সাথে সাথে রাজা কুরসিয়া বললেন, ‘আমি নির্দেশ দিচ্ছি দুর্গের প্রতিটি গেট শক্ত করে বন্ধ করে দাও এবং প্রতিটি ফটকের নিরাপত্তা রক্ষীর সংখ্যা দ্বিগুণ করে দাও।
এটার দরকার নেই কুরসিয়া! বলল বজরা। আমরা মুসলিমদের দুর্গ অবরোধের সুযোগই দেবো না। আমরা ওদেরকে দুর্গের বাইরেই ধ্বংস করে দেবো। বলল বজরা। আমরা দুর্গের বাইরে গিয়ে ওদের ওপর আক্রমণ চালাবো। শহরে ঘোষণা করে দাও, যেসব অধিবাসী তীর-ধনুক চালাতে পারে তারা সবাই যেন দুর্গপ্রাচীরের ওপরে চলে আসে, আর যারা অশ্বারোহণ ও তরবারী চালাতে পারে তারা সবাই যেন দুর্গের প্রধান ফটকে এসে জড়ো হয়। আর সৈন্যদেরকে বলো, সবাই যাতে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরেই শহরে ঢোল পেটানো শুরু হলো এবং কয়েকজন ঘোষক উচ্চ আওয়াজে মুসলিম সৈন্যদের আগমন ও রাজা কুরসিয়ার নির্দেশ ঘোষণা করতে লাগল। শহরের যেসব অধিবাসীর কাছে বেশী পরিমাণ ধনসম্পদ ও
স্বর্ণরূপা আছে তারা এগুলোকে লুকানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে গেল। শহরের লোকজন এদিক-ওদিক দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিল আর সৈন্যরা দ্রুততার সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। এদিকে মুসলিম সৈন্যরা নদী পার হয়ে শিবির স্থাপনের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল। এমন সময় মুলতান দুর্গের একটি ফটক খুলে দুর্গের ভিতর থেকে সশস্ত্র সৈন্য বাইরে আসতে শুরু করল। বাইরে বের হয়ে দুর্গের সৈন্যরা রণপ্রস্তুতি নিয়ে কাতার বন্দি হতে শুরু করল। কিন্তু এদিকে মুসলিম সৈন্যরা তখনো তাবু তৈরিতে ব্যস্ত।
মুলতানের যেসব সৈন্য যুদ্ধ করতে দুর্গ থেকে বেরিয়ে এলো, তাদের কমান্ড ছিল বজরার হাতে। দুর্গ থেকে বের হওয়ার সময় সে উত্তেজিত কণ্ঠে ঘোষণা করল, আজকের এক আক্রমণেই সে মুসলিম বাহিনীকে ধ্বংস করে দেবে। রাজা কুরসিয়াও বজরার হাতে কমান্ডের দায়িত্ব দেয়া সমীচীন মনে করল। কারণ বজরা ইতোমধ্যে মুসলমানদের সাথে মোকাবেলা করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
কুরসিয়া ও বজরা মনে করেছিল মুসলমানদের ওপর আক্রমণের এটিই মোক্ষম সময়। কারণ তারা জানত সারারাত মুসলিম বাহিনী নদী পারাপারে কাটিয়েছে। আর এখন শিবির স্থাপনে ব্যস্ত। অতএব বিরামহীনভাবে পরিশ্রমে ওরা ক্লান্ত-শ্রান্ত, নির্ঘম বিশ্রামহীন। অভিজ্ঞতার আলোকে শিবির স্থাপনে ব্যস্ত সৈন্যদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য রণসাজে সজ্জিত একদল সৈন্যকে পূর্ব থেকেই প্রস্তুত রেখেছিল বিন কাসিম। এই সৈন্যরা দুর্গ ও শিবিরের মাঝামাঝি জায়গায় সতর্ক অবস্থায় ছিল। প্রহরারত সৈন্যদের চেয়ে তিনগুণ বেশী