আপনার এই ধারণা ঠিক নয়। আপনার যুদ্ধ কৌশলে কোন ধরনের দখলদারী করার ইচ্ছা আমার নেই। তা ছাড়া আমি আমাদের কোন লোককেও বাঁচাতে বলছি না। ওরা মনে করেছিল, আপনার সেনারা শহরে প্রবেশ করলে লুটতরাজ ও খুনোখুনিতে মেতে ওঠবে এবং কারো জীবন সম্পদ ইজ্জত আব্রু রক্ষা পাবে না। এই ভয়েই তারা হাতিয়ার সমর্পণ করেনি।
আমরা যুদ্ধরত শত্রু সেনাদের হত্যা করি, কারণ এদের মুক্ত করে দিলে এরা আবার এক জায়গায় জড়ো হয়ে শক্তিসঞ্চয় করে আমাদের ওপর আক্রমণ করে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো শত্রু বাহিনীর শক্তিকে দুর্বল করা।
গণহত্যার ব্যাপারটি থেকে বিরত থাকতে আমি অন্য কারণে আপনাকে অনুরোধ করছি’ বলল রাণী প্রিয়সী। আপনি নিশ্চয়ই আমার চেয়ে ভালো বুঝেন। আপনার বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতাই আপনাকে আরব থেকে এই উরুঢ়ের দুর্গে নিয়ে এসেছে। পাহাড়সম দুর্গগুলো আপনি একের পর এক জয় করে এসেছেন। আমি সবিনয়ে আপনাকে বলতে চাই, বিবেক অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত হতে পারে। আপনি উরুঢ়ের লোকদের সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞাত নন। এই শহর শিল্প ও কৃষি উৎপাদনে ভারত বিখ্যাত। এখানকার অধিকাংশ লোক এমনকি সৈন্যরা পর্যন্ত অবসর সময়ে ক্ষেত খামারে চাষাবাদ ও বিভিন্ন কারিগরি কাজ করে।
এই শহরের প্রায় সব লোক হয় কারিগর নয়তো চাষী নয়তো ব্যবসায়ী। এদের মধ্যে একটি অংশ যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরির কারিগরও রয়েছে। এই শহরে এমন ব্যবসায়ীও রয়েছে যারা সারা হিন্দুস্তান জুড়ে ব্যবসা করে। অবশ্য একথা অস্বীকার করার মতো নয় যে, এসব লোকও সৈন্যদের সাথে আপনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং তারা তাদের ব্যক্তিগত কর্মচারীদের পর্যন্ত যুদ্ধে শরীক করেছিল। তারা প্রতিজ্ঞা করেছিল, লড়াই করেই তারা দুর্গ তাদের কব্জায় রাখবে। ফলে বিজয়ী সামরিক নীতিতে এরা আপনার হাতে নিহত হওয়াটাই স্বাভাবিক কিন্তু আপনি হত্যাকাণ্ড কার্যকর করার আগে একথাও চিন্তা করুন, এদের দেয়া কর ও জিজিয়া দিয়েই তো আপনাকে প্রশাসনের চাকা সচল রাখতে হবে। এরা নিহত হলে আপনাকে শুধু বিপুল অংকের জিজিয়াই হারাতে হবে না, গোটা শহরের সার্বিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে। তখন আপনাকে ঐসব বেকার লোকদের ওপর করের বোঝা চাপাতে হবে, যাদের আসলে একমুঠো শষ্যও কর দেয়ার সামর্থ নেই। তখন তো আপনার সরকারি কোষাগার শুন্য হয়ে পড়বে। একজন হিন্দু রমণীর কথায় বিন কাসিম যুদ্ধবন্দি শত্রুসেনাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করবেন, এমনটি ধারণা করার কোনই অবকাশ ছিল না। তবে রাণী প্রিয়সীর কথাকে তিনি গুরুত্বের সাথে নিয়ে তাঁর সেনাপতি, সামরিক উপদেষ্টা বিশেষ করে গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফীর সাথে পরামর্শ করে যুদ্ধ বন্দীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন।
