তোমরা কি চাও? আগন্তুকদের উদ্দেশ্যে বলল সিহরা। তোমরা ভয়ে মরে যাচ্ছো কেন?
আমরা আমাদের স্ত্রী সন্তান মা বোনদের জীবন সম্ভ্রমের নিরাপত্তা চাই, বলল এক আগন্তক। আপনি যদি মনে করেন, আমাদের সেনাবাহিনী দুর্গ রক্ষা করতে পারবে না, তাহলে মুসলিম সৈন্যদের জন্য দুর্গফটক খুলে দিন। আমরা শুনেছি, মুসলিম বাহিনী কোন নাগরিককে হয়রানী করে না। জিযিয়া ছাড়া আর কিছুই নেয় না এবং শহরে লুটতরাজও করে না।
আরব বাহিনী অনেক বড় বাহিনী মহারাজ! বলল অপর একজন। তারা শহরে পাথর ও আগুনেতীর নিক্ষেপ করে। তারা ডাভেল ও উরুঢ়ের মতো দুর্গ দখল করে নিয়েছে, আমরা তাদের প্রতিরোধ করতে পারবো না। তোমরা এমন কাপুরুষ হয়ে যাচ্ছো কেন? ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল দুর্গশাসক সিহরা। তোমরা আমার কথা শোনো। মুসলিম বাহিনীকে আমরা বুঝে শুনেই আসার সুযোগ দিয়েছি। পরপর কয়েকটি বিজয়ে আরব সেনাকমান্ডারদের মাথা বিগড়ে গেছে। তারা ভাবছে, তাদের কেউ মোকাবেলা করার ক্ষমতা রাখে না। রাজা দাহির বলেছিলেন, মুসলিম সৈন্যরা যখন সিন্দু অঞ্চলের
ভিতরে চলে আসবে, তখন ওদের জনবল কমে যাবে, যখন তাদের খাবার মতো কিছুই থাকবে না তখন আমরা তাদের ওপর আক্রমণ করব। সে সময় তাদের পালাবার কোন পথ থাকবে না। আমরা আরব বাহিনীর সিপাহসালার ও সৈন্যদেরকে জীবিত পাকড়াও করবো আর আমাদের প্রতিটি ঘরে একজন করে আরব গোলাম থাকবে। ওদের ঘোড়া ও উটগুলো হবে আমাদের সম্পদ। রাজা দাহির যে স্থানে এদের নিয়ে আসতে চাচ্ছিলেন, তারা এখন সেখানেই এসে গেছে, এখন আমাদের কর্তব্য হলো ওদেরকে পিছু হটার সুযোগ না দেয়া। আমরা ওদেরকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য নদীর তীর পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগও দেবো না।
আপনি তাদের নিক্ষিপ্ত পাথর ও অগ্নিবাহী তীর কিভাবে রোধ করবেন? সিহরাকে প্রশ্ন করল আরেকজন।
আমাদের তীরন্দাজরা কি মরে গেছে? আমাদের অশ্বারোহী সৈন্যরা কি বেকার হয়ে গেছে? আমাদের সৈন্যরা দুর্গ থেকে বেরিয়ে গিয়ে তাদের ওপর এমন আক্রমণ করবে যে, তারা পাথর অগ্নিবাহী তীর নিক্ষেপের সুযোগই পাবে না।
বলল দুর্গশাসক সিহরা। তোমরা কাপুরুষ হয়ে যেয়ো না। বুকে সাহস রাখো, শহরের যেসব লোক তীর তরবারী বল্লম চালাতে জানে তাদেরকে সেনাবাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে যুদ্ধ করার জন্য পাঠিয়ে দাও, তারা দুর্গপ্রাচীরের ওপরে উঠে সৈন্যদের সহযোগিতা করুক। আর যারা অশ্বারোহণ, ও তরবারী চালাতে সক্ষম তাদেরকে অশ্বারোহী সৈন্যদের সাথে শামিল হওয়ার কথা বলো।
শুনেছি, রাজা দাহির মারা গেছেন? বলল আগন্তুকদের একজন।
মিথ্যা, সম্পূর্ণ মিথ্যা, গলা চড়িয়ে বলল সিহরা। রাজা দাহির বিভিন্ন রাজ্যে গিয়ে হিন্দুস্তানের সৈন্যদের জমায়েত করছেন। দেখবে তিনি সময় মতো ঠিকই এসে যাবেন।
