তোমরা বোঝাতে চাচ্ছো, সিহরী ও পুরোহিতরা তোমাদেরকে লড়াই। করতে বাধ্য করেছে।
হ্যাঁ, আমরা আপনাকে আমাদের প্রকৃত অবস্থা বুঝানোর জন্যই বিস্তারিত বলছি। আমরা আপনার কাছে যাতে আমাদের অপরাধের ক্ষমা পেতে পারি এজন্য আমরা প্রকৃত ঘটনা আপনাকে অবহিত করছি। সিহরা ও পুরোহিতরা আমাদেরকে যুদ্ধের জন্য প্ররোচিত করার পর বলল, আজ দিনের শেষ ভাগে আমরা মুসলমানদের ওপর এমন আক্রমণ চালাবো যে, মুসলমানরা পালানোর পথ পাবে না। এরপর সরকারি সৈন্যরা সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ল। শহরে যত যুবক ও সামর্থবান পুরুষ ছিল সবাইকে নিজ নিজ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সৈন্যদের সাথে লড়াইয়ে শরীক হওয়ার আহবান জানালো। তারা বলল, আজ বিকেলে মুসলিম বাহিনীকে চিরদিনের জন্য নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার উদ্দেশে আখেরী হামলা চালানো হবে। এসো সবাই নিধনযজ্ঞে শামিল হও। একথা শুনে শহরের সকল সক্ষমপুরুষই নিজ নিজ হাতিয়ার নিয়ে সৈন্যদের সাথে মুসলিম নিধনযজ্ঞে শামিল হলো। সন্ধ্যার সামান্য আগে সৈন্য ও শহরের লোকেরা মিলে আপনাদের ওপর আক্রমণ চালালো।
সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলে অক্ষত সৈন্য ও বেঁচে যাওয়া লোকজন দুর্গে ফিরে গেল। আমরা রাতে সিহরার প্রাসাদে গিয়ে দেখি সে নেই। প্রাসাদের এক রক্ষী বলল, সকল সৈন্যও লোকেরা যখন যুদ্ধে লিপ্ত তখন সিহরা তার প্রাসাদে রক্ষিত সকল সোনাদানা মনিমুক্তা দামী আসবাবপত্র জড়ো করল। পূর্ব থেকেই প্রাসাদের সামনে কয়েকটি ঘোড়া প্রস্তুত ছিল। এমনসময় এক সৈনিক দৌড়ে এসে সিহরাকে কানে কানে কি যেন বলে সব মালপত্র একটি ঘোড়ার পিঠে তুলে অন্য ঘোড়ার পিঠে সিহরার পরিবার-পরিজনকে তুলে অদৃশ্য হয়ে গেল। সাথে সাথে সিহরাও গায়েব হয়ে গেল। জানা নেই তারা কোন দিক দিয়ে দুর্গ ছেড়ে গেছে। বিন কাসিম প্রতিনিধি দলের আবেদন মঞ্জুর করলেন এবং জিযিয়া ছাড়া তাদের ওপর কোন জরিমানা ধার্য করেননি। তিনি প্রতিনিধি দলকে আশ্বাস দিলেন, তোমরা আগে যেসব নাগরিক সুবিধা ভোগ করতে সেসব সুবিধার সবগুলোই তোমাদের বহাল থাকবে।
দুর্গে প্রবেশ করার পর গোয়েন্দা প্রধান বিভিন্ন লোকজনের কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে চেষ্টা করলেন, সিহরা কোন দিক দিয়ে পালিয়ে গেছে। অনেক জিজ্ঞাসাবাদ ও অনুসন্ধানের পর তিনি জানতে পারলেন, পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত আগেই করে রেখেছিল সিহরা কিন্তু অবরোধের কারণে তার পক্ষে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। অবশেষে সে শহরের সকল লোকও
সৈন্যদের দিয়ে অবরোধের একপাশে এমন জোরদার আক্রমণ করল যে, সকল মুসলিম সৈন্য প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে বাধ্য হলো। এই হামলাও করল সন্ধ্যার ঠিক আগমুহূর্তে। দু’পক্ষের আক্রমণ প্রতি আক্রমণের মধ্যেই সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলো আর এই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে খালি জায়গা দিয়ে সিহরা তার পরিবার-পরিজন নিয়ে পালিয়ে গেল। এদিকে যে দুই পুরোহিত যুদ্ধের জন্য লোকজনকে প্ররোচিত করেছিল তারাও গায়েব। রাতের বেলায় যুদ্ধ ফেরত লোকজন যখন দেখল তাদের শাসক ও ধর্মগুরু কেউই নেই, তখন শহরের লোকেরা সবাই মিলে পরামর্শ করে তাদের জীবনও সম্পদ রক্ষার আবেদন জানানোর জন্য বিন কাসিমের কাছে এই প্রতিনিধিদলকে পাঠাল। অত:পর বিজয়ী বেশে বিন কাসিম আসকালন্দ দুর্গে প্রবেশ করলেন। এবং উতবা বিন সালামা তামিমীকে আসকালন্দ দুর্গের শাসক নিযুক্ত করলেন। ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, প্রায় বারো হাজারের মতো হিন্দু সেদিন আসকালন্দ দুর্গের বাইরে নিহত হয়েছিল এবং হাজারেরও বেশী আহত হয়েছিল।
