কয়েক দিনের মধ্যেই হাজ্জাজ বিন ইউসুফের জবাবী পত্র এসে গেল। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ লিখলেন
প্রিয় বসছ’ তোমার ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। তুমি জাট জনগোষ্ঠী সম্পর্কে আমার মতামত জানতে চেয়েছে। আমার মতামত
পরিষ্কার। যে জনগোষ্ঠী তোমার বিরুদ্ধে লড়াই করে অথবা যে জনগোষ্ঠী তোমার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং যারা অব্যাহতভাবে তোমার বিরুদ্ধাচরণ করছে, তাদের সকল যোদ্ধা ও নেতৃস্থানীয় লোকদের পাকড়াও করে হত্যা করবে। জাট জনগোষ্ঠীকে আমুলী কোন জনগোষ্ঠী মনে করো না। তুমি নিশ্চয়ই জানো এই জনগোষ্ঠীর লোকেরাই ইরানীদের পক্ষ হয়ে খালিদ বিন ওয়ালীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। ওরা খুবই বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছিল। ওদের চরিত্র বৈশিষ্ট্যের কিছু তুমি উল্লেখ করেছো। আমি আগেই ওদের সম্পর্কে জানতাম। জাট জনগোষ্ঠী তোমার মোকাবেলায় যুদ্ধ না করলেও ওরা তোমার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ওরা তোমাকে নিশ্চিন্তে থাকতে দেবে না।
লুটতরাজ হিংসা খুনাখুনিই ওদের পেশা। বংশ পরস্পরায় ওরা লুটতরাজ করে আসছে।
ওদের নিয়ন্ত্রণ করতে তোমাকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ওদের মধ্যে কে কে যোদ্ধা ও খুনাখুনিতে সিদ্ধহস্ত তোমাকে তাদের খুঁজে বের করতে হবে এবং এদের হত্যা করে ফেলতে হবে। এ ছাড়া ওদের নারী শিশুদেরকে ধরে এনে পণবন্দি হিসেবে তোমার কাছে রাখতে হবে। তবে ওদেরকে এমন লোকদের প্রহরাধীনে রাখতে হবে যাতে নারী শিশুদের ওপর কোন নির্যাতন না হয়। এ ছাড়া ওদের মধ্যে যেসব লোক ব্যবসায়ী কৃষিজীবী কারিগর ওদের ওপর খুবই হাল্কা কর আরোপ করবে। ওদের মধ্যে যারা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করবে তাদের ওপর জিযিয়া ধার্য না করে উশর ধার্য করবে। সেই সাথে তাদেরকে ইসলামী হুকুম আহকামের সাথে পরিচিত করার ব্যবস্থা নেবে। বস্তুত তুমি অতি কাছে থেকে ওদের দেখছো, আশাকরি বাস্তবতার নিরীখে কী করণীয় সে সম্পর্কে তুমিই ভালো বুঝবে। তবে খুব সতর্কতা ও দূরদর্শীতার সাথে ওদের ব্যাপারটি সামলাতে হবে।
হাজ্জাজ কঠোর হতে বললেও বিন কাসিম জাটদের প্রতি অতোটা কঠোর হলেন না। তিনি ওদেরকে কৌশল ও মানবতার দীক্ষা দিয়ে সভ্যতায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে লাগলেন।
কিছুদিন পর বিন কাসিম সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে জাটদের অপর একটি গোষ্ঠী সিমা কওমের আবাসস্থলের কাছে গিয়ে শিবির স্থাপন করলেন। সিমা কওম জাটদের ওই জনগোষ্ঠী যাদেরকে কোন শাস্তিই বাগে আনতে পারেনি। বিন কাসিমের সৈন্যরা যখন শিবির স্থাপনের জন্যে খুঁটি পুঁততে শুরু
করে তখন শোনা গেল জাট জনবসতীর দিক থেকে ঢোল ও বাদ্য বাজনার আওয়াজ। কিছুক্ষণের মধ্যে বাদ্য বাজনার আওয়াজ ও মানুষের শোরগোল আরো এগিয়ে এলো। বিন কাসিম কয়েকজনকে নির্দেশ দিলেন, দেখে এসো তো এই বাদ্য বাজনা কারা করছে এবং কারা এ দিকে বাজনা বাজিয়ে অগ্রসর হচ্ছে?
