বিন কাসিমের এই নীতি মুলতান বাহিনীর কোমর ভেঙে দিল। প্রতিদিনই ওরা বিপুল সহযোদ্ধাকে নিহত ও আহত করে দুর্গে ফিরে যাচ্ছিল। মুসলিম বাহিনী দেখে দেখে শত্রু সেনাদের মধ্য থেকে দু’চারজন আহতকে তুলে আনতো। আর নিহতদের মৃতদেহগুলো বড় গর্তে পুঁতে ফেলতো। কারণ নয়তো এগুলো পচে-গলে পরিবেশ দূষণ ঘটাবে। রোগ ব্যাধি ছড়াবে। যা হবে তাদের জন্য ভয়ঙ্কর।
দীর্ঘ দু’মাস পর্যন্ত চলল একই রীতির লড়াই। দু’মাস পর হিন্দু বাহিনী ঠিক এমন পর্যায়ে চলে গেল বিন কাসিম ওদের যে পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছিলেন। দু’মাসে তাদের অর্ধেকের চেয়ে বেশি সৈন্য মারা পড়ল। এরপরও হিন্দু সৈন্য সংখ্যা ছিল মুসলিম সৈন্য সংখ্যা থেকে দ্বিগুণ। তাছাড়া শহরের সব অধিবাসীই যুদ্ধে শরীক ছিল। বিন কাসিম মুলতানকে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটি হিসাবেই সাব্যস্ত করেছিলেন। শত্রু বাহিনীও বুঝতো, মুলতান দুর্গের পতন ঘটলে মুসলিম বাহিনীকে আর কোথাও ঠেকানো যাবে না। গোটা সিন্ধু অঞ্চল মুসলমানদের দখলে চলে যাবে। হিন্দুস্তানের দূরদরাজ পর্যন্ত মুসলমানদের পদানত হয়ে যাবে। এ জন্য বজরা ও কুরসিয়া মুলতান দুর্গ রক্ষার জন্য বড় ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতেও প্রস্তুতি নিল।
দু’মাসের মাথায় দুর্গের সৈন্যরা বাইরে এসে আক্রমণ করা বন্ধ করে দিল। বিন কাসিম দুদিন অপেক্ষা করলেন। কিন্তু দুদিনের মধ্যে দুর্গ থেকে একটি প্রাণীও বাইরে এলো না। দুদিন পর বিন কাসিম দুর্গ অবরোধ সম্পন্ন করার নির্দেশ দিলেন। দ্রুত গতিতে বিন কাসিমের সৈন্যরা দুর্গ অবরোধ করে প্রতিটি ফটকের বাইরে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নিল।
বিন কাসিম আগেই খবর পেয়েছিলেন, মুলতান দুর্গের প্রাচীরের ওপরে শত্রু সেনারা বহু ছোট ছোট মিনজানিক স্থাপন করেছে। এগুলো থেকে ছোট ছোট পাথর অবিরাম বর্ষণ করা মোটেও কোন মুশকিলের ব্যাপার নয়।
মুসলিম সৈন্যদের অবরোধ আরোপ করতে দেখে দুর্গপ্রাচীর থেকে বিরামহীন পাথর বর্ষণ শুরু হলো। অবশ্য এসব পাথর বেশী বড় ছিল না বলে তেমন ক্ষয়ক্ষতি করার ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু পাথরের আঘাত থেকে গা বাঁচানোর জন্য আরব সৈন্যরা তাদের অবস্থান একটু পিছিয়ে আনল।
শত্রুবাহিনীর পাথর নিক্ষেপের জবাবে বিন কাসিম তার বড় বড় মিনজানিক থেকে পাথর নিক্ষেপ করে শহরে হৈ চৈ ফেলে দিতে পারতেন কিন্তু তিনি বেসামরিক লোকদের জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি ও শহর ধ্বংসের আশঙ্কায় শত্রুদের আক্রমণের জবাব দেয়া থেকে নিবৃত্ত রইলেন। একেবারে নিরূপায় হওয়া ছাড়া তিনি মিনজানিক ব্যবহার থেকে বিরত থাকতেন।
অবরোধ আরোপের পর বিন কাসিম ঘোড়ায় চড়ে দুর্গপ্রাচীরের চতুর্দিকে ঘুরে ঘুরে দুর্গের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কিন্তু দুর্গপ্রাচীরের কোথাও কোন দুর্বলতা তাঁর গোচরিভূত হচ্ছিল না। বিন কাসিমের তীরন্দাজ ইউনিট তীব্রগতিতে এগিয়ে দুর্গপ্রাচীরে অবস্থানরত শত্রু সেনাদের ওপর তীর বর্ষণ করে ফিরে আসতো। তাতে শত্রু সেনাদের অনেকেই আহত ও নিহত হতো বটে কিন্তু তাতে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ কোন প্রভাবিত হচ্ছিল না। এ অবস্থা চলল বেশ কদিন। হঠাৎ একদিন বিন কাসিমকে খবর দেয়া হলো, সৈন্যদের জন্য সংরক্ষিত আহার্য কাচামাল শেষ হয়ে গেছে।