বর্তমানে যে সিন্ধু প্রদেশ রয়েছে এর পুরো এলাকাটিই তখন বিন কাসিমের দখলে চলে আসে। অবশ্য রাজা দাহিরের রাজত্বের পরিধি মুলতান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বিন কাসিমের পরবর্তী গন্তব্য ছিল মুলতান। বিন কাসিম মুলতানের নকশা মেলে অভিযানের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করছিলেন। স্থানীয় উপদেষ্টাগণ বিন কাসিমকে জানালেন, মুলতানের আগে সিককা নামে একটি দুর্গ রয়েছে সেটিকে অবশ্যই জয় করতে হবে। ইতিহাসে বর্ণিত সিককা নগরীর কোন চিহ্ন বিদ্যমান নেই। জানা যায় সিককা শহরের অবস্থান ছিল চুন্নাব নদীর পূর্বতীরে মুলতান শহরের অপর পাশে। সিককা শহর ও মুলতানের মাঝে যদি নদী না থাকত তাহলে উভয় শহর একই শহরে রূপান্তরিত হতো। সিককা নগরের শাসক ছিল রাজা দাহিরের ভাতিজা বিজয়রায়ের সহোদর বজরা এবং মুলতানের শাসক ছিল রাজা দাহিরের ভাই চন্দ্রের ছেলে কুরসিয়া। কোন কোন ঐতিহাসিক বলেছেন, মুলতানের শাসকের নাম ছিল গৌরাঙ্গ। কাকসা বিন কাসিমকে জানালেন, কুরসিয়াও এভাবেই লড়াই করবে। তাই ওর সৈন্যদেরকে দুর্গের বাইরেই দুর্বল করে ফেলতে হবে। বিন কাসিম কাকসার পরামর্শকে পছন্দ করলেন, তিনি পাথর নিক্ষেপ ও অগ্নিবাহী তীর
নিক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে চেষ্টা করতেন। কারণ তাতে দুর্গের অধিবাসীদের মধ্যে আতঙ্কই শুধু ছড়িয়ে পড়তো না, দুর্গের লোকজনের ব্যাপক ধনসম্পদ ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি হতো। বিন কাসিম বিজিত এলাকার লোকজনের কাছ থেকে কর ও জিযিয়া আদায় করতেন। কিন্তু পাথর ও আগুনে ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেলে জিযিয়া আদায় করা অসম্ভব হয়ে যেত। লোজন বলত, আমাদের সব কিছুই তো ধ্বংস হয়ে গেছে, আমাদের জীবন ব্যয় মিটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় জিযিয়া কিভাবে পরিশোধ করব? অথচ যুদ্ধের ব্যাপক ব্যয় নির্বাহে জিযিয়া প্রাপ্তির বিষয়টি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরদিন ভোরের সূর্য যখন চতুর্দিকে আলো ছড়ালো, তখন মুসলিম সৈন্যরা যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে সিককার সৈন্যদের মুখোমুখি দাঁড়ানো। বেলা কিছুটা ওপরে উঠার পর বিন কাসিম ইসলামী যুদ্ধরীতি অনুযায়ী মধ্যভাগের সৈন্যদেরকে সামনে অগ্রসর হয়ে আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। অপর দিকেরও মধ্যভাগের সৈন্যরা অগ্রসর হয়ে লড়াইয়ে লিপ্ত হলো। দুপক্ষের মধ্যে শুরু হলো তীব্র লড়াই। এক পর্যায়ে আরব সৈন্যরা তাদের রীতি অনুয়ায়ী পিছনে সরে আসতে শুরু করলো। মধ্যভাগের সৈন্যদের পিছনে সরিয়ে এনে বিন কাসিম দুই প্রান্তের সৈন্যদের ঘেরাও আরো প্রলম্বিত করে শত্রুসেনাদের ঘেরাও করতে চাইলেন কিন্তু শত্রুবাহিনী মুসলমানদের ইচ্ছা বুঝতে পেরে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিলো। ফলে বিন কাসিমের এই কৌশল কোন কাজে এলো না। এভাবে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের পর সন্ধ্যা নেমে এলে বজরা তার সৈন্যদেরকে দুর্গে ফিরিয়ে নিল। বিন কাসিম দুর্গ অবরোধের কোন চেষ্টাই করলেন না। অবরোধ না করে তিনি কিছু সৈনিককে দুর্গের বিপরীত পাশে পাঠিয়ে দিলেন। তাদের নির্দেশ দিলেন, দুর্গ থেকে যাতে কোন লোক বাইরে যেতে না পারে এবং বাইরের কোন লোকও যাতে দুর্গে প্রবেশ করতে না পারে। বাইরের দুনিয়া থেকে দুর্গকে বিচ্ছিন্ন করা ছিল এই নির্দেশের উদ্দেশ্য।