কারো যাওয়ার দরকার নেই সম্মানীত সেনাপতি। এরা জাট জনগোষ্ঠী, বলল বিন কাসিমের দলের সাথে থাকা দাহিরের সাবেক উজির সিয়াকর। এটা জাটদের রীতি। ওরা যখন কাউকে অভ্যর্থনা জানায় তখন এভাবে ঢাকঢোল বাজায়। মনে হচ্ছে, ওরা আপনাকে অভ্যর্থনা জানাতেই বাদ্য বাজনা নিয়ে নেচে গেয়ে এদিকে আসছে।
আমার তো মনে হয় এরা আমাদের ওপর আক্রমণ করার মতো এতোটা বোকামী করবেনা, বললেন বিন কাসিম। তিনি একথা বলে একটি ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে জাটদের আসার দিকে অগ্রসর হলেন।
বিন কাসিম ঘোড়া ছুটাতেই তাঁর একান্ত নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁর পিছনে ঘোড়া ছুটাল। জাট জনগোষ্ঠী খোলা মাথা ও খালি পায়ে নেচে গেয়ে বাদ্যের তালে তালে এদিকে অগ্রসর হচ্ছিল। বিন কাসিম উন্মাতাল নাচে লিপ্ত মিছিলের কাছে গিয়ে ঘোড় থামিয়ে এক লাফে নীচে নেমে পড়লেন। বিন কাসিমকে দেখে জাটদের বাজনা আরো চড়ে গেল এবং নাচগান আরো তীব্র আকার ধারণ করল। এরপর বাদ্য বাজনা থামলে ওদের মিছিল থেকে দু’তিন জন লোক তার দিকে এগিয়ে এসে বিন কাসিমের সাথে মুসাফাহা করল। বিন কাসিমের সাথে দুভাষী ছিল, তার মাধ্যমে তিনি ওদের সাথে কথা বললেন। জাটরা তাদের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করার জন্যে একজন সর্দার ধরনের লোককে সামনে এগিয়ে দিল।
আমরা আপনাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য এসেছি। তবে জানি না, আপনি আমাদের অভ্যর্থনা গ্রহণ করবেন কি না।
তোমরা যদি তোমাদের পেশা ত্যাগ করো তাহলে আমি শুধু তোমাদের অভ্যর্থনাই কবুল করবো না, বরং তোমাদেরকে আমাদের বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করবো। কিন্তু তোমরা যদি তোমাদের আচরণ ও পেশা পরিবর্তন না কর তা হলে পূর্ববর্তী রাজাদের থেকে আরো কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।
আচ্ছা, তোমরা কি তোমাদের মধ্য থেকে এমন কোন সর্দারকে আমার কাছে পাঠাতে পারো, যার সাথে আমি সব ধরনের কথা বলতে পারি?
হ্যাঁ, নিশ্চয় পাঠাবো! বলল জাট সর্দার। আমরা আপনার কাছে আমাদের এমন সর্দারকেই পাঠাবো যার সাথে আপনি সব ধরনের আলাপ আলোচনা করতে পারবেন। অতঃপর জাট জনগোষ্ঠীর মিছিলটি পুনরায় নেচে গেয়ে বাদ্যবাজনা বাজাতে বাজাতে তাদের বসতির দিকে চলে গেল। ওদের দেখে বিন কাসিম কিছুটা স্বস্তিই বোধ করলেন। কিছুক্ষণ পরে বহুরিয়া নামে এক বৃদ্ধ জাট সর্দার আরো তিনজনকে সাথে নিয়ে বিন কাসিমের সাথে সাক্ষাত করতে এলো। বিন কাসিম তার তাবুতে সসম্মানে এদের বসালেন। তখন শা’বান ছাকাফীও আরো দু’জন সেনাপতি বিন কাসিমের তাবুতে বসা ছিলেন। হে জাট সর্দার! বলল তোমরা কি উদ্দেশে আমার এখানে এসেছ? দু’ভাষীর মাধ্যমে জাট সর্দারকে জিজ্ঞেস করলেন বিন কাসিম।
