অতঃপর তিনি পূজারীদের উদ্দেশ্যে বললেন, এই মন্দিরের পুরোহিত কে? তাকে ডাকো। এক পূজারী দু’হাত প্রসারিত করে করজোড়ে এসে বিন কাসিমের সামনে দাঁড়াল।
এই মূর্তির অপর বাজুবন্ধটি কোথায়? পুরোহিতকে জিজ্ঞেস করলেন বিন কাসিম। পূজারী অজ্ঞতা প্রকাশ করল। এ খবর মূর্তিকেই জিজ্ঞেস করোনা? বললেন বিন কাসিম। এ খবর মূর্তি কি করে বলবে? সে তো নিপ্ৰাণ পাথর। তাই যদি হবে তাহলে তোমরা এর পূজা কর কেন? বললেন বিন কাসিম। তার বাজুবন্ধ কে খুলে নিয়েছে, সে যদি তাই বলতে না পারে তবে এটি তোমাদের কি উপকার করতে পারবে? পুরোহিত নীরব হয়ে গেল। বিন কাসিম স্মিত হেসে মন্দিরের বাইরে চলে এলেন।
১২. সুন্দরী তরুণী
সুন্দরী তরুণীদের ভোগ করতে রাজা বাদশারাও হিংস্র হয়ে ওঠে।
বিন কাসিমের সেই হাসিতে ইসলামের নূর ছিল, তার ঈমানী আভায় সেদিন চমকে ওঠেছিল সিন্ধু অঞ্চলের বালুকারাশি, যে উরুঢ় ছিল ইসলামের চরম শত্রু রাজা দাহিরের ক্ষমতার দাপট, জুলুম অত্যাচারের কেন্দ্র বিন্দু সেটি এখন বিন কাসিমের পদানত। রাজা দাহিরের মৃত্যুর পরও উরুঢ় ছিল হিন্দুদের মর্যাদার কেন্দ্রবিন্দু। তাই এটিকে শত্রুমুক্ত করা ছিল অতি জরুরী।
এদিকে মুসলিম সৈন্যদের দুর্গে প্রবেশের খবর শুনে দুর্গবাসীদের মধ্যে দৌড়ঝাপ শুরু হয়ে গেল। মুসলিম সৈন্যরা যখন দুর্গে প্রবেশ করল তখন শহরের লোকদেরকে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল তাদের ওপর কোন ধরনের জুলুম অত্যাচার করা হবে না। কিন্তু ভীত বিহ্বল জনতা তারপরও নিজেদের সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে বাঁচানোর জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটাছুটি করতে শুরু করে এবং দুর্গ থেকে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ততক্ষণে দুর্গফটকে মুসলিম সৈন্যরা প্রহরা বসিয়েছে দেখে আতঙ্কিত লোকজন নিজেদের ঘরে দরজা বন্ধ করেও স্বস্থিবোধ করতে পারছিলনা। অনেকেই দিকবিদিক ছুটাছুটি করতে শুরু করে।
বিন কাসিম নির্দেশ দিলেন, শহর জুড়ে ঘোষণা করে দাও, শহরের ছেলে বুড়ো নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলো। সবার জীবন সম্পদের নিরাপত্তা দেয়া হলো কারো ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সবাই নিরাপদে নিজ নিজ ঘরবাড়িতে নিশ্চিন্তে অবস্থান করতে পারে। শহরের কোন নারীর ওপর বিজয়ী সৈন্যরা জুলুমতো দূরে থাক তাকিয়েও দেখবে না। তবে যেসব সৈন্য মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তাদেরকে কেউ ঘরে আশ্রয় দিতে পারবে না। কারো ঘরে যদি লুকিয়ে থাকা সৈন্যকে খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে সেই ঘরের নারী শিশু ছাড়া সবাইকে হত্যা করা হবে।
