এলাকা মুসলমানদের হাতে তুলে দিয়েছি। সেই সাথে ভবিষ্যত প্রজন্ম। আমাদেরকে এই অপরাধেও অপরাধী সাব্যস্ত করবে, মুসলমানদের জন্য সিন্দু অঞ্চলের দরজা আমরাই খুলে দিয়েছি।
কি বলতে চাচ্ছো তুমি? তুমি কি মনে করছ, আমি লড়াই এড়িয়ে যেতে চাচ্ছি। তুমি কি আমাকে কাপুরুষ ভাবছো? বলল রাজা কুরসিয়া। না, মহারাজ! আমি আপনার কাছে এসেছি, একথা জানানোর জন্য যে, কাকসা ও সিককা থেকে যেসব সৈন্য ও বাস্তহারা লোক আমাদের দুর্গে এসেছে, এরা মুসলমানদের সম্পর্কে সেনাবাহিনী ও মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
সবচেয়ে ভয়ানক কথা এরা যা বলছে, তাহলো, মুসলমানরা দানবের মতো যুদ্ধ করে। কিন্তু যারা যুদ্ধ ও লড়াই না করে তাদের সামনে আত্মসমর্পণ করে, তাদের সাথে তারা সহোদর ভাইয়ের মতোই সদাচরণ করে। তারা কারো ঘর-সম্পদ লুটতরাজ করে না, বরং সাধারণ মানুষকে পুরোপুরি নিরাপত্তা দেয়। তাছাড়া একথাও প্রচারিত হচ্ছে, মুসলমানরা কাউকে ধর্মান্তরে বাধ্য করে না। এটার অবশ্যই একটা বিহিত করা দরকার মহারাজ। তাছাড়া লোকজনের মধ্যে একথাও ছড়িয়ে পড়েছে সিককার শাসক মহারাজ বজরাও পালিয়ে এখানে চলে এসেছেন।
এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। আমি পালিয়ে আসিনি। আমি লড়াই থেকেও বিমুখ ছিলাম না। কিন্তু আমার সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। প্রতারণা করে আমার দুর্গের দরজা খুলে দিয়েছিল কুচক্রীরা। তোমরা শহরের লোকজনকে এক জায়গায় জড়ো করো, আমি তাদের মুখোমুখি হয়ে এসব মিথ্যা প্রচারণার জবাব দেবো। এসব আসলে আমাদের শত্রুদের চালানো অপপ্রচার। বলল বজরা। সে তখন কুরসিয়ার পাশেই বসা ছিল।
সেই দিনই মুলতান দুর্গের সকল সৈন্য ও গণ্যমান্য লোককে এক জায়গায় জড়ো করা হলো। কুরসিয়া ও বজরা ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে সভাস্থলে হাজির হলো। বজরা তার ঘোড়াকে এগিয়ে নিয়ে উপবিষ্ট সৈন্য ও শহরের প্রভাবশালীদের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল এবং বলল-প্রিয় দেশমাতৃকার সাহসী সন্তানেরা! শোন! “আমাদের বলা হয়েছে, শহরে এমন সব অপপ্রচার চলছে, যা শুনে সাধারণ মানুষ মুসলমানদের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এসব অপপ্রচার আমাদের ভিতরের লোকজনই প্রচার করছে। এরা এদেশের গাদ্দার। এরা সেইসব কাপুরুষদের চর যারা মুসলমানদের কাছে আত্মসমর্পণ
করে গোলামীর জীবন বেছে নিয়েছে। এরা গোলামীর বিনিময়ে নগদ টাকাপয়সা ও মুসলমানদের দেয়া পদ লাভ করেছে। আমার সম্পর্কে বলা হচ্ছে, আমি মুসলমানদের হাতে দুর্গ তুলে দিয়ে এখানে পালিয়ে এসেছি। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। কতিপয় গাদ্দার শত্রুদের সুযোগ করে দিতে আমার দুর্গের একটি গেট রাতের অন্ধকারে খুলে দিয়েছিল। অসীম সাহসিকতার জন্যই এমতাবস্থায়ও আমি দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি। নয়তো আমি কাপুরুষ হলে তাদের হাতে আত্মসমর্পণ করতে পারতাম। এখানে আমি এসেছি মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। আগামী দিনে তোমরা নিজেদের চোখে দেখতে পারবে, আমি কিভাবে তাদের হত্যা করি।
