মুসলমানদের হাতে সিককা নগর নিশ্চিহ্ন হওয়ার প্রেক্ষিতে উচিত ছিল, হিন্দুস্তানের সকল রাজা-মহারাজার ঐক্যবদ্ধভাবে বিন কাসিমের মোকাবেলায় অগ্রসর হওয়া। কিন্তু তখন কেউই কারো নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রাখতে পারছিল না। ফলে সবাই চাচ্ছিলো, নিজেদের করণীয় সম্পর্কে তারা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবে।
বিন কাসিম ধ্বংসকৃত সিককা নগরের অনতি দূরে দাঁড়িয়ে শহরের ধ্বংসাবশেষ প্রত্যক্ষ করছিলেন। জানা নেই তার হৃদয়ে তখন কি ভাবনার উদয় ঘটেছিল। একটি উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে তার সেনাদের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তাঁর দৃষ্টি প্রদক্ষিণ করছিল তার সেনাদের ওপর। তিনি দেখছিলেন তার কয়েকজন আহত সেনাকে যাদের দেহে পট্টি বাঁধা। তিনি তখন কিভাবে ছিলেন তা বলা সম্ভব না হলেও তার চেহারায় যে অভিব্যক্তি ফুটে উঠছিল, তা আর কখনো দেখা যায়নি।
কিছুক্ষণ পর বিন কাসিম একটি ঘোড়ার পিঠে চড়ে নদীর দিকে রওয়ানা হলেন। নদীটির নাম ছিল ‘চন্নাব নদী। এই নদী সিককা ও মুলতান শহরকে বিভক্ত করে রেখেছে। নদীটি না থাকলে সিক্কা ও মুলতান এক শহরেই পরিণত হতো। মুলতান ছিল সম্পূর্ণ দুর্গবন্দি শহর। বিন কাসিমের কাছে এখন সর্বাগ্রে মুলতান শহরের দুর্গপ্রাচীরের অবস্থা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার খোঁজ-খবর নেয়াটাই জরুরী বিষয় হয়ে দেখা দিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের লেবাস পরিহিত তিন চারজন লোক বিন কাসিমকে নদীর দিকে এগুতে দেখে তার দিকে এগিয়ে এলো। আগন্তুকদের একজনকে বিন কাসিম দূর থেকেই চিনি ফেললেন। তিনি ছিলেন তারই গোয়েন্দা প্রধান শাবান ছাকাফী। কৌশলগত কারণে গোয়েন্দা প্রধান নিজেও স্থানীয় মানুষের বেশভূষা ধারণ করেছিলেন। বেশ বদলালেও বিন কাসিম তার গোয়েন্দা প্রধানকে ঠিকই চিনে নিতে পারতেন। আগন্তুক সবাই বিন কাসিমের কাছে এসে থেমে গেল। শাবান ছাকাফী দুই সঙ্গিকে বিন কাসিমের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ইবনে কাসিম! এরা দুজন জেলে। এরা বলছে, সিক্কার শাসক বজরা এদের নৌকা করেই নদীর অপর পারে চলে গেছে।
‘এতে কোন সন্দেহ নেই যে, বজরা নদী পার হয়ে মুলতান দুর্গে আশ্রয় নিয়েছে। এরা হয়ত আপনাকে এও বলেছে, সিককা থেকে কি পরিমাণ সৈন্য নদী পেরিয়ে মুলতানে আশ্রয় নিয়েছে।’ তা বলেছে। কিন্তু তাদের সংখ্যা তেমন আশঙ্কাজনক নয়। জবাব দিলেন গোয়েন্দা প্রধান। এদের ছাড়া আমি আরো নৌকাওয়ালাদের জিজ্ঞেস করেছি, তখন নদীতে বেশী নৌকা ছিল। এই দুই জেলেকে বজরার লোকেরা পাকড়াও করে তাদেরকে নদী পার করে দিতে বাধ্য করেছিল।
কথাবার্তার পর দুই জেলেকে ছেড়ে দেয়া হলো। বিন কাসিম গোয়েন্দা প্রধানকে চোখের ইশারায় একটু দূরে সরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি মুলতান দুর্গের খবর সংগ্রহের জন্য যাদের পাঠিয়েছিলেন এরা কি ফিরে এসেছে?
