সিহরার সৈন্যরা আরব সৈন্যদের নৌকা থেকে চুরি করে আনা মিনজানিকের আদলে ছোই মিনজানিক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। এসব মিনজনিক দিয়ে মুসলিম সৈন্যদের প্রতি ছোট্ট পাথর নিক্ষেপ করছিল সিহরার বাহিনী। নিক্ষিপ্ত এক দেড় কেজি ওজনের পাথরের দ্বারা মুসলিম শিবিরের তেমন কোন ক্ষতিসাধন সম্ভব হলো না। কারণ নিক্ষিপ্ত পাথরের গতি বুঝে নিয়ে মুসলমানরা তাদের তাবু সরিয়ে নিয়েছিল কিন্তু হিন্দুদের অব্যাহত ও তীব্র পাথর নিক্ষেপের কারণে দুর্গপ্রাচীরে ভাঙন সৃষ্টিকারী আরব যোদ্ধাদের পক্ষে প্রাচীরের ধারে কাছে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এভাবে এক সপ্তাহ পর্যন্ত চেষ্টা করার পরও দুর্গপ্রাচীর ডিঙানোর কৌশল ফলপ্রসূ না হওয়ায় অবশেষে বিন কাসিম শেষ পন্থা অবলম্বন করলেন। তিনি মুসলিম সৈন্যদের নিয়ে আসা বড় বড় মিনজানিক থেকে দুর্গের ভিতরে বড় বড় পাথর নিক্ষেপের নির্দেশ দিলেন সেই সাথে অগ্নিতীর ছোড়ারও অনুমতি দিয়ে দিলেন।
মুসলমানদের নিক্ষিপ্ত পাথর ও অগ্নিবাহী তীরে শহরের অনেক জায়গায় আগুন ধরে গেল এবং পাথরের আঘাতে ঘরবাড়ি ধ্বংস হতে শুরু করল। আতঙ্কিত শহরবাসীর মধ্যে শুরু হলো আর্তচিকার হুড়োহুড়ি দৌড়-ঝাপ।
সন্ধ্যার সামান্য আগে দুর্গের একটি ফটক খুলে দুর্গের ভিতর থেকে অন্য দুদিনের মতো হিন্দু সৈন্যরা বেরিয়ে এসে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করল। হিন্দু সৈন্যদের সংখ্যা ও আক্রমণের ধরণ দেখে মনে হচ্ছিল দুর্গের সকল সৈন্যই বেরিয়ে এসেছে এবং তারা আখেরী ও চূড়ান্ত আঘাত হেনেছে। হিন্দুদের আখেরী আক্রমণ প্রতিহত করতে বিন কাসিম অবরোধ ভেঙে দিয়ে সৈন্যদেরকে প্রতিরোধ আক্রমণকে নির্মূল আঘাতে পরিণত করার চেষ্টা করলেন। সন্ধ্যার সামান্য আগের এই আক্রমণ প্রতি আক্রমণ বেশি সময় স্থায়ী হলো না। সন্ধ্যা নেমে আসায় বিপুল সাথীকে ময়দানে ফেলে রেখেই অবশিষ্ট হিন্দু সৈন্যরা দুর্গে ফিরে গেল। রাতের বেলায় গোটা ময়দান আহত সৈন্যদের আর্তচিৎকার ও কান্নাকাটিতে কাটল। এদিকে দুর্গের ভিতরেও রাতভর শোনা গেল শহরবাসীর মধ্যে হট্টগোল। সকাল বেলায় দেখা গেল দুর্গের কয়েকটি জায়গায় উঁচু বাঁশের মাথায় সাদা পতাকা বেঁধে দেয়া হয়েছে। সাদা পতাকা সাধারণত শান্তি ও আত্মসমর্পণের আহবান বোঝায় কিন্তু সিহরার কার্যক্রমের কারণে বিন কাসিম এটাকে প্রতারণতার একটি কৌশল মনে করলেন। বেলা কিছুটা বাড়ার পর দুর্গের প্রধান ফটক খুলে কয়েকজন লোককে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল। তাদের একজন উচ্চ আওয়াজে মুসলমানদের উদ্দেশ্য বলল, তারা মুসলিম প্রধান সেনাপতির সাথে দেখা করতে চায়। তাদেরকে অগ্রসর হতে বলা হলো। তারা এগিয়ে এলে তাদের কাছ থেকে তরবারী ও হাতিয়ার ছিনিয়ে নিয়ে গোয়েন্দা প্রধান শাবান ছাকাফীর হাতে সোর্পদ করা হলো। গোয়েন্দা প্রধান তাদেরকে বিন কাসিমের কাছে নিয়ে গেলেন।
আমরা আপনার কাছে নিরাপত্তা চাইতে এসেছি, আমরা আপনার কাছে আমাদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার আবেদন করছি’, বলল আগন্তুকদের একজন।
তোমাদের শাসকের কি সাহস হলো না এখানে আসার? আগন্তুকদের জিজ্ঞেস করলন বিন কাসিম। দুর্গশাসক নিজে না এসে তোমাদের পাঠাল কেন? আত্মসমর্পণের রীতি তো এটা নয়। সে নিজে না আসার অর্থ হলো, তার এখনো যুদ্ধ করার সাধ মিটেনি।
মহামান্য আরব সেনাপতি। সে দুর্গে থাকলে তো আসবে? বলল প্রতিনিধি, দলের মুখপাত্র। আমরা আসার অর্থই হলো সে নেই। দুর্গশাসক পালিয়ে গেছে।
কখন পালালো? কোন দিক দিয়ে পালালো?
পালানোর সুযোগ সে করে নিয়েছিল। গতকাল আপনার সেনাবাহিনীর নিক্ষিপ্ত পাথরে যখন শহরের অধিবাসী ও সৈন্যদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অগ্নিবাহী তীরে কয়েকটি বাড়িতে আগুন ধরে যায়, ভীতসন্ত্রস্ত নারী ও শিশুদের আর্তনাদে আকাশ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয় তখন শহরের অধিবাসীদের মধ্য থেকে আমরা আত্মসমর্পণের জন্য সিহরাকে বলি। আমরা তাকে বললাম, আরব সৈন্যদের আক্রমণ থেকে আমরা দুর্গ রক্ষা করতে পারবো না, তাই আরবরা দুর্গ জ্বালিয়ে ভস্ম করার আগেই আত্মসমর্পণ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। না হয় আরবরা দুর্গ দখল করবে। আমাদের সকল যুবক-যুবতী নারী ও শিশু আরবদের গোলামবাদী হবে এবং তুমি সহ সেনাবাহিনীর সকলকেই হত্যা করা হবে। তার চেয়ে কি ভালো নয় আরবদের কাছে আত্মসমর্পণ করে সবার জানমাল ইজ্জত আব্রু রক্ষা করা। এটা করলে শহরও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পাবে।
আমাদের প্রস্তাবে সিহরা গভীর ভাবনায় ডুবে গেল। অনেকক্ষণ নীরব থাকার পর নীরবতা ভেঙে বলল, ইতিমধ্যে আমরা বহু আরব সৈন্যকে হত্যা করেছি এবং বিপুলসংখ্যক আরব সৈন্যকে আহত করেছি। আরব সেনাপতি তাদের এই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির জন্যে আমাদের কিছুতেই ক্ষমা করবে না। এখন যদি আমরা আত্মসমর্পণ করি, তাহলে তারা আমাদের কাছ থেকে জিযিয়াও নেবে যুদ্ধের যাবতীয় ক্ষয়ক্ষতির জন্য মোটা অংকের ভর্তুকি উসূল করবে। শুধু এর ওপরই তারা খুশি হবে না, এরা আমাদের স্ত্রী কন্যা বোন ও সোনাদানা সবই কুক্ষিগত করবে। আর আমাদের সবাইকে দাসদাসী বানিয়ে আরব দেশে পাঠিয়ে দেবে।
এরপর দুর্গশাসক সিহরা শহরের প্রধান মন্দির থেকে দুজন পুরোহিতকে ডেকে পাঠালো আমাদের বুঝানোর জন্য। পুরোহিতরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে আমাদের উৎসাহিত করল। তারা লড়াই না করে আত্মসমর্পণ করলে দুনিয়াতে আমাদের যে নির্মম লজ্জাকর পরিণতি বরণ করতে হবে সেই সম্পর্কে সতর্ক করল এবং পরপারে আমাদের আরো কঠিন শাস্তির কথা বলল। পুরোহিতরা সতর্ক করল এই বলে যে, লড়াই না করলে মৃত্যুর পর তোমাদেরকে শূকর কুকুরের বেশে পূর্ণজন্ম দেয়া হবে।
