এ ভাবে চার পাঁচ দিন চলে গেল। দুর্গ থেকে বেরিয়ে হিন্দু সৈন্যরা যুদ্ধ করতো, আবার দিন শেষে দুর্গে ফিরে যেত। তাতে তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছিল বটে কিন্তু ক্ষতি থেকে মুসলমানরাও মুক্ত ছিল না।
কিন্তু চার পাঁচ দিন যুদ্ধের পরও সিককার সৈন্যদের যুদ্ধ উন্মাদনায় কোন ঘাটতি দেখা গেল না। বিন কাসিম সেনাপতি ও কমান্ডারদের নির্দেশ দিলেন, তারা যেনো মুসলিম সৈন্যদেরকে বিরতি দিয়ে লড়াই
করায় এবং দুই বাহুর সৈন্যরা যাতে ওদেরকে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে না দেয়। ওদেরকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ক্লান্ত করে ফেলে এবং তীরন্দাজরা তীরের চেয়ে বর্শার ব্যবহার বেশি করে। এভাবেও তিন চার দিন যুদ্ধ হলো। এই কৌশলে মুসলমান সৈন্যরা ছিল খুবই পারদর্শী। পারদর্শিতার সাথেই তারা এই চাল প্রয়োগ করল। তাতে শত্রুবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলো বটে কিন্তু তাদের আবেগ ও উচ্ছাসে ভাটা পড়ল না।
শেষ দিন গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী বিন কাসিমকে জানালেন, দুর্গপ্রাচীরের ওপরে যেসব লোক রয়েছে এদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। সৈন্যরা সবাই দুর্গের বাইরে এসে যুদ্ধ করে। কিন্তু যুদ্ধে আহত সৈন্যদেরকে ওরা কখনই উঠিয়ে নেয়ার চেষ্টা করত না। এরা ময়দানেই মরণযন্ত্রণায় ভুগে এক সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। শাবান ছাকাফী প্রতি দিনই ময়দান থেকে দু’একজন আহত শত্রু সৈন্যকে তুলে এনে ওদের চিকিৎসা ও সেবা শুশ্রুষা করে তাদের প্রাণভিক্ষা দেয়ার আশ্বাস দিয়ে ওদের কাছ থেকে ভিতরের তথ্য বের করে নিতেন। তুলে আনা শত্রুসৈন্যরা প্রাণে বাঁচার আশায় দুর্গের অভ্যন্তরের সব খবর শাবান ছাকাফীকে জানিয়ে দিতো। আহত হিন্দু সৈন্যরা তাকে জানিয়েছে, দুর্গপ্রাচীরের ওপরে কোন নিয়মিত সৈনিক নেই, সবাই শহরের বেসামরিক নাগরিক। তারাই তীরবর্শা দিয়ে প্রতিরোধ করছে। এটাও জানালো, শহরের সকল নাগরিক মন্দিরে গিয়ে জীবন দিয়ে হলেও শহর রক্ষার শপথ নিয়েছে। সর্বশেষ তুলে আনা আহত সৈন্যরা শাবান ছাকাফীকে জানালো, দুর্গে সৈন্যসংখ্যা মারাত্মক কমে গেছে এবং খাবারও ফুরিয়ে এসেছে। মুলতান থেকে সাপ্লাই আসতে পারছে না।
এরপর বিন কাসিম দুর্গের চতুর্দিকে বলিষ্ঠ কণ্ঠধারী ঘোষক দিয়ে ঘোষণা করালেন, শহরের সাধারণ নাগরিকরা যদি সৈন্যদের সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকে তাহলে তাদের সবাইকে ক্ষমা করা হবে, অন্যথায় তাদের কঠিন মূল্য দিতে হবে। তাদের আরো বলা হলো, সৈন্যদের অবস্থা দেখো, ওরা বেশি দিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে না, শেষ পর্যন্ত জয় আমাদের হবেই। অতএব, আমাদেরকে মোকাবেলায় সময় নষ্ট না করে স্বাগত জানানোর মধেই তোমাদের কল্যাণ নিহিত।