সিক্কা বিজয়ের আগের দিনই মুলতানে কয়েকজন স্থানীয় লোককে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য পাঠানো হয়েছিল। প্রেরিত লোকদের সবাই ছিল মুকুর দলের লোক। এরা স্থানীয় হলেও বিন কাসিমের প্রতি ছিল শ্রদ্ধাশীল ও বিশ্বস্ত। মুকু নিজেও বিন কাসিমের সাথে ছিল। সংখ্যা বেশী না হলেও স্থানীয় হওয়ার কারণে এরা ছিল বিন কাসিমের অভিযানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী।
বিন কাসিম গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফীকে যেদিন মুলতান প্রেরিত গোয়েন্দাদের ফিরে আসার কথা জিজ্ঞেস করছিলেন, এর পূর্ব রাতেই ফিরে এসেছিল গোয়েন্দারা। এরা সিককা থেকে পালিয়ে যাওয়া উদ্বাস্তুদের দলে মিলে গিয়েছিল ওদের মতোই পোশাক পরিচ্ছদে। তারা কৌশলে মুলতান শহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সৈন্য সংখ্যা, দুর্গের গঠন ও দুর্বলতার ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতে গিয়েছিল। এ ছাড়াও তারা মুসলিম সৈন্যদের ব্যাপারে মুলতানবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ও ভীতি ছড়িয়ে দেয়। এরা একজন একজন করে দল ছেড়ে বিভিন্ন মানুষের জটলায় গিয়ে সিককায় মুসলমানদের ধ্বংসাত্মক ভূমিকা এবং মুসলিম সৈন্যদের বীরত্ব ও শৌর্য বীর্যের কাহিনী এমন ভাষায় বর্ণনা করছে, যা শুনে সাধারণ মুলতানবাসীতো বটেই সৈন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।
এটা ছিল এক ধরনের প্রচারণা যুদ্ধ। এই কৌশল ছিল খুবই কার্যকর একটা ব্যবস্থা। যেসব সেনা সিককা থেকে পালিয়ে এসেছিল এরাও বলছিল, মুসলিম সৈন্যরা খুবই দুঃসাহসী। তারা নিজেরাও কাপুরুষ ছিল না। কিন্তু তারপরও তাদের পালিয়ে আসা ও পরাজয়কে যুক্তিগ্রাহ্য করতে মুসলিম সৈন্যদের বীরত্ব ও যুদ্ধ কৌশলের কথা এভাবে বলছিল যে, মুসলমানদের মোকাবিলা করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। ওদের সাথে অলৌকিক শক্তি রয়েছে।
মুলতান দুর্গে এ খবর ছড়িয়ে পড়ল, সিক্কার শাসক বজরা দুর্গ থেকে পালিয়ে মুলতান এসে আশ্রয় নিয়েছে। এ খবরে মুলতানের সেনা বাহিনীর মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু বজরা ততোটা ভীত ছিল না। মুলতানের শাসক ছিল রাজা কুরসিয়া। কুরসিয়া ছিল রাজা দাহিরের সম্পর্কে ভাতিজা। দাহিরের এক ভাই চন্দ্রের ছেলে কুরসিয়া। বজরা সেখানে গিয়ে কুরসিয়াকে উজ্জীবিত করছিল।
“মহারাজ! এখন আমাদের কাজ হলো, আরব সেনাদের জন্য মুলতানকেই শেষ ঠিকানায় পরিণত করা এবং মুলতান দুর্গ এদের জন্য কবরস্থানে রূপান্তরিত করা।” বলল কুরসিয়ার এক সেনা কর্মকর্তা। মুলতানেও যদি আমরা এদের পথ রুদ্ধ করতে না পারি তাহলে ইসলামের পাবনকে কেউ রোধ করতে পারবে না। তাহলে ভবিষ্যত প্রজন্ম আমাদের ঘৃণা ভরে স্মরণ করবে, আর বলবে, আমরা কাপুরুষের মতো গোটা সিন্ধু
