গোপী অতি সংগোপনে যাদুরাণীর কাছে গিয়েছিল। কিন্তু এ খবর এক কান দু’কান হয়ে শহরময় ছড়িয়ে পড়ল, “আগামীকাল অমুক সময়ে শহরের ময়দানে যাদুগীর বৃদ্ধা মহারাজের ব্যাপারে তথ্য দেবে।
পর দিন বেলা কিছুটা চড়তেই লোকজন এক এক করে খোলা ময়দানে জমায়েত হতে লাগল। এদিকে হঠাৎ দেখা গেল বাহারী এক ধরনের পোশাক পরিধান করে যাদুবুড়ি ময়দানে হাজির হলো। তার হাতে গোল মরিচের একটি তাজা ডাল। সে এই ডালটি একহাতে উঁচিয়ে রেখেছে।
এক পর্যায়ে যাদুবুড়ি উচ্চ আওয়াজে কাপা কণ্ঠে বলল, হে লোক সকল, তোমরা কেন বিভ্রান্তিতে পড়ে আছো। আমি দুনিয়ার একপ্রান্ত থেকে ওপর
প্রান্ত ঘুরে এসেছি এবং সারা হিন্দুস্তান ঘুরে এসেছি, আমি কোথাও তোমাদের রাজাকে দেখতে পাইনি। সে বেঁচে নেই। তোমরা আর রাজার অপেক্ষা না করে নিজেদের শান্তি নিরাপত্তার কথা চিন্তা করো।
যাদুবুড়ির এই ঘোষণায় সাধারণ মানুষ খুবই হতাশ হলো, কারণ দুর্গের লোকজন মুসলমানদের মিনজানিক ও অগ্নিবাহী তীরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও ধ্বংসযজ্ঞের বিবরণ শুনে এমনিতেই আতঙ্কিত ছিল। যাদুবুড়ির মুখে রাজার মৃত্যুর কথা শুনে তখনই তারা দুর্গ মুসলমানদের হাতে তুলে দেয়ার কথা বলাবলি করতে লাগল। লোকজনের এই মনোভাবে সৈন্যরাও প্রভাবিত হলো, তাদের লড়াইয়ের মনোবল ভেঙে গেল।
সৈনিকদের মধ্যে দু’চারজন উর্ধতন কর্মকর্তা মুসলমান বিজয়ীদের সতব্যবহার ও উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্টের কথা আলোচনা করতে শুরু করল।
রাতের বেলায় মুসলমানদের ঘেরাও এর এক জায়গায় এসে একটি তীর। পতিত হলো। তীরের মাথায় পাতলা চামড়ায় একটি পুটলীর মতো বাঁধা। তীরটিতে কোন বার্তা আছে মনে করে গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফীর কাছে তীরটি পাঠিয়ে দেয়া হলো। তীরটিতে পয়গাম লিখা ছিল। এই পয়গাম দুর্গের ভিতর থেকে আলাফীদের এক লোক যে দুর্গের রাজপ্রাসাদে কর্মরত ছিল সে পাঠিয়েছে। জাদুবুড়ির কথা শুনে দুর্গের সাধারণ মানুষ যখন হতাশ হয়ে দুর্গ মুসলমানদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে আর সৈন্যদের মনোবলও ভেঙে পড়ে এমতাবস্থায় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আশঙ্কা প্রবল হতে থাকে। এই পরিস্থিতি আন্দাজ করে দাহিরপুত্র গোপী তার পরিবার পরিজন নিয়ে রাতের আধারে দুর্গ থেকে পালিয়ে গেছে।