সৈন্যকে বজরা আক্রমণের জন্য নির্দেশ দিয়ে দিলো। বিন কাসিম যখন দেখলেন বিপুল শত্রু বাহিনী তুফানের মতো এগিয়ে আসছে। তার নিযুক্ত পদাতিক ও মষ্টিমেয় আশ্বারোহী প্রহরীদের পক্ষে ওদের প্রতিরোধ করা অসম্ভব। তিনি তৎক্ষণাৎ নির্দেশ দিলেন, যেই অবস্থায় আছো, অস্ত্র নিয়ে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হও। কিন্তু আক্রমণকারীরা ছিল দ্রুতগামী। কর্মব্যস্ত সৈন্যরা তাদের ঘোড়ার জিন লাগানোর আগেই বজরার সৈন্যরা প্রহরীদের কাছে পৌছে গেল। শুরু হলো তিনগুণ বেশী সৈন্যের সাথে এক তৃতীয়াংশ জনবলের আরেকটি অসম লড়াই। বজরা ছিল খুব সতর্ক। সে আগেই তার কমান্ডারদের বলে দিয়েছিল, মুসলিম সৈন্যরা যদি পিছনে সরতে থাকে তবে তাদের পশ্চাদধাবন করা থেকে বিরত থাকবে, নইলে ওদের ঘেরাওয়ে পড়তে হবে। কারণ সে
জানতো, শিবির স্থাপনে ব্যস্ত সৈন্যরাও কাল বিলম্ব না করে তাদের সহযোগীদের রক্ষার জন্য এগিয়ে আসবে।
বিন কাসিমের অবস্থা ছিল ত্রিশঙ্কু। কারণ তখনো আরব থেকে তার সাহায্য সামগ্রী এসে পৌছেনি। তিনি আশঙ্কা করছিলেন দুর্গে বিপুল পরিমাণ সৈন্য রয়েছে। বাইরের সৈন্যরা যদি মুসলমানদের কাবু করতে পারে তাহলে দুর্গের অবশিষ্ট সৈন্যরা বেরিয়ে এসে যুদ্ধের পরিস্থিতি আয়ত্বের বাইরে নিয়ে যেতে পারে।
আক্রমণকারীরা বাস্তবেই প্রহরাধীন ইউনিটের ওপর সংহারী আক্রমণ চালালো। বিন কাসিম নিজেকে সামলে নিয়ে কমান্ডারদের বললেন, তোমরা আক্রমণকারীদের পিছন দিকে যেতে চেষ্টা করো এবং দু’পাশ দিয়ে ওদের দু’পাশে জোরদার আক্রমণ করো।
কমান্ডারগণ বিদ্যুৎ বেগে তাদের সৈন্যদেরকে সারিবদ্ধ করে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিল। মুসলিম সৈন্যদেরকে আসতে দেখে বজরা তার সৈন্যদের চিৎকার করে পিছনে চলে আসার নির্দেশ দিতে শুরু করল।
এদিকে বিন কাসিম তাঁর সৈন্যদের বললেন, তোমরা ওদের পিছনে চলে যাও, ওদের পিছানোর সুযোগ দেবে না। বিন কাসিমের প্রতিটি নির্দেশ দ্রুততার সাথে বার্তাবাহকদের মাধ্যমে কমান্ডারদের কাছে পৌছে যাচ্ছিল। কারণ যুদ্ধরত অবস্থায় পয়গাম পৌছানোর কাজে এসব বার্তাবাহক ছিল অস্বাভাবিক পারদর্শী। আরব সৈন্যরা বজরার সৈন্যদের ঘেরাও করার জন্য দুই বাহু প্রলম্বিত করতে শুরু করলে বজরা তার সৈন্যদেরকে দুর্গে ফিরে আসার জন্য চিৎকার করে নির্দেশ দিচ্ছিল। নির্দেশ মতো বজরার সৈন্যরা দুর্গফটকের কাছাকাছি পিছিয়ে যেতে লাগল। এদিকে বিন কাসিম তার কমান্ডারদের পয়গাম পাঠালেন, শত্রু সেনাদেরকে তাড়া করে তোমরা দুর্গফটকের কাছে চলে যাও, শত্রু সেনারা যখন দুর্গে প্রবেশ করতে শুরু করে তখন তোমরা ওদের পিছু ধাওয়া করে দুর্গে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করো।
