তা হলে শুনে রাখো হে আরব সেনাপতি। আজ থেকে আমরা ঠিক সেই রকম মানুষ হয়ে গেলাম যেমনটি তুমি দেখতে চাও। আমরা তোমার আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছি। তুমি যা ইচ্ছা আমাদের ওপর কর ধার্য করতে পারো। আমরা খুশী মনেই তা পরিশোধ করবো। আজ থেকে তোমাদের সব ধরনের কাপড় পরার অনুমতি দেয়া হলো, বললেন বিন কাসিম। আর কাউকেই খালি পা ও খালি মাথায় থাকতে হবে না।
এখন থেকে তোমরা জিন লাগিয়ে ঘোড়ায় সওয়ার হতে পারবে। কিছুদিন আমি তোমাদের দেখবো, তোমরা আমাকে দেয়া প্ৰতিশ্রুিতি রক্ষা করছে কি না। তোমরা যদি আমার কথা মেনে চলো, তাহলে কিছুদিন পর তোমাদের লোকজনকে আমরা সেনাবাহিনীতে ভর্তি করে নেবো।
যে জাট জনগোষ্ঠী ছিল হিংস্র লুটেরা কলহপ্রিয় ও খুনী এবং অনিয়ন্ত্রিত বিন কাসিমের দূরদর্শিতায় তারা সুসভ্য জাতিতে পরিণত হলো। বিন কাসিম জাট সর্দার বহুরিয়াকে তার সমান্তরালে বসিয়ে কথা বললেন এবং তাকে কিছু হাদিয়া তোহফা দিলেন এবং তার মাথায় পাগড়ী পরিয়ে দিয়ে পায়ে জুতা পরিয়ে দিলেন।
ইবনে কাসিম! আমাদের ওপর কৃতজ্ঞতামূলক সেজদা ওয়াজিব হয়ে গেছে, বললেন বিন কাসিমের পাশে বসা সেনাপতি বিন আমের। কারণ এই ঝুকিপূর্ণ দুর্ধর্ষ জনগোষ্ঠী খুব সহজেই আমাদের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে। কথাগুলো আরবীতে বললেন বিন আমের।
বিন কাসিম তার কথায় হেসে বললেন, হে ইবনে আমের! তুমি যদি সেজদা শোকর ওয়াজিব মনে করে থাকো, তাহলে এই অঞ্চলের শাসকের দায়িত্বে তোমাকেই নিয়োগ করবো।
বহুরিয়াকে বিদায় করতে তারা সবাই তাঁবু থেকে বেরিয়ে দেখেন বহুসংখ্যক জাট গোষ্ঠীর লোক বাইরে দাঁড়ানো। তারা মাথায় পাগড়ী ও পায়ে জুতা পরিহিত অবস্থায় তাদের সর্দার বহুরিয়াকে হাসিমুখে বেরিয়ে আসতে দেখে আনন্দে ঢোল পেটাতে লাগল এবং নাচতে গাইতে শুরু করল। ওদের নাচ ও গান বন্ধ হলে সেনাপতি ইবনে আমের তার পকেট থেকে বিশ দিরহাম বের করে তাদের হাদিয়া দিলেন।
জাটদের সমস্যা সহজে মিটে যাওয়ায় বিন কাসিমের মাথা থেকে বিরাট বোঝা অপসারিত হলো। তিনি সেখান থেকে অগ্রাভিযানের নির্দেশ দিয়ে দিলেন। এখন বিন কাসিমের সামনে এলো সবচেয়ে কঠিন মনজিল। উরুঢ় রাজা দাহিরের রাজধানী। বিন কাসিম অনেক আগেই তার গোয়েন্দা দাহিরের রাজধানীতে নিয়োগ করে রেখেছিলেন। তাদের কাছ থেকে উরুঢ় সম্পর্কে তথ্য জেনে বিন কাসিম তাঁর রণকৌশল নির্ধারণের জন্যে বসে গেলেন।
রাজা দাহিরের মৃত্যুর পর তার এক ছেলে গোপী উরুঢ়ের ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল। গোপী কিছুতেই তার বাবার মৃত্যুর খবরে বিশ্বাস করতো না।
তার কাছে রাজার মৃত্যু খবর বলার সাহসও কেউ পেতো না। বিন কাসিম উরুঢ়ের দিকে রওয়ানা করে সূর্য ডোবার আগেই উরুঢ় থেকে মাইলখানিক দূরে গিয়ে যাত্রা বিরতি করলেন। উরুঢ় অবরোধ করার
