কাকসা দুর্গ রক্ষার জন্য লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিলেও আমি তাকে লড়াই থেকে নিবৃত্ত করতে পারতাম। কারণ তার ওপর আমার এতোটা প্রভাব রয়েছে যে, তাকে আমি আমার কথা মানতে বাধ্য করতে পারতাম, বলল রাণী প্রিয়সী। আল্লাহর যা ইচ্ছা ছিল তা হয়ে গেছে। তুমিতো দেখেছ, আমি তার বিবেক বুদ্ধির সম্মান ও মর্যাদা কিভাবে দিয়েছি, বললেন বিন কাসিম। তুমি কি কাকসার সাথে কথা বলেছ?
না, আমি তার সাথে দেখা করিনি। আপনার অনুমতি ছাড়া আমি আমার পরিচিত কোন লোকের সাথে সাক্ষাত করি না।
তুমি তার সাথে সাক্ষাত করতে পার, বললেন বিন কাসিম।
এই অনুমতির জন্যই আমি এসেছি। আমি শুধু তার সাথে দেখা করতে নয়, তার সাথেই বসবাস করতে চাই, বলল প্রিয়সী। রাণী প্রিয়সীর একথা শুনে বিন কাসিম নীরব হয়ে গেলেন। তিনি চিহ্নিত দুই প্রভাবশালী পূর্ব শত্রুর মিলিত অবস্থানের বিষয়টিতে ভবিষ্যতে কোন ধরনের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের সম্ভাবনা রয়েছে মনে করে শঙ্কাবোধ করলেন। বিন কাসিমকে দীর্ঘসময় নীরব থাকতে দেখে রাণী প্রিয়সী বলল, আপনি নীরব হয়ে গেলেন কেন? আপনার চেহারা বলছে, আপনি আমাদের একত্রিত অবস্থানকে পছন্দ করছেন না। আপনি চাচ্ছেন না আমরা একত্রে বসবাস করি। আপনার মনে যদি আমার ব্যাপারে কোন ধরনের সংশয় সন্দেহ থেকে থাকে তাহলে মন থেকে তা ঝেড়ে ফেলুন। কারণ কাকসার সাথে তার পরিবারের সব মহিলারাই রয়েছে, আমি শুধু তাদের সান্নিধ্যে থাকতে চেয়েছি মাত্র। আপনি যদি আমাকে বন্দি করে রাখতে চান, তবে আমার কিছুই বলার নেই। তবে আমি আপনাকে এই প্রতিশ্রুতি দিতে পারি, আমি কাকসার সাথে থাকলে আপনার উপকার বৈ-ক্ষতি হবে না। ঠিক আছে প্রিয়সী! তুমি যাও, আমি তোমাকে কাকসার পরিবারে থাকার অনুমতি দিচ্ছি। রাণী প্রিয়সী সে দিন থেকেই কাকসার পরিবার পরিজনের সাথে বসবাস করার জন্য চলে গেল। সে দিন বিকেলে গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী বিন কাসিমের সাথে সাক্ষাত করতে এলেন।
সম্মানিত সিপাহসালার! এই মহিলাকে কাকসার পরিবারে থাকতে দিয়ে আপনি মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করেছেন, বিন কাসিমের উদ্দেশ্যে বললেন গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী। আপনাকে শুধু আমার কর্তা এবং সিন্ধের আমীরই মনে করি না, বয়োকনিষ্ঠ হওয়ার কারণে আপনাকে আমি নিজের সন্তানের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। আপনি নিঃসন্দেহে একজন অনন্য সেনানায়ক এবং শাসক। কিন্তু আপনার যৌবন অনেক ক্ষেত্রে আপনার মধ্যে বিচক্ষণতার চেয়ে আবেগকে প্রবল করে দেয়। আমি আপনার রণকৌশলে কখনো দখলান্দাজি করিনি, দ্রুপ আপনার নিরাপত্তার ব্যাপারে কখনো আপনাকে কর্তৃত্ব করার সুযোগ দেইনি। কারণ আপনার নিরাপত্তার বিষয়টি আমার ওপর ন্যস্ত।
আপনি কি কোন ঝকির আশঙ্কা করছেন? শাবান ছাকাফীর উদ্দেশ্যে বললেন বিন কাসিম, এরা আমাদের চিহ্নিত শত্রু ছিল ক’দিন আগেও। পরাজিত হওয়ার পর প্রকাশ্য আনুগত্য করলেও এই দুই দিকপাল একত্রে মিলে কোন ঝুকি সৃষ্টি করার ব্যাপারটাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। আপনি কি মনে করেন, আমার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা উচিত?
সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা আপনার মর্যাদা ও আভিজাত্যের পরিপন্থী হবে। এটার ব্যবস্থা আমার কাছে আছে। আমি আজই এদের পিছনে আমার বিশ্বস্ত স্থানীয় দু’জন গোয়েন্দা লাগিয়ে দিয়েছি। যারা এদের ভিতরের খবর সংগ্রহ করবে।
এতো দিনে বিন কাসিম ভাথিয়ার প্রশাসনিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনের কাজ সমাপ্ত করে ফেলেছিলেন। তাঁর সেনা বাহিনী তখন আসকালন্দের দিকে অভিযানের জন্যে প্রস্তুত। আসকালন্দ অভিযানের আগেও রীতি অনুযায়ী অগ্রবর্তী বাহিনী নির্বাচন করা হলো। আসকালন্দ শহরের কোন অস্তিত্ব এখন আর নেই। শুধু এতটুকু জানা যায়, আসকালন্দ ছিল আবয়াস নদীর পূর্বতীরে। আসকালন্দ অভিযানের অগ্রবর্তী দলের কমান্ড বিন কাসিম কাকসার ওপর ন্যস্ত করলেন। কারণ এলাকাটি সম্পূর্ণ নতুন হওয়ায় একজন স্থানীয় লোকের প্রয়োজন ছিল। কাকসাকে অগ্রবর্তী দলের কমান্ডার নিযুক্ত করলেও শাবান ছাকাফীর পরামর্শে একজন আরব সেনাপতিকেও তার সহযোগী হিসাবে নিযুক্ত করা
হলো। তার নাম ছিল জায়েদ বিন আলতাই। এখানে বলে রাখা ভালো, কাকসা নিজেই অগ্রবর্তী দলের কমান্ডার হওয়ার প্রস্তাব পেশ করেছিলেন।
পরবর্তীতে কাকসা তার দায়িত্বে পূর্ণ বিশ্বস্ততার স্বাক্ষর রাখলেন। বিয়াস নদী পারাপারের সময় সে স্থানীয় মাছ শিকারীর কাছ থেকে নৌকা নিয়ে নিতে সক্ষম হলো। ফলে সহজেই বিন কাসিম তাঁর দলবল নিয়ে নদী পেরিয়ে গেলেন। বিন কাসিমের সৈন্যরা যখন নদী পার হচ্ছিল তখন দুর্গে খবর পৌছে যায় মুসলিম বাহিনী এসে গেছে। এ খবর মুহূর্তের মধ্যে সারা দুর্গে ছড়িয়ে পড়লে অধিবাসীদের মধ্যে দৌড়ঝাপ শুরু হয়ে যায়। লোকজন বলাবলি করতে শুরু করে, মুসলিম বাহিনী তুফানের মতো ধেয়ে আসছে। এই তুফানে দুর্গের সবকিছু খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে। দুর্গশাসক সিহরা ছিল খুবই বেয়াড়া ও গোয়ার লোক। সে মুসলিম বাহিনীর আগমনে দুর্গের লোকদের ভীত সন্ত্রস্ত হতে দেয়নি।
মুসলিম বাহিনীর আগমন সংবাদ শুনে দুর্গের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় নাগরিক সিহরার দফতরে গিয়ে জানাল, তারা দুর্গপ্রাচীরে গিয়ে মুসলিম বাহিনীর আগমন দেখেছে। মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা বিপুল।
