আমি জানতাম, কোন না কোন এক রাতে আপনি আমাকে ডাকবেন। কক্ষে প্রবেশ করেই বিন কাসিমের উদ্দেশ্য চপল চাহনী ও আকর্ষণীয় ভঙিতে বলল, রাণী প্রিয়সী। আপনার যৌবন শেষ পর্যন্ত আমাকে তলব করতে বাধ্য করেছে।
হাসলেন বিন কাসিম।
হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ, বাধ্য হয়েই তোমাকে ডেকেছি। কিন্তু তুমি যদি এভাবে সেজেগুজে না এসে স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে তাহলে আমি খুশি হতাম, রাণীর উদ্দেশ্যে বললেন বিন কাসিম।
আমি একটি সৌন্দর্য ও কৃতজ্ঞতার উপঢৌকন হয়ে এসেছি। আপনি এরই মধ্যে আমাকে যে ইজ্জত সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেন, এই সাজসজ্জা ছাড়া এসে এর প্রতিদান দেয়া যায় না। আমি তো আপনার হাতে বন্দি ছিলাম? কিন্তু আপনি আমাকে কখনো বন্দি থাকার বিষয়টি অনুভব করতে দেননি। আপনাকে সকল উরুবাসীকে সাধারন ক্ষমা করার অনুরোধ করলাম, আপনি আমার সেই অনুরোধও রক্ষা করেছেন। এখন যদি আমি এদেশের রাণী থাকতাম, তাহলে রাজসিংহাসনে আপনাকে আমার পাশে আসন দিতাম। কিন্তু আজ আমার কিছুই
নেই। আছে শুধু আমার অস্তিত্ব। এজন্য আমার হৃদয়ের মণিকোঠা আর আমার চোখের মণিতেই দিয়েছি আপনার আসন। আর এই দেহটাকে সোপর্দ করছি। আপনার সেবায়।
হ্যাঁ, প্রতিদান আমার চাই রাণী। কিন্তু প্রতিদানে আমি তোমাকে গ্রহণ করতে রাজী নই। আমি তোমার কাছে শুধু এতটুকু প্রতিদান চাই, তুমি সত্যিকার অর্থে আমাকে সহযোগিতা করো এবং এখানকার বাস্তব পরিস্থিতি কি সে খবর আমাকে জানাও এবং করণীয় সম্পর্কে আমাকে পরামর্শ দাও। আমি যদি তোমাকেই চাইতাম, তাহলে আর আমার এসব লোক কক্ষে থাকত না।
যারা তোমার আর আমার কথা আমাদের নিজেদের ভাষায় অনুবাদ করে আমাদের কাছে পেশ করছে। তুমি যে নেশা ও আশা নিয়ে সেজেগুজে এসেছ এই নেশা ও প্রত্যাশা আমার মধ্যে থাকলে তোমার আমার কথোপকথনের জন্য কোন দুভাষীর প্রয়োজন হতো না। কারণ দেহ জ্বালার এই ভাষা জগৎ জুড়ে একই। এক্ষেত্রে কোন দুভাষীর প্রয়োজন হয় না।
বিন কাসিম রাণীকে কাছে বসতে না দিয়ে কিছুটা দূরত্বে একটি কুরসীতে বসতে দিয়ে বললেন, আমি জরুরী কয়েকটি কথা জিজ্ঞেস করার জন্য তোমাকে ডেকেছি। আমার পরবর্তী গন্তব্য ভাথিয়া। ভাথিয়ার ভৌগলিক অবস্থান দুর্গের অবস্থা এবং শাসক ও অধিবাসীদের সম্পর্কে আমি খবর নিয়েছি। কাকসা ওখানকার দুর্গশাসক। আমি জেনেছি, রাজা কাকসা দাহিরের চাচাতো ভাই। আমি তোমার কাছে জানতে চাই, তুমি কি জানো, কাকসাও কি দাহিরের মতো উগ্র মেজাজের লোক? না, সে রাজা দাহিরের মতো উগ্র নয়। সে খুবই বুদ্ধিমান লোক, সবকিছুই বুদ্ধিমত্তার সাথে বিবেচনা করে।
সে যেমন বুদ্ধিমান তেমনি বীরযোদ্ধা। মুখোমুখি যুদ্ধে তাকে কেউ হারাতে পারে না। আপনি হয়তো জানেন না, কাকসা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। রাজা দাহিরের সাথে সেও যুদ্ধে শরীক ছিল। কিন্তু রাজা দাহির নিহত হওয়ার পর সে উরুঢ় ফিরে আসে। কাকসা যখন জানতে পারে, আপনার সেনাবাহিনী উঢ়ের দিকে এগিয়ে আসছে তখন সে ভাথিয়া চলে আসে।