আগেই বিন কাসিম তাঁবুর এলাকায় দ্রুত একটি মসজিদ তৈরি করেন। প্রথম জুমআর দিনে এই মসজিদে তিনি জুমআর খুতবা দেন এবং জুমআর নামাযের পর উরুঢ় দুর্গ অবরোধ করেন।
মুসলমানদের অবরোধের খবর শোনামাত্রই উরুঢ় দুর্গে হৈ চৈ পড়ে গেল। মুসলমানদের ভয় ও আতঙ্কে এমনিতেই সাধারণ মানুষ ছিল আতঙ্কিত। সেনাবাহিনীর মধ্যেও ভীতি কাজ করছিল। কারণ এ পর্যন্ত মুসলমানদের কোন রণাঙ্গনে পরাজয়ের খবর তারা জানতো না। বিন কাসিমের বাহিনী একের পর এক জয়ের মধ্য দিয়ে অবশেষে উরু পর্যন্ত এসে পৌছে গেল। অবরোধ আরোপের সাথে সাথে উরুঢ়ের প্রধান মন্দিরে বিরতিহীনভাবে ঘণ্টা বাজতে শুরু করে। শহরের মে
রের মধ্যে দৌড়ঝাপ শুরু হয়ে যায়। দলে দলে মানুষ মন্দিরে গিয়ে ভীড় করে। মন্দিরে বিপুল মানুষের স্থান সংকুলান না হওয়ায় অধিকাংশই মন্দিরের বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকে।
সমবেত লোকজনদের উদ্দেশ্যে তখন মন্দিরের পুরোহিত ঘোষণা করল, হে উরুটের অধিবাসীরা! তোমরা ভয় করো না। মহারাজ বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে আসছেন। তোমরা দেখেছো, রাজকুমার গোপী যেভাবে দুর্গের বাইরে থেকে এখানে পৌছে গেছেন, মহারাজও ঠিকই পৌছে যাবেন। রাওয়াত মহারাজের মৃত্যু হয়েছে একথা বিশ্বাস করো না। মুসলমানদের মৃত্যু অত্যাসন্ন। মৃত্যুই তাদেরকে এখানে নিয়ে এসেছে।
মন্দিরের পুরোহিতরা রাতদিন একটানা রাজা দাহিরের সৈন্যদল নিয়ে ফিরে আসার কথা ঘোষণা করছিল এবং লড়াইয়ের জন্য লোকজনকে উৎসাহিত ও বিক্ষুব্ধ করার চেষ্টা করছিল। পুরোহিতরা বলতে লাগল, মহারাজ বিশাল সৈন্যদল নিয়ে মুসলমানদের ওপর পিছন থেকে হামলা করবেন। মুসলমানরা মহারাজ ও দুর্গের সৈন্যদের দ্বিমুখী আক্রমণের মাঝে পড়ে পিষ্ট হয়ে যাবে। এদিকে বিন কাসিম আরবদের কৌশল প্রয়োগ করে দুর্গ জয়ের চেষ্টা শুরু করে দিলেন। কয়েকবার তীরন্দাজদের সহায়তায় দেয়ালে ভাঙন সৃষ্টির চেষ্টা করা হলো। কিন্তু প্রতিবারই হিন্দু সৈন্যরা বীরত্বের সাথে মোকাবেলা করে মুসলিম সৈন্যদের দুর্গপ্রাচীর থেকে চলে আসতে বাধ্য করল। এক পর্যায়ে দুর্গপ্রাচীরে দাঁড়ানো হিন্দু সৈন্যরা মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল, আরে আহম্মকের দল! তোমরা কেন আরবে ফিরে যাচ্ছে না। তোমরা কি
আমাদের হাতেই প্রাণ দিতে পণ করেছ? একথা বলার পর দুর্গপ্রাচীরের সৈন্যরা একযোগে হেসে উঠল। অতঃপর তারা মুসলিম যোদ্ধাদের প্রতি নানা ব্যঙ্গ বিদ্রোপ করতে শুরু করল। বার বার হিন্দু সৈন্যরা বলতে লাগল, ‘হে। আরব বোকার দল! মৃত্যু তোমাদেরকে এখানে টেনে এনেছে। এখনো সময় আছে, দেশে ফিরে যাও।’ এক সৈন্য বলে উঠল, এখনো মহারাজ দাহির জীবিত আছেন, তার ফিরে আসার আগেই তোমরা পালিয়ে যাও।
