আমি ওর ব্যাপারে কিছুই জানি না।
এতো মস্তবড় যাদুবুড়ি। স্থানীয় লোকজন আমাকে জানিয়েছে, এই যাদুবুড়ি নাকি গোপীকে গণনা শুনে বলেছে, রাজা দাহির মারা গেছে। এই বুড়ি নাকি তার যাদু দিয়ে জানতে পেরেছে, রাজা দাহির মারা গেছে।
হে যাদুবুড়ি! তোমার যাদু দিয়ে কি তুমি দূরের জীবিত মানুষজনকেও দেখতে পারো? বুড়ির উদ্দেশ্যে বললেন বিন কাসিম।
তুমি আমার হাতে এই গোল মরিচের তাজা ডাল দেখতে পাচ্ছে না? এই গাছ সিন্দু অঞ্চলের কোথাও জন্মে না। তুমি কি বলতে পারো যে এটা আমি কোথেকে এনেছি।
আমি কি করে বলবো’ বললেন বিন কাসিম।
হা’ তুমি বলতে পারবে না, তোমার দৃষ্টি শুধু দুর্গ আর সৈন্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তুমি শুধু জয় আর পরাজয় বোঝে। তুমি জানোনা, আগামী কাল তোমার জীবনে কি ঘটবে। তোমার জীবন বেলাতো উদিত হওয়ার সাথে সাথেই ডুবে যাচ্ছে।
আমি শুধু জানি, আল্লাহ আমার ওপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন এই দায়িত্ব পালনে আমার দিনটি কিভাবে কাটল, যাতে আল্লাহর কাছে গেলে আমি বলতে পারি স্বীয় কর্তব্য পালনে আমি কোন ত্রুটি করিনি’ বুড়ির উদ্দেশ্যে বললেন বিন কাসিম।
বিন কাসিম যথার্থ সম্মান প্রদর্শন করে কথিত যাদুবুড়ির সাথে কথা বললেন, কারণ তার কাছে মনে হলো এই বৃদ্ধার কথাবার্তা যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন। কোন মতেই তাকে পাগল বা অপ্রকৃতস্থ বলা যায় না।
তুমি কি ঘোড়া থেকে নামবে না? বিন কাসিমের উদ্দেশ্যে বলল যাদুবুড়ি। তুমি অবশ্যই ঘোড়া থেকে নামবে। তোমার চোখমুখ চেহারা ছবি বলছে, তুমি
অপরাপর রাজা বাদশাদের মতো নও, যারা আমার মতো বৃদ্ধাকে অশ্বখুরে পিষ্ট হওয়ার যোগ্য মনে করে।
বিন কাসিম ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে এলে যাদুবুড়ি তার মাথায় এভাবে হাত রাখলো যে তার হাতের শাহাদত আঙুল বিন কাসিমের নাক বরাবর ছিল। যাদুবুড়ি এরপর বিন কাসিমের চোখের দিকে উঁকি দিয়ে হাত সরিয়ে দুকদম পিছিয়ে গেল। রাজা দাহির মরে গেছে, অথচ সবাই বলে সে নাকি জীবিত। আর তুমি……না আর সামনে শুনতে চেয়োও না। একথা বলে সে নীরব হয়ে গেল এবং এক পাশ দিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো। বিন কাসিম হাত প্রসারিত করে তার গতি রোধ করলেন।
তুমি বলতে না চাইলেও আমি তা শুনবো। বুঝেছি তুমি আমার মৃত্যুর খবর আমাকে শুনাতে চাও না। তুমি হয়তো জানো না, আমরা মৃত্যুকে মেনে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছি। প্রতি মুহূর্তকেই আমরা জীবনের শেষক্ষণ মনে করি। মৃত্যুকে আমরা ভয় করি না। শত্রুর কামান থেকে নিক্ষিপ্ত যে কোন একটা তীরে আমাদের মৃত্যু হতে পারে। তুমি আমাকে মৃত্যুর খবর শোনালেও তাতে আমার মধ্যে কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে না, বললেন বিন কাসিম। রণাঙ্গনে যুদ্ধ ময়দানে তোমার মৃত্যু হবে না, বলল যাদুবুড়ি। তোমার জীবন খুবই সংকীর্ণ। তোমার ভাগ্যতারা খুব দ্রুত ওপরে উঠে গেছে, তাই এটি দ্রুত ভেঙে পড়বে।
