উরুঢ় দুর্গ অবরোধ করার পর রাণী প্রিয়সী দুর্গফটকের কাছে গিয়ে যখন রাজা দাহিরের মৃত্যু সংবাদের খবর বলেছিল তখন ঠিক এমনই এক বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল রাণী প্রিয়সী, যা আজ রাজা কাকসার হতে হলো। রাজা কাকসা ও রাণী প্রিয়সীর সাথেও আসকালন্দ দুর্গের অধিবাসীরাও তাই করল। তাদেরকে অপমান ও ভৎসনা করে তাড়িয়ে দিলো।
“রাজা দাহিরকে হত্যা করার মতো কোন মানুষ পৃথিবীতে নেই। সে যদি নিহত হয়েই থাকে তাহলে তোমরাই তাকে হত্যা করিয়েছ,” দুর্গপ্রাচীরের ওপর থেকে কাকসা ও প্রিয়সীর উদ্দেশ্যে বলল সিহরা। তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে আমরা রাজা হত্যার প্রতিশোধ নেবো।
বিন কাসিম তার দুভাষীকে ডেকে বললেন, কাকসা ও প্রিয়সীকে ফিরে আসতে বলে। এদের ভাগ্য খুবই খারাপ। দুর্ভাগ্য ও ধ্বংসই ওদের বিধিলিপি। এদের উপকার করার চেষ্টা অর্থহীন।
বিন কাসিমের নির্দেশে তারা ফিরে এলো।
কাকসা ও রাণী প্রিয়সীর সমঝোতা চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর বিন কাসিম দুর্গ অবরোধ করার নির্দেশ দিলেন। সৈন্যরা যখন দুর্গের চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ছিল ঠিক সেই সময় দুর্গের এক কোণের একটি দরজা খুলে গেল। দুর্গের ভিতর থেকে জয়ধ্বনী দিয়ে অসংখ্য অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্য প্লাবনের মতো বেরিয়ে এলো এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে সারিদ্ধভাবে না দাঁড়িয়ে ঘেরাও রত মুসলিম বাহিনীর ওপর হামলে পড়ল। মুসলমানরা কোন ধরনের প্রস্তুতি ছাড়াই যে যে অবস্থায় ছিল সেই অবস্থাতেই প্রতিরোধে লিপ্ত হলো। লড়াই ছিল এলোপাতাড়ি ফলে এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় নি।
উভয় পক্ষের বিক্ষিপ্ত লড়াইয়ে নিহত ও আহতের সংখ্যা বেড়েই চলছিল। মুসলিম সেনাপতিরা তাদের যোদ্ধাদের একটা শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা করছিলেন কিন্তু প্রতিপক্ষের প্রবল আক্রমণের মুখে সৈন্যদের শৃঙ্খলায় নিয়ে আসা সম্ভব হচ্ছিল না। বিন কাসিমের বেশি সময় লাগল না সিহরার যুদ্ধ কৌশল অনুধাবন করতে। তিনি হিন্দু সৈন্যদের মধ্যে যুদ্ধ উন্মাদনাও দেখতে পেলেন।
বিন কাসিম চিৎকার করে তাঁর যোদ্ধাদেরকে পিছিয়ে আসার আহবান করলেন। তিনি চাচ্ছিলেন, হিন্দু সৈন্যরা যাতে মুসলমানদের তাড়া করতে করতে দুর্গের পাশ থেকে দূরে সরে আসে কিন্তু সিহরা যখন দেখতে পেল মুসলিম সৈন্যরা পিছনে সরে যাচ্ছে তখন সে তার সৈন্যদেরকেও পিছনে সরিয়ে নিল এবং খুব দ্রুত প্রধান ফটক পেরিয়ে দুর্গের ভিতরে চলে গেল। হিন্দু সৈন্যদের বিদ্যুৎ গতিতে দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসা এবং প্রবেশ করা থেকে পরিষ্কার বোঝা গেল, তাদেরকে এভাবেই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে এবং তারা এ ধরনের আক্রমণের জন্য পূর্ব থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। এ যুদ্ধে