সে কি যুদ্ধ না করে দুর্গ আমাদের হাতে তুলে দেবে? রাণী প্রিয়সীকে প্রশ্ন করলেন বিন কাসিম। আমার যোদ্ধারা তার কাছ থেকে নিঃসন্দেহে দুর্গ ছিনিয়ে নেবে, তবে তাতে প্রচুর রক্তক্ষয় হবে। আমি চাই সে যেন যুদ্ধ ছাড়াই দুর্গ আমাদের হাতে তুলে দেয়।
আপনি অনুমতি দিলে আমি কাকসার কাছে চলে যেতে পারি, বিন কাসিমের উদ্দেশ্যে বলল রাণী প্রিয়সী। আমি তাকে বলব, অবশেষে যদি তাকে পরাজয়ই বরণ করতে হয় তাহলে জনগণের রক্তপাত এড়াতে কেন আগেই আপনার কাছে আত্মসমর্পণ করবে না। না প্রিয়সী! তুমি এমনটি করবে না। এমনটি করলে সে ভাববে, আরব বাহিনীর সেনাপতি একজন কাপুরুষ। সে একজন অবলা নারীকে তার বিজয়ের মাধ্যম বানিয়েছে। আমি শুধু জানতে চাই, তার মধ্যে বিবেক বুদ্ধি কেমন?
সে তো প্রকৃতপক্ষে উরুঢ়েরই অধিবাসী ছিল। আপনি দেখেছেন উরুঢ়ের অধিবাসীরা বুদ্ধিমান। শুধু তাই নয়, এখানকার অধিবাসীরা বিশ্বস্ত ও বন্ধুবৎসল। কাকসা যে কোন সাধারণ লোকের চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান। সে যুদ্ধ করা না করার সিদ্ধান্ত ভেবেচিন্তে নেবে। প্রয়োজন হলে আমি তার কাছে চলে যাব। রাণী প্রিয়সী যখন বিন কাসিমের কক্ষ থেকে বের হলো, তখন তার চেহারায় ফুটে উঠল গাঢ় হতাশা। কারণ সে ভিন্ন চিন্তা-ভাবনা নিয়ে বিন কাসিমের ডাকে সাড়া দিয়েছিল কিন্তু বিন কাসিম তার ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত আচরণ করলেন। ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, রাণী প্রিয়সী ছিল বুদ্ধিমতি বিচক্ষণ সুন্দরী যুবতী। রাণী সেই রাতে নানা ভাবে নানা কথা ও অঙ্গ ভঙিতে বিন কাসিমকে কামোদ্দীপ্ত করতে চেষ্টা করেছে, কিন্তু সে অনুভব করেছে, আসলে বিন কাসিম টগবগে যুবক হলেও সে রক্ত-মাংসে গড়া সাধারণ কোন যুবক নয়, তার গোটা দেহটাই একটা পবিত্র মোড়কে মোড়ানো। যেখানে সামান্যতম মানবিক ত্রুটির চিহ্ন নেই। আগাগোড়া বিন কাসিম একজন পূত পবিত্র মানব মূর্তি। সেখানে এতটুকু খাদ নেই।
রাণী প্রিয়সী বিন কাসিমের কক্ষ থেকে বের হয়ে অল্পক্ষণ পরে আবার কক্ষে প্রবেশ করে বলল, ক্ষমা করে দিন সিপাহসালার! আজ আমি কুমতলব নিয়ে আপনাকে অপবিত্র করার বাসনা নিয়ে এসেছিলাম। তুমি কি আমার ওপর তোমার রূপের যাদু চালিয়ে আমার ক্ষতি করার ইচ্ছা করেছিলে? জানতে চাইলেন বিন কাসিম। তুমি কি মনে করেছিলে, তোমার রূপের দ্যুতি ও জৌলুস ছড়িয়ে আমাকে কাবু করে ফেলবে? না” না’ এমনটি নয়। আমি আপনাকেও রক্তমাংসের গড়া মানুষ ভেবেছিলাম। সুন্দরী রূপসী তরুণীদের সঙ্গলাভের জন্য তো প্রবল প্রতাপশালী রাজা বাদশারাও তাদের আত্মমর্যাদা ভুলে নীচে নেমে আসে।