দুর্গশাসক সিহরা শহরের লোকদেরকে এভাবে উত্তেজিত করল যে, শহরের অধিবাসীরাও সৈন্যদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করার জন্য মৃত্যুপণ করল। শহরের মন্দিরের পুরোহিতরা লড়াই না করলে দেবদেবীদের অভিশাপ পড়ার কথা বলে অধিবাসীদের ভয় দেখালো। একপর্যায়ে শহরের সব অধিবাসী ও সৈন্যরা যুদ্ধের জন্য একজোট হয়ে গেল। তাদের কাছে বিজয় অবশ্যম্ভাবী মনে হতে লাগল।
নদী পারাপারের পর কাকসার পরামর্শে নৌকার মালিকদেরকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক উপহার দেয়া হলো। সেনাবাহিনীর সংরক্ষিত শস্যভাণ্ডার থেকে তাদেরকে তরিতরকারী দেয়ার নির্দেশ দিলেন বিন কাসিম।
দুর্গের চতুর্পাশে অবরোধ আরোপের সময় দুর্গপ্রাচীর থেকে অবরোধ আরোপকারী মুসলিম সৈন্যদের প্রতি বৃষ্টির মতো তীর বর্ষণ করল হিন্দু সৈন্যরা। কাকসা একটি ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করে দুর্গের প্রধান ফটকের ওপর দাঁড়ানো দুর্গশাসক সিহরার কাছাকাছি গিয়ে সিহরার উদ্দেশ্যে বললেন
সিহরা! আমাকে চিনতে চেষ্টা করো, আমি রাজা দাহিরের চাচাতো ভাই। কাকসা!
আরে কাকসা’ এই লুটেরাদের সঙ্গী হয়ে তুমি কি নিতে এসেছো? তুমিও কি বাপদাদার ধর্ম বিক্রি করে দিয়েছো?
প্রধান ফটক খুলে দাও! ভিতরে এসেই বলব, কেন আমি এদের সাথে এসেছি।
এই ফটক শুধু রাজা দাহিরের জন্যেই খোলা হবে। রাজা দাহিরের আর আসা হবে না। সে নিহত হয়েছে, তার খণ্ডিত মাথা আরবদেশে চলে গেছে। রাজার কনিষ্ঠা স্ত্রী রাণী প্রিয়সী আমার সাথেই রয়েছে।
রাণী প্রিয়সী ছিল অনেকটা পিছনে। কাকসার ইঙ্গিতে সে একটি ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করে কাকসার পাশে এসে দাঁড়াল। রাণী তার চেহারা কাপড়ে ঢেকে রেখেছিল।
চেহারার আবরণ ফেলে দিয়ে রাণী প্রিয়সী বলল, আমার দিকে তাকাও সিহরা! তুমি তো আমাকে চেনো। রাজা দাহির জীবিত থাকলে আমি মুসলমানদের সাথে আসতাম না। সময় নষ্ট না করে দুর্গের ফটক খুলে দাও, তাতে কাকসার মতো তুমিও সম্মানিত হবে, তুমিই থাকবে দুর্গের শাসক। শহরের অলিগলি নিজের সেনাবাহিনী ও জনসাধারণের রক্তে রঞ্জিত করোনা সিহরা! সিহরার উদ্দেশ্যে বললেন কাকসা। নিজের ভয়াবহ পরিণতি ডেকে এনো না। মনে রাখবে, আমি এখন মুসলিম বাহিনীর একজন উপদেষ্টা।
সত্যিই যদি রাজা দাহির এই আরবদের দ্বারা নিহত হয়ে থাকেন, তাহলে আমি তার রক্তের প্রতিশোধ নেবো। এসো না! সাহস থাকলে এগিয়ে এসে
দুর্গের দরজা খুলতে চেষ্টা করে দেখো। তুমি মান মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে আরবদের কর্মকর্তা সেজেছ…। তোমার চোখে বিষাক্ত তীরবিদ্ধ হওয়ার আগেই জীবন বাঁচাতে চাইলে এখান থেকে চলে যাও।
