হে আরব সেনাপতি! আমার কওমের লোকেরা তোমাকে যেভাবে অভ্যর্থনা জানিয়েছে, তা থেকেই তোমার বুঝে নেয়া উচিত আমি কি উদ্দেশে এসেছি? বলল বৃদ্ধ জাট সর্দার। আমরা যাকে পছন্দ করি, যাকে সম্মান করি, তাকে এ ভাবেই অভ্যর্থনা জানাই। এটা আমাদের কওমের রীতি। আমাদের এলাকায় তোমাদের আগমনে আমরা খুশি হয়েছি।’ এখন আর এই এলাকা তোমাদের নয় সর্দার, এটা আমার এলাকা। এই এলাকা তখন তোমাদের হবে, যখন তোমরা আমার কাছে এটা প্রমাণ করবে যে, এই এলাকার কর্তৃত্ব করার যোগ্যতা তোমাদের আছে। তোমরা তো একটা বীর জাতি ছিলে এখন তোমরা এমন লুটেরা খুনি জনগোষ্ঠীতে পরিণত হলে কেন? জিজ্ঞেস করলেন বিন কাসিম।
আমাদের এই অবনতির কারণ রাজা চাচ। সে আমাদেরকে সকল অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। রাজা চাচের ওপর যখন ইরানীরা আক্রমণ করেছিল, তখন সে আমাদেরকে দিয়ে যুদ্ধ করায়। তখন যদি আমরা জীবনবাজী রেখে যুদ্ধ না করতাম তবে ইরানীরা গোটা সিন্ধু অঞ্চল কব্জা করে নিতো। রাজা চাচ ও তার ছেলে দাহিরের কোন নাম নিশানাও থাকতো না।
কিন্তু আমরা নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়ে ইরানীদের মাকরান থেকে আর সামনে অগ্রসর হতে দেইনি। কিন্তু রাজা চাচ আমাদের কোন সহযোগিতাই করেনি। ফলে বহুসংখ্যক জাট ইরানীদের হাতে বন্দি হয়। জাট বন্দীদেরকে ইরানীরা পশুর মতো থাকতে বাধ্য করে। কিন্তু তোমাদের পূর্বপুরুষরা যখন ইরান আক্রমণ করে তখন ইরানীরা জাটদের দাসত্ব থেকে
মুক্তি দিয়ে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত করে। যুদ্ধে জাটরা আরবদের হাতে বন্দি হয়? আমরা যারা তাদের উত্তরসূরী ছিলাম তাদের পরাজয় ও বন্দিত্বের কারণে শাস্তি নেমে এলো আমাদের ওপর। রাজা চাচ আমাদের সব ধরনের মানবিক অধিকার কেড়ে নিলো। বাধ্য হয়েই আমরা লুটতরাজের পথ বেছে নিলাম। বৃদ্ধ জাট সর্দারের বলার ভঙ্গি এমন আবেগপূর্ণ ছিল যে, বিন কাসিম মনোযোগ দিয়ে তা শুনছিলেন। তুমি জানো না আরব সেনাপতি। আমাদের সাথে এখানকার শাসকরা কেমন আচরণ করে তা তুমি জানো না। মোটা কম্বল ছাড়া আমাদের কোন কাপড় পড়ার অধিকার নেই। আমাদের পায়ে জুতো পরার অধিকার নেই। আমরা মাথায় পাগড়ী বাঁধতে পারিনা। আমরা ছিলাম ঘোড় সওয়ার জাতি। কিন্তু রাজা চাচ আমাদের অশ্বারোহণে নিষেধাজ্ঞা জারী করে। যদিও বা কোন শাসকের অনুমতিতে আমাদের কোন সর্দারকে ঘোড়ায় সওয়ার হওয়ার অনুমতি দেয়া হয় তবে সে ঘোড়ায় জিন লাগাতে পারে না। আমাদের কয়েকটি গোষ্ঠীর নারী শিশু আবাল বৃদ্ধ সবাইকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এরপর থেকে আমরা রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছি। যেখানেই আমরা সুবিধা পাই লুটতরাজ করি। এখন বলল, হে আরব সেনাপতি! তুমিও কি রাজার মতোই আমাদের সাথে আচরণ করবে?
