বিন কাসিম গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফীকে বললেন, শহর জুড়ে গোয়েন্দা ছড়িয়ে দিন। শহরের প্রতিটি ঘরের ভিতরের অবস্থা জানার চেষ্টা করুন। গোয়েন্দা প্রধান শহরের অধিবাসীদের অভ্যন্তরীণ খবর জানার জন্য বিপুলসংখ্যক স্থানীয় গোয়েন্দা নিয়োগ করলেন। শহরের প্রশাসনিক ব্যবস্থা তাদের মতো করে পুনর্বহাল করলেন বিন কাসিম। রাওয়া বিন আসাদকে বিন কাসিম শহরের প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ফলে উঢ়ের মানুষের মধ্যে যে কৃতজ্ঞতা ও স্বস্তি বিরাজ করছিল, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে ভিন্নভাবে একজনকে ধর্মীয় প্রশাসক নিযুক্ত করা হলো। মূসা বিন ইয়াকুব ছাকাফীকে একই সাথে ধর্মীয় প্রশাসক এবং প্রধান বিচারকের দায়িত্বে নিয়োগ করা হলো।
ইবনে ইয়াকুবের উদ্দেশ্যে বিন কাসিম বললেন, ইবনে ইয়াকুব! সাকীফ গোত্রের অধিবাসীরা আপনাকে নিয়ে গর্ববোধ করে। আপনি যেমন একজন তেজস্বী যোদ্ধা, সেই সাথে একজন বিচক্ষণ আলেম। আমরা এই কাফেরদের দেশে এসে প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করেছি, তাদেরকে বুঝিয়ে দিতে হবে বিচার ও ইনসাফ কি জিনিস। তাদেরকে বুঝিয়ে দিতে হবে মুসলমানদের বিচার ব্যবস্থা আল্লাহর কাছে জবাবদেহিমূলক। ইসলামের বিচার ব্যবস্থায় শাসক শাসিত, ধনী-গরীব সবাই সমান। আল্লাহর আইন পার্থিব কোন পদ পদবী আর যশ খ্যাতিকে বিবেচনা করে না। সব অপরাধীকে সমান দৃষ্টিতে দেখে এবং সবাইকে কৃত অপরাধের জন্য উপযুক্ত শাস্তি ভোগ করতে হয়। ইতিহাসে লেখা হয়েছে, বিন কাসিম মূসা বিন ইয়াকুবকে বললেন, আল্লাহর কালাম, তারা ভালো কাজের আদেশ দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে’ এই আয়াতের ভিত্তিতে আপনি ব্যবস্থা নেবেন।
বিন কাসিমের আরো সামনে অগ্রসর হওয়ার তাকিদ ছিল। কিন্তু উরুঢ়ের প্রশাসন কতটুকু কার্যকর ও সফল ভূমিকা রাখতে পারে এ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাঁকে এখানে কিছুদিন অবস্থান করার প্রয়োজন ছিল। তা ছাড়া এখানকার অধিবাসীরা তাদের ওপর ধার্যকৃত জিযিয়া দিতে পারছে কি-না, শহরের অধিবাসীরা সাধারণ ক্ষমার সুযোগে গোপনে নতুন কোন চক্রান্ত ষড়যন্ত্র করছে কি-না এ ব্যাপারটিও নিশ্চিত হওয়া জরুরী ছিল। শাবান ছাকাফীর নিযুক্ত গোয়েন্দারা খবর সংগ্রহ করছিল। তাদের খবর ছিল আশাব্যাঞ্জক। ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসায়ীক কাজকর্ম শুরু করে। শহরের অধিবাসীদের মধ্যে শান্তি ও স্বস্তি ফিরে আসে। বিন কাসিম শহরের নাগরিকদের ওপর ইসলাম গ্রহণ বাধ্যতামূলক করেননি, সেই সাথে হিন্দুদের মন্দিরে গমনেও কোন ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করেননি। ফলে হিন্দুদের মধ্যে পূর্ণস্বস্তি বিরাজ করছিল। কারণ তাদের কারো ইজ্জত সম্ভ্রমের ওপর আক্রমণ হয়নি, তাদের ধনসম্পদ ছিল সম্পূর্ণ নিরাপদ। স্থানীয় অধিবাসীরা দেখেছে, তাদের দেশের সেনারা অধিকাংশ সময় তরি-তরকারীসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য বিনামূল্যে কিংবা নাম মাত্র মূল্যে নিয়ে নিতো। কিন্তু মুসলিম সৈন্যরা পূর্ণমূল্য দিয়ে তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন পণ্য সংগ্রহ করে। বিজয়ী বাহিনীর পক্ষ থেকে এ ধরনের ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ পাওয়াটা ছিল উরুঢ়ের অধিবাসীদের কাছে অভাবণীয়। অবশ্য তারা ইতোমধ্যে জেনে গিয়েছিল বিজয়ী মুসলমানরা বিজিত এলাকার অধিবাসীদের ওপর কোন ধরণের জুলুম অত্যাচার করে না।
মুসলমানদের সতব্যবহার এবং প্রজাহিতৈষীর ফলে উরুঢ়ের সাধারণ হিন্দুরা মনেপ্রাণে মুসলমানদের আনুগত্য মেনে নিল। এদিকে মূসা বিন ইয়াকুব ইসলামের তাবলীগ শুরু করে দিয়েছিলেন। তার দাওয়াতে কিছু পরিবার ইসলামে দীক্ষা নেয়। এমতাবস্থায়ও বিন কাসিম কোন ধরনের ঝুকি নিতে চাচ্ছিলেন না। তিনি সার্বিক পরিস্থিতি বোঝার জন্য রাতে রাণী প্রিয়সীকে তার সাথে সাক্ষাতের জন্য ডেকে পাঠালেন।
রাণী প্রিয়সী ছিল যথার্থ অর্থেই যুবতী ও সুন্দরী। নিজের রূপ সৌন্দর্য ও বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সে রাজা দাহিরের মনে বিরাট প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু রাণী প্রিয়সীকে রাজা দাহির যখন রাণী হিসাবে গ্রহণ করে তখন দাহিরের যৌবন নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল কিন্তু রাণী ছিল তরুণী। আর এই মুহূর্তে রাজা দাহিরের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে গেছে। নিজ বুদ্ধিমত্তায় রাণী
প্রিয়সী বিন কাসিমের আস্থা অর্জন করেছিল। দ্রুপ নিজে বিন কাসিমের প্রতি আস্থাবান ছিল। উরুটে বিজয়ী বাহিনী প্রবেশ করার পর সেই যে রাণীকে রাজ প্রাসাদে প্রবেশের সুযোগ দেয়া হয়, আর বিজয়ী বাহিনীর পক্ষ থেকে তাকে কোন ধরনের নজরদারীতে রাখা হয়নি। এ কয়দিন স্বাধীনভাবেই রাণী প্রিয়সী দাহিরের রাজপ্রাসাদে কাটায়। কিন্তু হঠাৎ করে বিন কাসিমের পক্ষ থেকে রাতের বেলায় সাক্ষাতের আহবানে সে অন্য অর্থ করল। রাণী প্রিয়সীর কাছে বিন কাসিমের এই তলব ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
রাণী প্রিয়সী রাতের বেলায় যখন বিন কাসিমের কক্ষে প্রবেশ করল, তখন বিন কাসিম রাণীকে দেখে অভিভূত হলেন। কারণ যুবতী এই হিন্দু নারীকে তিনি সাধারণ পোশাকে দেখেছিলেন। রাণী যতদিন তার নজরদারীতে অবস্থান করেছিল খুব সাদামাটা পোশাকেই অবস্থান করেছিল। কিন্তু আজ রাতে সেই সাদামাটা রমণীর অবস্থা আর আগের মতো ছিল না। পূর্ণ জৌলুস আর রাজকীয় সাজসজ্জায় কামোদীপ্ত এক রমণীয় পোশাক পরে রাণী এলো বিন কাসিমের কক্ষে। যে রাণীর চেহারা ছবি ছিল যথেষ্ট গম্ভীর আজ সেই রাণীর ঠোটে ইঙ্গিতপূর্ণ মুচকী হাসি, হাটায় চলায় উদ্দীপনাময় ভাবভঙ্গি।