প্রয়োজন মতো খরচ করে বড়জোর আর তিন চার দিন চলবে। সেনাদের জন্য প্রয়োজনীয় আহার সামগ্রী আসবাবপত্র নিরূন, ব্রাহ্মণাবাদ ও উরুঢ়ে রয়ে গেছে। কিন্তু এগুলোর অবস্থান এতটাই দূরে যে, দু’এক দিনে সেখান থেকে আহার সামগ্রী এখানে নিয়ে আসা সম্ভব নয়। যে গতিতে সেনাবাহিনী এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত করা হয় আসবাব ও আহার সামগ্রী স্থানান্তর সেভাবে অসম্ভব। কারণ সেই যুগে গরুর গাড়ী উট ও গাধার পিটে করে ভারী মালপত্র পরিবহন করা হতো। নদী পথে নৌকা করে বহন করা হতো ভারী জিনিসপত্র। বস্তুত আহার সামগ্রী মুলতান থেকে দূরে ছিল বটে কিন্তু দীর্ঘ দিন মুলতানে অবস্থানের পরও বিন কাসিম কেন অতিরিক্ত আহার্য এখানে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করলেন না, এ ব্যাপারটি কোন ঐতিহাসিক উল্লেখ করেননি। হতে পারে প্রতি দিনের যুদ্ধ ব্যস্ততার কারণে আহার ও রসদ সামগ্রী
আমদানীর ব্যাপারটিকে আমলে নিতে পারেননি বিন কাসিম। এছাড়া হতে পারে তিনি যে কোন সময় দুর্গ জয়ের আশাবাদী ছিলেন। অথবা তার খাদ্য বিষয়ক কর্মকর্তারা সময় মতো তাঁকে খাদ্য পরিস্থিতির ব্যাপারটি অবহিত করতে পারেনি। সামগ্রিক ব্যাপারটি হতে পারে অব্যাহত দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে সবাই এতোটা ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আহার সামগ্রী নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি তেমনভাবে নজরে আনতে পারেনি। অবশ্য কাঁচামাল এখনও নিঃশেষ হয়ে যায়নি। খবর শুনেই বিন কাসিম খাবারের পরিমাণ অর্ধেক করার নির্দেশ দিলেন। ফলে মুসলিম যোদ্ধারা পূর্ণ আহারের জায়গায় অর্ধেক খাবার খেতে শুরু করল। এমতাবস্থায় কয়েকদিন চলার পর ভারবহন করার জন্য মুসলিম শিবিরে যেসব গাধা ছিল কিছু সৈনিক কয়েকটি গাধা জবাই করে খেয়ে ফেলল।
ঐতিহাসিক বালাজুরী লিখেছেন, দুর্গের বাইরের একটি ছোট খাল দুর্গপ্রাচীরের ভিতর দিয়ে দুর্গ ভেদ করে অপর পাশ দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল। এই নালাটি সতত প্রবাহমান এবং দুর্গবাসীর খাবার পানির প্রধান উৎস। আহত এক হিন্দু সৈনিক মুসলমানদের হাতে বন্দি ছিল। এই বন্দির ক্ষত তখনো পুরোপুরি সেরে ওঠেনি। মুসলমান সৈন্য শিবিরে যখন খাবার সংকট দেখা দিল তখন অফিসার সিপাহী সবার জন্যেই খাবার বরাদ্দ হ্রাস করে দেয়া হলো। এমতাবস্থায় কয়েদীদেরকেও অর্ধেক খাবার দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলো। বন্দিরা ভাবতে শুরু করল বন্দি হওয়ার কারণে তাদেরকে অর্ধেক খাবার দেয়া হচ্ছে। খাবার স্বল্পতায় কাতর হয়ে এই বন্দি এক পর্যায়ে মুসলিম সৈন্যদের কাছে আবেদন নিবেদন করতে শুরু করল। মারাত্মক জখম এমনিতেই তাকে দুর্বল করে ফেলেছে। এর ওপর অর্ধেক খাবারের পরিবর্তে তাকে যেন পুরোপুরি খাবার দেয়া হয়। সৈন্যরা তাকে জানালো বিষয়টি এমন নয়, শিবিরে খাবার সংকট দেখা দিয়েছে, এ জন্য খাবার অর্ধেক করে দেয়া হচ্ছে।