এই পয়গাম ছিল বিন কাসিমের জন্য খুবই ফলদায়ক। তিনি সেনাবাহিনীর মনোবল দুর্বল করার জন্য তার সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন, “তোমরা সমস্বরে উচ্চ আওয়াজে তকবীর ধ্বনী দিয়ে দুর্গপ্রাচীরের ওপরে তীর বর্ষণ করো আর একদল দুর্গফটকে আঘাত হানো। বিন কাসিমের নির্দেশে মুসলিম সৈন্যরা যখন সমস্বরে তকবীর ধ্বনী দিলো, দুর্গের ভিতরে অধিবাসীরা মুসলমানদের তকবীর ধ্বনী শুনে আতঙ্কবোধ করতে শুরু করল। দিনের বেলায় হঠাৎ একটি ফটক খুলে কিছু বেসামরিক লোক বেরিয়ে এলো। তারা কিছু দূর অগ্রসর হয়ে উচ্চ আওয়াজে ঘোষণা করল, দুর্গের ব্যবসায়ী ও সম্মানিত নাগরিকরা তাদেরকে পাঠিয়েছে, তারা মুসলিম
সেনাপতির সাথে কথা বলতে চায়। তাদেরকে বিন কাসিমের কাছে নিয়ে গেলে তারা জানাল “আমরা বন্ধুত্বের জন্য এসেছি। দুর্গের ব্যবসায়ী ও অভিজাত লোকেরা যুদ্ধ চায় না। এতোদিন দুর্গবাসীদের বিশ্বাস ছিল রাজা দাহির জীবিত তিনি বিপুল সেনাবাহিনী নিয়ে আসবেন। কিন্তু এখন আমাদের বিশ্বাস হয়েছে, রাজা মারা গেছেন। রাজকুমার গোপী ছিল দুর্গের শাসক। পরিস্থিতি অনুধাবন করে সে দুর্গবাসীকে ফেলে রেখে পরিবার পরিজন নিয়ে পালিয়ে গেছে। এখন আর আমাদের সৈন্যদের আপনার মোকাবেলা করার হিম্মত নেই, সাধারণ মানুষও যুদ্ধের বিরোধী। আমরা আপনার আনুগত্য করতে প্রস্তুত তবে আপনাকে আমাদের জীবন, সম্পদ ও ইজ্জত-আব্রুর নিরাপত্তা দিতে হবে।” বললেন দুর্গের বেসামরিক লোকেরা।
তোমরা বুদ্ধিমানের কাজ করছ, কিন্তু যে পর্যন্ত দুর্গপ্রাচীর ও দুর্গের ভিতরে সৈন্য মোতায়েন থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা তোমাদের কথার ওপর আস্থা রাখতে পারি না। আমাদের আস্থা অর্জন করতে হলে তোমাদেরকে দুর্গপ্রাচীর থেকে সৈন্য অপসারণ করতে হবে এবং ভিতরের শাসকদেরকে দুর্গ থেকে বের করে দিতে হবে। দুর্গের প্রতিনিধিরা চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর মুসলিম সৈন্যরা দেখতে পেল দুর্গপ্রাচীর থেকে একেক করে সৈন্য সরে যাচ্ছে। এর কিছুক্ষণ পর দুর্গের প্রধান ফটক দিয়ে বহুসংখ্যক সেনা অফিসার বের হয়ে এলো এবং তারা তরবারি অবনত করে ধীরপায়ে এগিয়ে এসে বিন কাসিমের সামনে হাতিয়ার ফেলে দিলো এবং দুর্গফটকের চাবি বিন কাসিমের হাতে সোপর্দ করল। বিন কাসিম তার সৈন্যদলের অগ্রভাগে ফটক পেরিয়ে দুর্গে প্রবেশ করলেন। প্রথমেই তার দৃষ্টি পড়ল দুর্গের ভিতরকার একটি মন্দিরে। এই মন্দিরকে স্থানীয় লোকজন নৌবিহার বলে ডাকত। মন্দিরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বিন কাসিমের দৃষ্টি পড়ল মন্দিরের দরজার দিকে। তিনি দেখতে পেলেন বহু লোক একটি মূর্তির সামনে সেজদাবনত। বিন কাসিম ঘোড়া থেকে নেমে মন্দিরের ভিতরে গেলেন। তিনি দেখতে পেলেন, একটি পাথরের তৈরি ঘোড়ার সামনে লোকগুলো সিজদা দিচ্ছে। পাথরের ঘোড়র ওপরে একজন দেবতা সওয়ার। সওয়ারী দেবতার দুই বাহুতে চামড়ার বাজুবন্ধ বাধা। বাজুবন্ধের ওপর সোনা ও মনিমুক্তা খচিত। বিন কাসিম এগিয়ে গিয়ে মুক্তির গা থেকে একটি বাজুবন্ধ খুলে ফেললেন।