উভয় পক্ষের বহুসংখ্যক যোদ্ধা নিহত ও আহত হলো। হিন্দুরা তাদের নিহত ও আহত যোদ্ধাদের তুলে নেয়ার কোন চেষ্টা না করেই দুর্গের প্রধান ফটক বন্ধ করে দিলো। আহত হিন্দুযোদ্ধারা উঠে দুর্গের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছিল দুর্গফটক বন্ধ হতে দেখে মুসলিম তীরন্দাজরা অতি সহজেই ওদেরকে তীরবিদ্ধ করে হত্যা করতে শুরু করল। ফলে কোন আহত হিন্দু যোদ্ধার পক্ষেই জীবন নিয়ে দুর্গে ফেরা সম্ভব হলো না। হিন্দুরা তাদের নিহত সহযোদ্ধাদের মরদেহ তুলে নেয়ার কোন চেষ্টাই করল না এবং আহতদের জীবন রক্ষারও পরোয়া করল না।
দুর্গফটক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নির্বিঘ্নে মুসলিম যোদ্ধারা তাদের নিহত ও আহত সহযোদ্ধারদেরকে তুলে আনতে শুরু করল। এদিকে মুসলিম শিবিরে থাকা মহিলারা বেরিয়ে এসে আহতদের ক্ষতস্থানে পট্টিবেধে তাদের ওষুধ খাইয়ে পানি ঢেলে সুস্থ করার কাজে লেগে গেল।
সেদিন যুদ্ধ শেষে বিন কাসিম তার বাহিনীর সকল সেনাপতি ও কমান্ডারদের নিয়ে বৈঠক করলেন। শত্রুদের যুদ্ধ কৌশল নিয়ে পর্যালোচনার পর তারা বুঝতে পারলেন আজকের মতো হঠাৎ দুর্গ থেকে বেরিয়ে হামলে পড়াই হবে শত্রুদের যুদ্ধকৌশল। সেই সাথে অবরোধ সম্পন্ন করার পাশাপাশি শত্রু আক্রমণ প্রতিরোধে কিছুসংখ্যক রিজার্ভ সৈন্য রাখার সিদ্ধান্ত হলো। কিছু যোদ্ধাকে রাখা হলো বিচরণশীল। যারা যে কোন দিকে আক্রমণ হলে আক্রান্তদের সহযোগিতায় এগিয়ে যাবে।
পরদিন মুসলিম সৈন্যরা দুর্গের চতুর্দিকে অবরোধ আরোপ করেছিল। বিন কাসিম দুর্গের চতুর্দিক ঘুরে দুর্গপ্রাচীর কোন দিক দিয়ে ডিঙানো যায় কিনা কিংবা দুর্গপ্রাচীর ভাঙা যায় কি-না তা নিরীক্ষণ করছিলেন। যোহরের নামাযের সময় মুসলিম সৈন্যরা ময়দানেই জামাতে নামায আদায়
করছিল। নামায শেষে অনেকেই ছিল মোনাজাত রত ঠিক এমন সময় দুর্গের পূর্বপাশের একটি ফটক খুলে বন্যার পানির মতো হিন্দু সৈন্যরা বেরিয়ে এসে হামলে পড়ল মুসলিম সৈন্যদের ওপর। মুসলমান সৈন্যরা ঘটনার আকস্মিকতায় পরিকল্পিত প্রতিরোধের অবকাশ পেলনা। অধিকাংশ মুসলিম সৈনিকের পক্ষে নামায থেকে উঠে গিয়ে ঘোড়ার পিঠে আরোহণের সুযোগ হলো না। হাতের কাছের তরবারী নিয়ে অশ্বারোহীরাও পদাতিকের মতোই হামলে পড়া শত্রুদের প্রতিরোধে লিপ্ত হলো।
আক্রমণ হয়েছিল অবরোধের এক কোণে। বিন কাসিম আক্রমণ হতে দেখেই রিজার্ভ ও চলমান সৈন্যদেরকে আক্রান্তদের সহযোগিতার জন্য দৌড়ালেন। উভয় পক্ষের মধ্যে শুরু হলো তীব্র লড়াই। অপ্রস্তুত থাকার পরও দ্রুত সহযোগীদের পৌছে যাওয়ায় মুসলিম সৈন্যরা আক্রমণ সামলে নিল কিন্তু এই আক্রমণে হিন্দুদের বিরাট মূল্য দিতে হলো। হিন্দুরা বেরিয়ে আসা অর্ধেক যোদ্ধাকে আহত ও নিহত অবস্থায় ময়দানে ফেলে রেখে দুর্গে ফিরে গেল। এই ক্ষয়ক্ষতির পর আর সিহরার কোন সৈন্যদল দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে আক্রমণ করল না। তারা দুর্গপ্রাচীরের ওপর থেকে তীর ও পাথর নিক্ষেপ করে মুসলমানদের ক্ষয়ক্ষতি করার চেষ্টায় লেগে গেল।