কখন তা হবে? জিজ্ঞেস করলেন বিন কাসিম। এ বছরই তা হতে পারে। তবে তোমার জীবনের দ্যুতি কখনো শেষ হবে না। লোকেরা তোমাকে যুগযুগ স্মরণ করবে। বুড়ির কথা শুনে বিন কাসিম হেসে ফেললেন। মৃত্যুর কথায় তার মধ্যে কোন ভাবান্তর ঘটল না।
সব রাজা বাদশারা চায়, তারা যেন অমরত্ব লাভ করে। বহু দিন বেঁচে থাকতে চায়। রাজা বাদশারা মনে করে জগতের সব প্রজাদের হায়াত যদি তারা পেয়ে যেতো। কিন্তু মৃত্যু তাদের জীবনে একদিন হানা দেয় এবং প্রজাদের চোখের সামনেই তাদের জীবনের অবসান ঘটে। প্রজারাই তাকে মাটির নীচে দাফন কিংবা চিতায় পুড়িয়ে দেয়। বিড় বিড় করে বলল যাদুবুড়ি। বিন কাসিম স্মীত হেসে তার পথ ছেড়ে দিলেন। এবার আর যাদুবুড়িকে আটকানোর কোন চেষ্টা করলেন না।
কিছুক্ষণ পর বিন কাসিম রাজ প্রাসাদের সীমানায় প্রবেশ করলেন। উষ্ণ মরুময় এলাকায় সাজানো রং বেরঙের বাহারী বৃক্ষলতা ফুল সজ্জিত দৃশ্য দেখে তিনি অভিভূত হলেন। ঘোড়া থেকে নেমে চতুর্দিকে চোখ বুলালেন বিন কাসিম। তার ঠোটের কোণে যে স্মিত হাসি ছিল তা মিলিয়ে গেল। অনুচ্চ কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন, এই প্রাসাদে সেই রাজা থাকতো যে মনে করতো তার কোন দিন মৃত্যু হবে না। মৃত্যুকে তারা ভৃত্য ভাবতো। বিন কাসিম যখন রাজা দাহিরের রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করলেন তখন রাজ পরিবারের কেউই সেখানে ছিল না। গোপী তার পরিবার পরিজন ও একান্ত ভৃত্যদের নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। বিন কাসিমের সাথে আসা একমাত্র রাণী প্রিয়সীই ছিল রাজপরিবারের সদস্য। বিন কাসিম রাণী প্রিয়সীকে প্রাসাদে প্রবেশের নির্দেশ দিয়ে বললেন, তুমি নিশ্চিন্তে প্রাসাদে থাকতে পারো। বিন কাসিম যখন রাজ প্রাসাদের দরবার কক্ষে প্রবেশ করলেন তখন রাণী প্রিয়সী এসে তার সামনে দাঁড়াল।
আপনার বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করেছিল আপনি কি তাদের সবাইকে হত্যার হুকুম দিয়েছেন, মহামান্য সেনাপতি? হ্যাঁ, দিয়েছি। আমাদের যুদ্ধনীতি মোতাবেক আমরা শুধু তারই জীবন ভিক্ষা দেই, যে শত্রুযোদ্ধা আমাদের সামনে অস্ত্র সমর্পণ করে। নিঃসন্দেহে বিজয়ী বাদশাহের এটাই নীতি হয়ে থাকে। কিন্তু আপনার মতো মানব দরদী বিজয়ী সেনাপতির নীতি এমনটি হওয়া উচিত নয়। কারণ আপনি নিজেকে মানব দরদী বলে থাকেন; বলল রাণী প্রিয়সী। তুমি যদি আমার একান্ত যুদ্ধ কৌশলের ব্যাপারে দখলান্দাজি না কর তাহলে আমি খুশি হবো, প্রিয়সীর উদ্দেশ্যে বললেন বিন কাসিম। তুমি যাদের প্রাণ বাঁচাতে চাচ্ছো, তারা তো তোমার কথাও শুনেনি। তারা তো তোমাকেও গালমন্দ করেছে এবং তোমার ওপর চারিত্রিক অপবাদ পর্যন্ত দিয়েছে।