উচ্চকণ্ঠের অধিকারী স্থানীয় ঘোষক দিয়ে বিন কাসিম দুর্গের চতুর্দিকে বার বার এই ঘোষণা দেয়ালেন। কিন্তু এই ঘোষণার জবাবে দুর্গপ্রাচীরে থেকে অধিবাসীরা মুসলমানদের বিদ্রুপ করতে লাগল। তাদেরকে মন্দিরের পুরোহিতরা বলেছিল, শেষ পর্যন্ত বিজয় হিন্দুদেরই হবে, মুসলিম বাহিনী পরাজিত ও ধ্বংস হয়ে যাবে।
পুরোহিতদের ভবিষ্যদ্বাণীতে হিন্দু অধিবাসীরা এতোটাই আশ্বস্ত ছিল যে, তারা চোখের সামনে সৈন্যদের শক্তি হ্রাস পাওয়া এবং দুর্গের ভিতরকার খাবার সামগ্রী শেষ হওয়ার ব্যাপারটি আমলেই নিলো না। তারা মুসলমানদের প্রতি নানা বিদ্রুপাত্মক অঙ্গভঙ্গি ও গালিগালাজ করছিল। ইসলামকে হেয় প্রতিপন্ন করছিল। এক পর্যায়ে দুর্গপ্রাচীরের ওপর থেকে আওয়াজ এলো, হে মুসলমানেরা! আমরা মন্দিরে দেবদেবীর সামনে শপথ নিয়েছি, হয় তোমাদের ধ্বংস করবো নয় তো আমরা ধ্বংস হয়ে যাব। এ কথা বিন কাসিমও নিজের কানে শুনতে পেলেন। প্রলম্বিত এ যুদ্ধে। ইতোমধ্যে মুসলিম বাহিনীর তিন সেনাপতি ও সতেরো জন কমান্ডার নিহত হয়েছিলেন। দুর্গপ্রাচীরের এই দম্ভোক্তি বিন কাসিমের রক্তে আগুন ধরিয়ে দিলো, তিনি হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতি ও কমান্ডারদের মৃত্যুতে এমনিতেই তিনি ছিলেন ব্যথিত মর্মাহত। এ পর্যায়ে হিন্দুদের দম্ভোক্তি তাকে উত্তেজিত করে তুলল। তিনি বলে উঠলেন-আল্লাহর কসম! আমি এই শহর নিশ্চিহ্ন করে দেব। অবশেষে টানা সতেরো দিন যুদ্ধের পর আঠারোতম দিনে যখন দুর্গের ফটক খুলে হিন্দু সৈন্যরা সামনে অগ্রসর হলো বিন কাসিম ওদের আক্রমণের নির্দেশ দিলেন, তখন হিন্দুযোদ্ধাদের একাংশ দুর্গের ভিতরে ঢুকে পড়ল। তিনি আরো লক্ষ্য করলেন, শত্রুসেনাদের মধ্যে আগের মতো আর আবেগ উচ্ছাস নেই। তিনি বুঝে নিলেন, নিশ্চয় ওদের কোথাও দুর্বলতা সৃষ্টি হয়েছে, তিনি জোরদার আক্রমণের নির্দেশ দিলেন।
মুসলিম যোদ্ধারা শৃঙ্খলা বজায় রেখেই জোরদার আক্রমণ চালালো। মুসলমানদের আক্রমণে হিন্দুরা ফটকের দিকে পালাতে শুরু করল। বিন কাসিম তীরন্দাজদের নির্দেশ দিলেন, তারা যেন দুর্গপ্রাচীরের ওপরে তীব্র আক্রমণ অব্যাহত রাখে। দুর্গের সৈন্যরা দুর্গপ্রাচীর ও মুসলমানদের আক্রমণের মাঝে আটকে গেল। যারাই সুযোগ পাচ্ছিল ফটক গলিয়ে দুর্গের ভিতরে পালিয়ে যাচ্ছিল। ওদের পশ্চাদ্ধাবন করে মুসলিম সৈন্যরা দুর্গে ঢুকে
পড়ছিল। এভাবে একপর্যায়ে কয়েকটি মুসলিম ইউনিট দুর্গের ভিতরে ঢুকে পড়ে। মুসলমান সৈন্যদের দুর্গের ভিতরে দেখে যেসব হিন্দু দুর্গপ্রাচীরের ওপরে বসে তীর নিক্ষেপ করছিল এরা পালিয়ে গেল।
