আমি আপনাকেও তেমনই একজন প্রতাপশালী রাজা বাদশার প্রতিকৃতি ভেবেছিলাম। এজন্য রাজপরিবারের একজন মর্যাদাবান রাণীর উচ্চাসন ভুলে তুমিও নীচে নেমে এসেছিলে? বললেন বিন কাসিম। না, আপনি যেমনটি ভেবেছেন তা নয়। আমি রাজ পরিবারের কেউ নই। আমার দেহে রাজপরিবারের রক্ত নেই। আমিতো সাধারণ একজন ব্যবসায়ীর মেয়ে। রাজা দাহির আমাকে দেখে পছন্দ করে রাজ প্রাসাদে উঠিয়েছে। রাজ পরিবারের লোক নই বলেই আমার মনে সাধারণ মানুষের প্রতি প্রবল মায়ামমতা। সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্যই তো আমি উরুঢ়ের দুর্গপ্রাচীরের কাছে এসে দুর্গের যুদ্ধরত সৈনিকদেরকে বলেছিলাম, রাজা দাহিরের মৃত্যু হয়েছে, তারা যেন আপনার বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। সাধারণ মানুষের প্রতি মমত্ববোধ থেকেই আমি আপনাকে অনুরোধ করেছিলাম, দুর্গের সামরিক বেসামরিক সবাইকে ক্ষমা করে দিতে। আজ আমি আপনাকে একথাও বলে দিতে পারি, কাকসা কোন রক্তক্ষয় না করেই আপনার বশ্যতা স্বীকার করে নেবে, একথা বলে রাণী প্রিয়সী কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।
কয়েকদিন পর সকল সেনাদের নিয়ে ভাথিয়া দুর্গের কাছে শিবির স্থাপন করলেন বিন কাসিম। ভাথিয়া দুর্গের অবস্থান ছিল বিয়াস নদীর পূর্ব পাড়ে। সুলতান মাহমুদের অভিযানের সময়ও এই জনবসতির অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু আজ আর সেই জনবসতির ধ্বংসাবশেষও অবশিষ্ট নেই। বিন কাসিমের সৈন্যদের সাথেই রাণী প্রিয়সী ভাথিয়া দুর্গে গিয়েছিল। রাণী প্রিয়সী মুসলিম সৈন্যদের সাথে আসা তাদের স্ত্রী-কন্যাদের সাথে অবস্থান করছিল। বিন কাসিম তাকে সাথে নিয়েছিলেন এ জন্য যে, যুদ্ধের কোন পরিস্থিতিতে রাণী প্রিয়সীর প্রয়োজন হতে পারে ভেবে। বিন কাসিমের সৈন্যরা তখনো তাঁবু তৈরিতে ব্যস্ত। বিন কাসিমের তাবু তৈরি শেষে তিনি তাতে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন ঠিক এমন সময় সংবাদবাহক খবর নিয়ে এলো, দুর্গের দিক থেকে সাতজন অশ্বারোহী এবং তাদের পিছনে তিনটি উট আসছে। খবর শুনে বিন কাসিম তাঁবুর বাইরে এসে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ পর তারও নজরে পড়ল কয়েকটি অশ্বারোহী ও তিনটি উট তাঁবুর দিকে এগিয়ে আসার দৃশ্য। তিনি নির্দেশ দিলেন, অশ্বারোহীরা যদি তার সাথে সাক্ষাত করতে চায়, তবে তাদেরকে না আটকিয়ে সরাসরি এখানে নিয়ে আসা হোক।
অশ্বারোহীরা তাঁবুর দিকেই আসছিল। কিন্তু তবু এলাকায় প্রবেশের আগেই তাদের পথরোধ করা হলো। কারণ গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী কঠোর নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন, তাকে অবহিত না করে যেন কিছুতেই কাউকে প্রধান সেনাপতির কাছে যেতে না দেয়া হয়। গোয়েন্দা প্রধান আগন্তুক অশ্বারোহীদের যাছাই করে তাদের সাথে থাকা অস্ত্র নিজের কাছে রেখে দেন। তিনি আগন্তুকদের কোমর ও দেহ তল্লাশী করে তাদের সাথে গোপনে কোন খঞ্জর রয়েছে কিনা তাও পরীক্ষা করেন। নিশ্চিত হওয়ার পর তাদেরকে বিন কাসিমের কাছে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনিও তাদের সাথেই রওয়ানা হন।
