বিন কাসিম আগেই খবর পেয়েছিলেন, শহরের লোকজনকে জানানো হয়েছে, রাজা দাহির জীবিত। তিনি সৈন্য নিয়ে আসছেন। বিন কাসিম রাতের বেলায় তাঁর সেনাপতি ও কমান্ডারদের ডেকে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও রাজার জীবিত থাকার কথা প্রচারের বিষয়টি উত্থাপন করলেন। তিনি বললেন, যতক্ষণ পর্যন্ত দুর্গের লোকজনকে এটা বিশ্বাস না করানো যাবে যে রাজা দাহির মারা গেছে, সে কোন সৈন্যবাহিনী আনতে যায়নি ততোক্ষণ পর্যন্ত ওদের মনোবল চাঙ্গা থাকবে। এ বিষয়টি নিয়ে অনেক পর্যালোচনার পর একজনের বলা একটি কৌশল বিন কাসিমের মনপূত হলো।
তিনি সেটিকে গ্রহণ করলেন। প্রস্তাবটি ছিল, রাণী প্রিয়সীকে ব্যবহার করা। রাণী প্রিয়সী বিন কাসিমের হাতে বন্দি ছিল এবং বাহিনীর সাথেই ছিল। বিন কাসিম রাণী প্রিয়সীকে ডেকে এনে বললেন, “উরুঢ় দুর্গের লোকজন আমাদের মোকাবেলা করার অপচেষ্টা করছে, দুর্গ আমাদের হাতে তুলে দিতে চাচ্ছে না। ওরা ভাবছে রাজা দাহির জীবিত। উরুঢ়ের প্রতারিত লোকজনের প্রতি কি তুমি দয়া দেখাবে না? রাণী প্রিয়সীকে বিন কাসিম আরো বললেন, দেখো রাণী! অবরোধের একমাস হয়ে গেল। এখনো দুর্গের লোকেরা মনে করছে রাজা বিশাল বাহিনী নিয়ে এসে ওদের উদ্ধার করবে। কিন্তু আমি আর অপেক্ষা করতে পারি না। আমি এখন বাধ্য হয়েই দুর্গের ভিতরে মিনজানিক দিয়ে পাথর নিক্ষেপ করতে শুরু করবো। তুমি জানো, আমাদের হাতে আছে অগ্নিবাহী তীর। অগ্নিতীর ও পাথর নিক্ষেপ করতে শুরু করলে গোটা দুর্গশহর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হবে।
“আমাকে বলো, আমি কি করতে পারি, বিন কাসিমের কাছে জানতে চাইলে রাণী প্রিয়সী! তোমরা কি আমাকে দুর্গের ভিতরে যেতে দেবে?”
না, আমরা তোমাকে দুর্গের ভিতরে যেতে দিতে পারি না। এটা হয়তো তোমার জন্য ভালো হবেনা, বললেন বিন কাসিম। কারণ ওরা ভেবে বসতে
পারে তুমি স্বেচ্ছায়ই আমাদের সাথে যোগ দিয়েছো। তুমি বরং আমার সাথে দুর্গপ্রাচীরের কাছে গিয়ে বলো, রাজা দাহির রাওয়া যুদ্ধে মারা গেছে। সে কখনো আর সৈন্য নিয়ে ফিরে আসবে না। তুমি আমাদের হাতে বন্দি। মায়ারাণী আত্মহুতি দিয়েছে। এখন দুর্গ আমাদের হাতে তুলে না দিলে দুর্গবাসীকে কি ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি হতে হবে। হ্যাঁ, ঠিক আছে, আমি তাই বলবো। তোমরা আমাকে দুর্গপ্রাচীরের কাছে নিয়ে চলো। রাজা দাহিরের নিজস্ব যে হাতিটি ছিল, সেটি ছিল সর্বপরিচিত সাদা হাতি, সেটি রাওয়া যুদ্ধে মারা পড়েছিল। রাজা দাহিরের বিশেষ একটি উট ছিল। এটির রং ছিল কালো। উটটি বিন কাসিমের কব্জায় ছিল।