‘তোমরাও কি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলে? জানতে চাইলেন বিন কাসিম। আপনি একটি লড়াকু জাতির লড়াক সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি। নিজের মাতভূমি নিজের দুর্গ রক্ষার জন্য প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করাকে নিশ্চয়ই আপনি অপরাধ বলে গণ্য করবেন না, জবাব দিল দলনেতা। তাছাড়া একথাও একটু ভেবে দেখুন, রাজা দাহিরের নিমক আমরা খেয়েছি। রাজা দাহির আমাদের দিয়েছেন ইজ্জত, সম্মান, মর্যাদা ও প্রতিপত্তি। তাই কেন আমরা তার রেখে যাওয়া রাজ্যের সুরক্ষার জন্য লড়াই করব না? আপনি কি আপনার অধীনস্থ লড়াইবিমূখ কর্মকর্তাদের পছন্দ করবেন?
ঠিক বলেছ। নিঃসন্দেহে তোমরা বিশ্বস্ত এবং সত্যবাদী। কিন্তু রাজা কাকসা তোমাদের লড়াই থেকে নিবৃত্ত করল কেন? প্রশ্ন করলেন বিন কাসিম। তিনি একজন বিচক্ষণ ও দূরদর্শী লোক, বলল দলনেতা। তিনি বলেছেন, মুসলমানদের লড়াই আমি নিজের চোখে দেখেছি। আমি রাজা দাহিরের পরাজয় ও মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেছি। সৈন্য দলের হাতিগুলোকে আমি মুসলমানদের হাতে রক্তাক্ত হয়ে রণাঙ্গন থেকে পালাতে দেখেছি। মুসলমানরা ডাবেল, নিরূন, সিস্তান, ব্রাহ্মণবাদের পর রাজধানী উরুঢ়ও কব্জা করে ফেলেছে। ভাথিয়াকেও তারা কব্জা করে নেবে তাতে সন্দেহ নেই। যেহেতু অবশেষে আমাদেরকে পরাজয় বরণ করতেই হবে, নয়তো ওদের হাতে নিহত হতে হবে, এমনটি জানার পরও যেসব সৈন্যকে আমরা এতোদিন লালন-পালন করেছি এবং এরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত কিন্তু এজন্য
ওদেরকে যুদ্ধে ঠেলে দিয়ে মেরে ফেলা কোন বিবেকবান মানুষের কাজ হতে পারে না। এটা অন্যায়। তাছাড়া বিজয়ী সেনাবাহিনী যখন শহরে প্রবেশ করবে তখন শহরের নিরীহ নাগরিকদের কাছ থেকে তারা যুদ্ধের যাবতীয় ব্যয় ও ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেবে। একজন বিজয়ী সেনার মৃত্যুর বদলে বিজিত রাজ্যের বিশজন নাগরিকের জীবন নেবে। শহরের তরুণী যুবতী মেয়েদেরকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদে পরিণত করবে। প্রতিটি নাগরিকের জীবন সম্পদ ও ইজ্জত আব্রুর নিরাপত্তা বিধান করা রাজার কর্তব্য। রাজা যখন দেখছে, সে তার রাজ্যকে শত্রু বাহিনীর হাতে তুলে দিলে প্রজাদের জীবন সম্পদ রক্ষা পাবে, তখন রাজার রাজত্বের মায়া ত্যাগ করাই উচিত। তিনি বলেছেন, শত্রুকে পরাজিত ও বিতাড়িত করার উদ্দেশে যখন আমাদের লড়াই করার প্রয়োজন ছিল আমরা তা করেছি কিন্তু এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই অবস্থায় লড়াইয়ে লিপ্ত হওয়া হবে আত্মঘাতি।
আমি তোমার রাজাকে আন্তরিক মোবারকবাদ জানাচ্ছি, সত্যিই সে বিবেকবান লোক। যে শাসক তার নিজের জীবন সম্পদ ক্ষমতা ও মর্যাদার জন্য প্রজাদের জীবন সম্পদ মানসম্ভম ধ্বংস না করে নিজের মর্যাদা ও ক্ষমতা কুরবানী করে ইসলামে এমন লোকের মর্যাদা অনেক উর্ধ্বে। তবে এটা কি ভালো হয় না যে, তোমাদের রাজা নিজে এসেই আমাদের স্বাগত জানাবে? সে এলে তাকে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দেয়া হবে, বললেন বিন কাসিম।
ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে, বিন কাসিম রাজা কাকসার প্রেরিত প্রতিনিধি দলকে যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান দিয়ে বিদায় করেন। তিনি এদের আগমনকে আত্মসমর্পনের গ্লানীকর অনুষ্ঠানে পরিণত করেননি।
পরদিন সকালেই বিন কাসিমকে খবর দেয়া হলো, রাজা কাকসা তার সাথে সাক্ষাত করতে আসছেন। খবর শুনে বিন কাসিম তাঁবু থেকে বেরিয়ে ঘোড়ায় আরোহণ করে তাঁবুর সীমানা ছাড়িয়ে রাজা কাকসাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য এগিয়ে গেলেন। শাবান ছাকাফী তব বিশেষ নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়ে তার অনুসরণ করলেন। বিন কাসিমকে দেখে রাজা। কাকসা ঘোড়া থেকে নেমে গেলেন। রাজাকে সম্মান দেখানোর জন্য বিন কাসিমও তার ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন এবং এগিয়ে গিয়ে কাকসার সাথে হাত মেলালেন। বিন কাসিমের সাথে ছিল তার একান্ত দুভাষী।
আপনার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই; রাজা কাকসাকে বললেন বিন কাসিম। কাকসাকে তাঁবুতে বসিয়ে বললেন, আপনি কি রাজা দাহিরের চাচাতো ভাই?