আগত প্রতিনিধি দলের দলনেতা রাজা কাকসার একজন শাসক, বিন কাসিমকে জানালেন গোয়েন্দা প্রধান। এরা রাজা কাকসার উপঢৌকন নিয়ে এসেছে।
বিন কাসিম আগন্তুক প্রতিনিধি দলের সাথে সহাস্যে মিলিত হলেন এবং তাদেরকে সসম্মানে তাঁবুতে বসিয়ে মেহমানদারীর নির্দেশ দিলেন। আমরা কিছুতেই আপনাকে হত্যা করতে এভাবে আসিনি, আপনার এই কর্মকর্তা আমাদের কাছ থেকে তরবারীগুলো ছিনিয়ে নিয়ে আমাদের অসম্মান করেছে। আমরা ময়দানের লড়াইয়ে অভ্যস্ত। রণাঙ্গনেই আমরা মরতে ও মারতে পছন্দ করি। কাউকে গোপনে হত্যায় আমরা বিশ্বাস করি না। এটা কাপুরুষের কাজ। আমরা কাপুরুষ নই, বলল দল নেতা। বিন কাসিমের নির্দেশে আগন্তুক প্রতিনিধি দলের তরবারী নিয়ে আসা হলো। বিন কাসিম তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া তরবারীগুলো সসম্মানে ফিরিয়ে দিলেন। প্রতিনিধি দল তাদের সাথে নিয়ে আসা উপঢৌকন পেশ করল। বিন কাসিম বললেন, এসব উপহার উপঢৌকন দেয়ার অর্থ কি? এর অর্থ কি আমি কাকসার দুর্গের দিকে না তাকিয়ে এটি এড়িয়ে সামনে চলে যাব? না এটি তোমাদের রাজা কাকসা আমার আনুগত্য স্বীকার করে নেয়ার প্রতীক?
আপনি যদি আমাদেরকে আমাদের অবস্থায় ছেড়ে সামনে এগিয়ে যান, তাহলে আমরা আপনার সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয় সব তরিতরকারী আহার সামগ্রী দেবো। শুধু তাই নয়, আমরা আপনার সেনাবাহিনীর ঘোড়া ও উটের খাবারও সংগ্রহ করে দেবো।
আমরা এখানে কোন ভিক্ষা করতে আসিনি, বললেন বিন কাসিম। আমার সেনাদের খাবার দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই এবং আমার বাহিনীর আনা
ঘোড়া ও উটের খাবারও আমরা সাথে নিয়ে এসেছি। আমাদের দরকার দুর্গ। এ প্রশ্নে আমরা কোন ধরনের বেচা কেনা করব না। তোমাদের রাজা কাকসা কি আত্মসমর্পন করবে না? আত্মসমর্পণ করবেন তিনি। তিনি আমাদের বলে দিয়েছেন আপনি যদি আমাদের প্রথম প্রস্তাব মানতে সম্মত না হন, তাহলে আমরা যাতে আত্মসমর্পনের শর্তাদি নিয়ে কথা বলি। আমরা যাতে এ ব্যাপারেও কথা বলি আত্মসমর্পণ করলে রাজা কাকসার মর্যাদা কি হবে?….. আমি আপনাকে এ ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে পারি, রাজা কাকসা রাজা দাহিরের মতো এতোটা গোঁয়ার নন। তিনি যথেষ্ট বুদ্ধিমান ও দূরদর্শী। সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা তাকে বলেছিল একজন সেনা সদস্য জীবিত থাকাবস্থায়ও দুর্গ যেন আপনার হাতে তুলে দেয়া না হয়। কিন্তু তিনি যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তা সবাইকে হতবাক করেছে।