যুদ্ধবন্দীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার সিদ্ধান্ত রাজা দাহিরের দরবার হলে অনুষ্ঠিত হয়। পরামর্শ বৈঠক শেষে সবাই প্রাসাদ থেকে চলে গেলে বিন কাসিমের সাথে এক বয়স্ক লোক সাক্ষাত করতে এসে আরবী ভাষায় কথা বলে।
আগন্তুকের কথা শুনে বিন কাসিম বললেন, আল্লাহর কসম, তোমার কণ্ঠে তো আরব্য মরুর গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু তুমি তো আরব থেকে আসোনি, এবং আমাদের সেনাদলেরও কেউ নও।
আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন! ইবনে কাসিম! বলল আগন্তুক। আমি সেই সব লোকদের একজন যাদেরকে বিদ্রোহের অভিযোগে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। আমার নাম হামদ। হামদ বিন জাবের। আমি রাজপ্রাসাদে কর্মরত ছিলাম। বর্তমান আরব শাসকদের সাথে আমার শত্রুতা থাকতে পারে কিন্তু আমার দেশ, আমার ধর্ম ও আমার স্বজাতির সেনা নায়কদের সাথে আমাদের কোন শত্রুতা নেই। আমার বিশ্বাস, বনি উমাইয়া যাদেরকে শত্রু ভেবে দেশছাড়া করেছে, পর্দার আড়ালে তুমি এদেশে আসার পর থেকেই তারা তোমাকে অব্যাহত সহযোগিতা করেছে। ইবনে জাবের! দেশ ও ধর্মের স্বার্থে তোমরা যে ত্যাগ স্বীকার করেছে এবং ইসলামের আলো হিন্দুস্তানে ছড়িয়ে দিতে তোমরা যে সহযোগিতা করেছ, আল্লাহ তোমাদেরকে এর উত্তম প্রতিদান দেবেন। তুমি হয়তো জানো, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ আমাকে এই অঞ্চল নতুন বাদশাহীতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্যে পাঠাননি। আমাদের সিন্ধু অভিযানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তোমরা জানো। আমি সিন্ধুতে পা দিয়ে দেখি, এখানকার লোকজন মাটি পাথরের তৈরি মূর্তিকে পূজা করে।
আমি সবার অলক্ষে এক মূর্তির হাত থেকে স্বর্ণ ও মুক্তা খচিত বাজুবন্ধ খুলে ফেলি। সেই মূর্তির কব্জা থেকে আমরা দুর্গ দখল করে নেই কিন্তু আজো পর্যন্ত এখানকার মানুষ মাটি পাথরের তৈরি মূর্তিকেই পূজা করে চলছে। আমি যদি তাদের একথা বুঝাতে চেষ্টা না করি যে, জয় পরাজয়ের একমাত্র মালিক আল্লাহ এবং ইবাদতের উপযুক্ত একমাত্র আল্লাহ, তাহলে কি আল্লাহর কাছে অপরাধী সাব্যস্ত হবো না? কেননা, আল্লাহর জমিনে আল্লাহর রাজত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যই আমি ঘর থেকে বেরিয়েছি।
আমি একটি জরুরী কথা বলতে এসেছি বিন কাসিমা তুমি কি উরুঢ়ের যুদ্ধবন্দীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছ?
হ্যাঁ, আমি কি তা ঠিক করিনি?
সম্পূর্ণ সঠিক সিদ্ধান্ত হয়েছে বিন কাসিম। আমি তোমাকে একথা বলার জন্যই এসেছি। কিন্তু এই জাতির ব্যাপারে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে। এদেরকে শারীরিকভাবে হত্যা করা যাবে না। কিন্তু তাদেরকে মানসিকভাবে নিবীর্য করে ফেলতে হবে। তাদের মনে মূর্তির যে ভূত সওয়ার হয়ে আছে, তাকে হত্যা করে ফেলতে হবে এবং তাতে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিতে হবে। তাদেরকে কোমল কঠোর শাসন করতে হবে। এগুলো কালো সাপ তারা যেন বুঝতে না পারে তাদেরকে মুক্ত ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