মুসলমানরা দানবের মতো লড়াই করে, এটা বিলকুল মিথ্যা কথা। যারা তাদের সামনে আত্মসমর্পণ করে তাদেরকে ওরা খুব খাতির যত্ন করে এ কথাও সত্য নয়। এরা কাউকেই ক্ষমা করে না। সকল হিন্দুর ঘর সম্পদ লুটে নেয়, আর হিন্দু যুবতীদের ধরে নিয়ে যায়। তোমরা সিককার অবস্থায়ই দেখো না, জানোয়ারগুলো গোটা শহরটা ধ্বংস করে দিয়েছে। আর সকল যুবতী মেয়েদেরকে ওরা ধরে নিয়ে গেছে। এখানে তোমরাও যদি কাপুরুষের বহিঃপ্রকাশ ঘটাও তাহলে তোমাদেরকেও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে। লড়াই না করলেও তোমাদেরকে ওরা প্রাণভিক্ষা দেবে না। তোমাদের যুবতী কন্যা জায়াদের সম্বম বাঁচাবে না। বাকী জীবনটা ওদের গোলামী করে ক্ষুধাপিপাসায় ধুকে ধুকে মরতে হবে। যারা ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হবে তারা হয়তো কদিনের সুখ পাবে। কিন্তু ধর্মত্যাগের অপরাধে নিশ্চয়ই তাদেরকে দেবদেবীদের অভিশাপে নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে।
বজরার ভাষণ ছিল আবেগ ও উত্তেজনা সৃষ্টিকারী। মিথ্যার বেসাতী করে বাস্তব সত্যকে আড়াল করে ফেলেছিল সে। বজরার প্রত্যাশা মতো তার ভাষণ শুনে স্রোতারাও উত্তেজিত হয়ে উঠল। উপস্থিত সৈন্য ও শহরের অভিজাত শ্রেণির লোকেরা বজরার বক্তৃতায় উত্তেজিত হয়ে মুসলমান বিরোধী শ্লোগানে সভাস্থল মুখরিত করে তুলল। উত্তেজনাপূর্ণ স্লোগান শুনে শহরের অন্যান্য লোকেরাও এসে জমায়েত হলো এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে স্লোগানে শ্লোগানে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তুলল।
এরপর কুরসিয়া ও বজরা মিলে শহরের প্রতিরক্ষা ব্যুহকে আরো মজবুত করার কাজে মনোযোগী হলো। এদিকে বিন কাসিমকে আগেই অবহিত করা হয়েছে, মুলতান দুর্গপ্রাচীরের ওপরে বহুসংখ্যক ছোট ছোট মিনজানিক স্থাপন
করা হয়েছে। এগুলো দিয়ে ছোট আকারের পাথর অনবরত নিক্ষেপ করা যায়। অবশ্য গোয়েন্দারা বহু খোঁজ-খবর নিয়ে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হলো যে, মুলতানের সৈন্যদের কাছে অগ্নিবাহী কোন তীর নিক্ষেপণ ব্যবস্থা নেই।
সিককা শহরকে ধ্বংস করে দেয়ার কারণে সেখানে কোন প্রশাসক ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের চিন্তা ছিল না। ফলে রাতেই নদী পার হওয়ার জন্য নৌকার পুল তৈরির নির্দেশ দিলেন বিন কাসিম। পুল তৈরির কাজ শুরু হওয়ার সাথে সাথে কিছু সৈনিককে নৌকা দিয়ে নদীর অপর প্রান্তে পাঠিয়ে দেয়া হলো। যাতে পুল তৈরিতে শত্রুবাহিনী কোন ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করতে না পারে। সকালে সূর্য ওঠার আগেই মুসলিম বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য নদীর ওপারে চলে যেতে সক্ষম হয়। বড় বড় মিনজানিকগুলোকে বড় বড় নৌকায় করে বয়ে আনা হয়েছিল। নদী পেরিয়ে মুলতানের কিছুটা দূরে শিবির স্থাপনের জন্য বিন কাসিম সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন। মুসলিম বাহিনী নদী পার হওয়ার সাথে সাথেই মুলতান দুর্গে খবর পৌছে গেল। মুসলিম বাহিনী এসে গেছে; এ খবরে দুর্গ জুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়ে গেল। রাজা কুরসিয়া ও বজরা এ খবরের সত্যতা যাছাই করার জন্য দুর্গপ্রাচীরে এসে দাঁড়াল। তারা দেখতে পেল, মুসলিম সৈন্যরা মুলতান দুর্গের অনতি দূরে শিবির স্থাপন করছে।