এ প্রশ্নের জবাব তুমিই ভালো দিতে পারো, বললেন বিন কাসিম। তোমরা যদি আমার পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি এমন আচরণই প্রত্যাশা করো এবং এমন আচরণই করো তাহলে পূর্বের রাজার দুঃশাসন থেকেও আমার আচরণ হবে আরো কঠোর। আরব থেকে আমাকে হুকুম দেয়া হয়েছে, যে বিশৃঙ্খলা, হাঙ্গামা ও খুনাখুনি করবে তাদেরকে হত্যা করে ফেলবে। আর যারা শান্তি ও নিরাপদ জীবন-যাপনে আগ্রহী তাদেরকে পূর্ণ নিরাপত্তা ও সুযোগ সুবিধা দেবে এবং তাদের ওপর সহজ ও লঘু কর আরোপ করা। আমাকে এই নির্দেশও দেয়া হয়েছে, যারা সেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করবে তাদেরকে সাধারণ মুসলমানদের মতোই সুযোগ সুবিধা দিতে হবে। আমার ধর্মেরও নির্দেশ হলো, সকল মানুষ সমান। মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই। তোমার ও আমার মধ্যে মানুষ হিসাবে কোন পার্থক্য নেই, পার্থক্য যতটুকু আছে তা শুধু দায়িত্ব ও কর্তব্যের। সর্দার। তুমি কি আমার কথা বুঝতে পারছে।
তোমার সব কথাই আমি বুঝতে পারছি আরব সেনাপতি! বলল জাট সর্দার। তুমিতো এখনো দুনিয়াকে ততোটা দেখোনি। তোমার বয়সটা আমার কেটেছে ঘোড়া ও তাঁবুতে। আমি জগতটাকে অনেক দেখেছি। তুমি যদি আমাদেরকে মানুষের মর্যাদা দাও, তাহলে আমরা তোমাকে তোমার বাহিনীর সেনাদের মতোই সুসভ্য মানুষ হয়ে দেখিয়ে দেবো। এটা মনে করো না, তোমার সেনাবাহিনীর ভয়ে আমি একথা বলছি। আমি তোমাদের ধর্মের রীতি-নীতি সম্পর্কে জানি। আমি তোমাদের ধর্ম গ্রহণ করবো কি করবো না এটা পরের কথা কিন্তু আমি জানি, তোমাদের ধর্ম আমার ও রাজা দাহিরের ধর্ম থেকে ভালো। আমি শুনেছি, এ পর্যন্ত তুমি যেসব অঞ্চল জয় করেছে, সেখানকার অধিবাসীদের ওপর কোন জুলুম অত্যাচার করোনি।
তোমার গোত্রের সব লোক কি তোমার নির্দেশ মেনে চলে? জিজ্ঞেস করলেন বিন কাসিম।
আমার গোত্রের লোকেরা শুধু আমার নির্দেশই মান্য করে না, ওরা তো আমাকে রীতিমতো ভগবানের মতো সম্মান করে। তুমি বলো, কোন নির্দেশ তুমি মানাতে চাও? বলল জাট সর্দার বহুরিয়া।
আমি চাই, তোমরা মানুষের মতো জীবন-যাপন করো এবং আমাদের কাছ থেকেও মানুষের আচরণ প্রত্যাশা করো। আমার ধর্মের বিধিনিষেধকে দেখো। আমার বাহিনীর কোন সিপাহী বা কর্মকর্তা সম্পর্কে যদি কোন অপরাধের অভিযোগ করো, তাহলে তাকেও এমনই শাস্তি দেয়া হবে যেমন শাস্তি তোমাদেরকে রাজা দাহিরের পক্ষ থেকে দেয়া হতো।