“আমি রাজা দাহিরের চাচাতো ভাই, এ নিয়ে গর্ব করার মতো কিছু নেই”, বললেন রাজা কাকসা। কিন্তু আমি রাজা দাহিরের মতো নই এজন্য অবশ্যই আমি গর্ব করতে পারি। এর অর্থ এই নয় যে, রাজা দাহির ছিল দুঃসাহসী ও জাত্যাভিমানী আর আমি ভীতু কাপুরুষ। আমি রাজা দাহিরের মতো যুদ্ধ না করেই দুর্গ আপনার হাতে তুলে দিয়েছি। রাজা কাকসার সাথে বিন কাসিম আলাপ করার পর বুঝতে পারলেন, কাকসা যথেষ্ট বুদ্ধিমান ও দূরদর্শী। রাজা কাকসা ভাথিয়া দুর্গের সকল অধিবাসীর জীবন সম্পদের নিরাপত্তা ও দুর্গে স্বাধীনভাবে ধর্মকর্ম, ব্যবসা বাণিজ্য করার অধিকারের শর্তে বিন কাসিমের আনুগত্য কবুল করে নিলো। বিন কাসিম কাকসার বুদ্ধিমত্তা ও বোধ বিবেচনা দেখে এতোটাই মুগ্ধ হলেন যে, তিনি কাকসাকে তাঁর রাজনৈতিক উপদেষ্টার দায়িত্বে বরণ করে নিলেন। কারণ সেই এলাকায় এমন কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল যেগুলোর সুষ্ঠু সমাধান বের করার জন্য কোন স্থানীয় দূরদর্শী ব্যক্তির পরামর্শ জরুরী ছিল। সেই সাথে পরামর্শ দাতাকে স্থানীয় লোকদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য ও প্রভাবশালী হওয়াটাও ছিল জরুরী। এ ক্ষেত্রে কাকসার চেয়ে বেশিযোগ্য কেউ ছিল না।
বিন কাসিম কাকসার হাতে স্থানীয় ট্রেজারীর দায়িত্বও অর্পণ করেন এবং তাকে মুশীরমোবারক অভিধায় অভিষিক্ত করেন। এরপর ভাথিয়া দুর্গকে বিন কাসিম তার শক্তিশালী সেনা শিবিরে রূপান্তরিত করে পরবর্তী লক্ষবস্তুর ব্যাপারে মনোনিবেশ করলেন। ভবিষ্যত কর্মপন্থা নির্ধারণে কাকসার দেয়া পরামর্শ বিন কাসিমের জন্য খুবই সহায়ক প্রমাণিত হলো। কাকসার পরামর্শে পরবর্তী লক্ষবস্তু নির্ধারণ করা হলো আসকালান্দ। এর মধ্যে একদিন রাণী প্রিয়সী বিন কাসিমের সাথে সাক্ষাত করে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলার পর বিন কাসিম দ্বিধান্বিত হয়ে পড়লেন। ভাথিয়া দুর্গে প্রবেশের পর এই সাক্ষাতের আগে বিন কাসিমের আর রাণী প্রিয়সীর সাথে কথা বলার সুযোগ হয়নি, প্রয়োজনও পড়েনি। রাণী প্রিয়সী বিন কাসিমের সাথে দেখা করে বলল, আমি আপনাকে বলেছিলাম না, কাকসা বুদ্ধিমান লোক, সে কোন রক্তক্ষয় না করেই দুর্গ আপনার হাতে তুলে দেবে। কারণ আমি জানতাম, পরিস্থিতি বুঝে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো বিবেক বুদ্ধি তার রয়েছে। সে যদি লড়াই করার মতো বোকামী করতো, তাহলে তাকে কঠিন মূল্য দিতে হতো, বললেন বিন কাসিম।
