুলতান দুর্গে প্রবেশের জন্য প্রাণঘাতি উদ্যোগ নিয়েছিল তার নাম ইতিহাসে আজো স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। তার নাম ছিল জায়েদ বিন আমের তাঈ। জায়েদের এই দুঃসাহসী অভিযানে আরো কয়েকজন যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে দু’তিন জন ছাড়া আর কারো পক্ষে জীবন নিয়ে ফিরে আসা সম্ভব হয়নি। যুদ্ধের পর জায়েদের মৃতদেহ কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, জায়েদ শত্রু সেনাদের সাথে দুর্গের ভিতরে ঢুকে নিহত হয়েছিল। যার ফলে তার মৃতদেহ হিন্দুরা পুড়িয়ে ফেলে। বজরা তার সৈন্যদের নিয়ে দুর্গে ঢুকে পড়ল। সূর্যও তখন পশ্চিমাকাশে শেষ আলো বিকিরণ করে ডুবে গেছে। চতুর্দিকে নেমে এসেছে অন্ধকার। কিন্তু দুর্গের বাইরে তখনও শত শত মুসলিম যোদ্ধা দণ্ডায়মান। এমতাবস্থায় দুর্গপ্রাচীরের ওপর থেকে মুসলিম যোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে শত্রু সেনারা তীব্র তীরবৃষ্টি ও বল্লম নিক্ষেপ করতে শুরু করে। তাতে কয়েকজন মুসলিম যোদ্ধা ও কয়েকটি ঘোড়া মারাত্মকভাবে আহত হয়। পরিস্থিতি সামলাতে মুসলিম কমান্ডারগণ তাদের সহযোদ্ধাদেরকে দুর্গপ্রাচীরের কাছ থেকে সরে আসার নির্দেশ দেন। এদিকে যুদ্ধ থামতেই মুসলিম শিবিরের মহিলারা আহতদের সেবার জন্য পানির মশক ও ওষুধপত্র নিয়ে দৌড়ে রণাঙ্গনে চলে এলো। তারা আহতদের পানি পান করাতে লাগল এবং অক্ষমদেরকে রণাঙ্গন থেকে উঠে আসার সহযোগিতা দিচ্ছিল। সেবিকাদের সহযোগিতার জন্য কিছু সংখ্যক সৈন্য রণাঙ্গনে অপেক্ষা করল আর বাকীরা শিবিরে ফিরে এলো।
যুদ্ধ শেষে অসমাপ্ত তাবু ও শিবির স্থাপনের কাজে আবারো মনোযোগী হলো সৈন্যরা। বিন কাসিম তাঁর সেনাপতি ও কমান্ডাদের ডেকে পরামর্শ সভায় বসলেন।
তিনি সবার উদ্দেশ্যে বললেন, আজকের লড়াই থেকে শত্রু বাহিনীর রণকৌশল অনুমান করা যায়। বিগত কয়েকটি দুর্গেও শত্রু বাহিনী এই কৌশলই অবলম্বন করেছে। এখানকার শাসক কুরসিয়াকে হয়তো সিককার শাসক বজরা এই কৌশল বলেছে। সকল সৈন্যদেরকে বলে দিন, এখানেও আমাদেরকে প্রতি দিনই মোকাবেলা করতে হবে এবং শত্রুরা আমাদেরকে অবরোধ পূর্ণ করার অবকাশ দেবে না।’ চৌকস একটি ইউনিটকে দুর্গপ্রাচীরের বাইরে টহলরত অবস্থায় রাখতে হবে। যাতে বাইরে থেকে দুর্গবাসীর কাছে কোন ধরনের সাহায্য পৌছতে না পারে। আর দুর্গের কোন লোক বাইরে যেতে না পারে। তিনি আরো বললেন, টহলরত দলের কমান্ডার যদি মনে করে যুদ্ধাবস্থায় তাদেরও সহযোগিতা দরকার, তবে টহলরত ইউনিটের অর্ধেক সৈন্যকে সুযোগ মতো যুদ্ধরতদের সহযোগিতার জন্য পাঠিয়ে দেবে আর বাকিরা টহল বজায় রাখবে। রণকৌশল সম্পর্কে জরুরি দিক নির্দেশনা দেয়ার পর সেনাপতি ও কমান্ডদের উদ্দেশ্যে বিন কাসিম বললেন, প্রিয় বন্ধুগণ! সকল সৈন্যদের জানিয়ে দিন, আমরা এমন এক পর্যায়ে এসে গেছি, এই দুর্গ যদি আমরা নিরাপদে সাফল্যের সাথে জয় করতে পারি, তাহলে হিন্দুস্তানের জন্য আমার প্রধান বাধা দূর হয়ে যাবে। বন্ধুগণ, মুলতান হবে হিন্দুস্তানের জন্য ইসলামের আলোর মিনার।
বিভ্রান্ত হিন্দুস্তানবাসী এই মিনার দেখে সঠিক পথের দিশা পাবে। কেয়ামত পর্যন্ত হিন্দুস্তানবাসীদের জন্য এ মিনার আলো বিকিরণ করতে থাকবে। সেই সাথে কেয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষ এই আলোর মিনার স্থাপনের জন্য আপনাদেরকে পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। বন্ধুগণ, নিজ নিজ ইউনিটের যোদ্ধাদের বলে দিন, মুলতান জয় করতে আমরা জীবন কুরবান করে দেবো। মুলতান জয় না হলে আমরা আর ফিরে যাব না। সহযোদ্ধাদের বলে দিন, আমাদের সামনে জান্নাত হাতছানি দিচ্ছে, আর পেছনে রয়েছে। জাহান্নাম। আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব হলো, দেহের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে আমরা হিন্দুস্তানের মানুষের জন্য আলোর পথ নির্মাণ করব। এটাই আমাদের লক্ষ্য এটাই আমাদের তকদীর। আমরা সৌভাগ্যবান যে, এমন মহান কর্তব্য পালনের সুযোগ আমরা পেয়েছি। আমরা এই কর্তব্য