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, রাণী প্রিয়সী ও রাজা দাহির মাঝে মধ্যে একই সাথে কালো উটে আরোহণ করতো। বিন কাসিম রাণী প্রিয়সীকে রাজা দাহিরের উটে সওয়ার করে নিজে একটি ঘোড়ায় সাওয়ার হলেন। অবরোধকারী মুসলিম সৈন্যদের কাছে গিয়ে বিন কাসিম থেমে গেলেন এবং রাণী প্রিয়সীকে সামনে যেতে নির্দেশ দিলেন। রাণী প্রিয়সী দুর্গের প্রধান ফটকের কাছে গিয়ে থামলো এবং চেহারা থেকে নেকাব খুলে ফেলল। দুর্গশাসক প্রাচীরের ওপরে দাঁড়ানো ছিল। দুর্গবাসীদের উদ্দেশ্যে রাণী প্রিয়সী উচ্চ আওয়াজে বলল, হে দুর্গবাসী! আমাকে তোমরা চেনো। আমি তোমাদের রাণী, তোমাদের শাসকদের ডাকো, আমি তাদের সাথে কথা বলব। কিছুক্ষণ পর দুর্গপ্রাচীরের ওপরে এসে দাঁড়াল দাহিরপুত্র গোপী। দুর্গের নিরাপত্তা কর্মকর্তাও তার সাথেই ছিল। দুর্গপ্রাচীর থেকে আওয়াজ এলো, আমরা তোমাকে চিনে ফেলেছি রাণী! বলল কি বলতে চাও।
“মহারাজ দাহির মারা গেছেন! তোমরা একথা বিশ্বাস করো,” দুর্গবাসীদের উদ্দেশ্যে বলল রাণী প্রিয়সী। তিনি জীবিত থাকলে আমাকে মুসলমানদের হাতে বন্দিত্ববরণ করতে হতো না। মহারাজের মাথা ও তার ঝাণ্ডা মুসলমানরা আরব দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, একথা বলে রাণী উচ্চ আওয়াজে কাঁদতে শুরু করল। কিন্তু দুর্গপ্রাচীরের ওপরে দাঁড়ানো লোকদের প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল, তারা একথা মোটেও বিশ্বাস করেনি।
তুমি মিথ্যা বলছে, দুর্গপ্রাচীর থেকে রাণীর উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল গোপী। তুমি ওইসব লুটেরা আরব গোমাতা খোরদের জাদুর খপ্পরে পড়েছ। মহারাজ জীবিত আছেন, বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে তিনি অবশ্যই আসবেন। ওদের সাথে মিশে তুমি নিজেকে অপবিত্র করে ফেলেছো রাণী! মহারাজ ফিরে এলে তোমার আশ্রয় দাতাদের চিহ্নও খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমি তোমাদেরকে ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে রক্ষার জন্যেই এসেছি, কান্না জড়িত কণ্ঠে বলল রাণী। তুমি জানো না গোপী! মুসলমানরা গোটা শহরটাকে ধ্বংস করে ফেলবে, আমার কথা বিশ্বাস করো। আমাকে অবিশ্বাস করো না।
কিন্তু রাণীর কথায় কেউ সায় দিলো না, বরং প্রাচীরের ওপর থেকে রাণীকে গালমন্দ করতে শুরু করল দুর্গবাসিরা। অবস্থা দেখে বিন কাসিম রাণী প্রিয়সীকে ডেকে বললেন, রাণী! তুমি ফিরে এসো। ওদের কপাল খুবই মন্দ। ওদের ভাগ্যে ধ্বংসই লেখা রয়েছে। এ থেকে ওদের কেউই রক্ষা পাবেনা। রাণী অগত্যায় ফিরে এলো।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, রাণী প্রিয়সীর কথায় গোপী ও অন্যান্যরা বিশ্বাস করলনা বটে কিন্তু তাদের মনে সংশয় দেখা দিল। কারণ একমাসের বেশি সময় ধরে মুসলমানরা উরুঢ় দুর্গ অবরোধ করে রেখেছে, রাজা দাহির অন্তরাল হয়েছে আরো আগে কিন্তু এখনো পর্যন্ত না তার কোন খবর পাওয়া গেল, না উরু রক্ষায় কোন সেনাবাহিনী এগিয়ে এলো। সংশয় দূর করতে গোপী কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তাকে নিয়ে দুর্গের এক বৃদ্ধা যাদুরাণীর কাছে গেল। যাদুরাণী আশ্চর্যজনকভাবে অনেক ভবিষ্যতবাণী বলে দিতে পারে বলে দুর্গের সবাই বিশ্বাস করত। যাদুরাণী গোপীকে বলল, রাজা দাহির সম্পর্কে তাদের জিজ্ঞাসার জবাব সে আগামী কাল উন্মুক্ত ময়দানে দেবে।