বেলা ডুবা পর্যন্ত শহরময় এই ঘোষণা করা হলো, যাতে সকল দুর্গবাসীর কাছেই বিজয়ী বাহিনীর বার্তা পৌঁছে যায়। ফাতহুল বুলদান’ গ্রন্থে লেখা হয়েছে, বিন কাসিম নির্দেশ দিলেন, যেসব সৈন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছিল তাদেরকে হত্যা করা হোক।’ মন্দির প্রদর্শন এবং শহরের নাগরিকদেরকে নিরাপত্তার ঘোষণা এবং শত্রুসেনাদের হত্যার নির্দেশ দিয়ে বিন কাসিম ধীরে সুস্থে রাজমহলের দিকে অগ্রসর হলেন। তিনি ভেবেছিলেন, তার নির্দেশ মতো কাজ হবে। কারণ তার নির্দেশের ব্যতিক্রম করে মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে নির্দেশের খেলাপ করার কোন দৃষ্টান্তই অতীতে ছিলনা।
নির্দেশ করা মাত্রই উরুঢ়ের যুদ্ধবাজ সৈন্যদের ধরপাকড় শুরু হয়ে গেল। বিদ্রোহী সৈন্যদের পাকড়াও করতে গিয়ে কয়েকজন মুসলিম সৈনিক নিহত হলো।
বিন কাসিম অশ্বারোহণ করে চতুর্দিক দেখে শুনে রাজমহলের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তার সাথে সাথেই অগ্রসর হচ্ছিল একান্ত নিরাপত্তারক্ষী ও চারজন সংবাদ বাহক। এক দুভাষীও তার সাথে ছিল। যে দুভাষী আরবী ও সিন্ধিভাষা অনর্গল বলতে পারতো। এমন সময় এক বিচিত্র পোষাক পরিহিতা বৃদ্ধা বিন কাসিমের নজর কাড়ল। বৃদ্ধা মাথায় একটি লাল কাপড়ের রুমাল বেঁধে রেখেছে এবং সাদা চুল রুমালের বাইরে ঝুলে রয়েছে। বৃদ্ধার গলায় হাজার দানার একটি মালা ঝুলছে। তার পরনে কাধ থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত লম্বা চৌগা! তার পায়ে কোন জুতা ছিল না। তার পা কাপড়ে প্যাচানো। বৃদ্ধা বিন কাসিমের বিপরীত দিক থেকে আসছিল। এক নিরাপত্তারক্ষী তার ঘোড়াকে আগে বাড়িয়ে বৃদ্ধাকে রাস্তা থেকে সরে যেতে বলল। কিন্তু বৃদ্ধা নিরাপত্তারক্ষীর ঘোড়াকে পাশে ফেলে এগিয়ে চলল। তার এক হাতে একটি তাজা গাছের ডাল। আর অপর হাতে কাচের মতো দানার মালা। তার চেহারা মলিন কিন্তু চেহারার দীপ্তি ও দৃষ্টি খুবই তীক্ষ্ণ ও গভীর। দেখে যে কারো মনে হবে বৃদ্ধা পাগলী অপ্রকৃতস্থ। বৃদ্ধার গতিরোধ করার জন্য অপর একজন নিরাপত্তারক্ষী তার ঘোড়াকে বৃদ্ধার সামনে দাঁড় করিয়ে বৃদ্ধা ও বিন কাসিমের মধ্যে আড়াল সৃষ্টি করল।
এমতাবস্থায় বৃদ্ধা দৃঢ় কণ্ঠে সৈনিকের উদ্দেশ্যে বলল, “বিজয়ের গর্বে এতোটা ফুলে যেয়ো না হে অশ্বারোহী!” বিন কাসিমের দু’ভাষী আরবীতে
বৃদ্ধার কথা তাকে জানাল। বৃদ্ধার কথা বুঝে নিয়ে বিন কাসিম নিরাপত্তারক্ষীকে বললেন, সরে যাও ওর সামনে থেকে। নিরাপত্তারক্ষী সামনে থেকে সরে গেলে বৃদ্ধা একেবারে বিন কাসিমের সামনে এসে পড়ল। এমন সময় এক অশ্বারোহী উর্ধশ্বাসে ঘোড়া হাঁকিয়ে বিন কাসিমের পাশে এসে ঘোড়া থামালেন। এই আগন্তুক আর কেউ নন গোয়েন্দা প্রধান শাবান ছাকাফী। গোয়েন্দা প্রধান বিন কাসিমের উদ্দেশ্যে বললেন, সম্মানিত সেনাপতি! আপনি কি জানেন এই বৃদ্ধা কে?
