এই বিশ্বাসের কারণ ছিল রাওয়া যুদ্ধে দাহিরের অধিকাংশ সৈন্য নিহত হয়েছিল। যারা জীবন নিয়ে পালাতে পেরেছিল তাদের কেউই রাজা দাহিরের মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেনি। এর মধ্যে এই বিশ্বাসকে আরো দৃঢ় করেছিল রাজা দাহিরের ছোট স্ত্রীর খবর। দাহিরের ছোট স্ত্রী রাণী প্রিয়সী ব্রাহ্মণবাদের সৈন্যদেরকে রাজার মৃত্যু খবর দিয়ে প্রতিশোধের জন্য প্রস্তুত করেছিল বটে কিন্তু সে উরুঢ়ে সংবাদ দিয়েছিল রাজা দাহির জীবিত। তাই উরুঢ়ে এই খবরই প্রচার হয়ে গিয়েছিল, দাহির হিন্দুস্তানের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সৈন্য সংগ্রহের জন্যে সফর করছেন।
অনেক ঐতিহাসিকও লিখেছেন, আসলে এই প্রচারণা অমূলক ছিল না, রাজার বংশের অধিকাংশ লোকের ধারণা ছিল রাজা মরেনি। সে সেনা সংগ্রহে লিপ্ত রয়েছে। উরুঢ়বাসী এ খবরও জানতো না রাণী প্রিয়সী বিন কাসিমের হাতে বন্দি হয়েছে এবং মায়ারাণী আত্মহত্যা করেছে।
বিন কাসিম ৯৪ হিজরী সনের ৩ মুহররম উরুঢ়ের দিকে রওয়ানা হলেন। বিন কাসিম ডাহতা নামক একটি ঝিলের কাছে তাবু ফেলে আশেপাশের অধিবাসীদের খবর দিলেন, তারা যেন আরব বাহিনীর আনুগত্য স্বীকার করে নেয়। কেননা মুসলমানরা এখন সিন্ধুর শাসক। রাজা দাহির মারা গেছে। এলাকাটি ছিল বৌদ্ধ অধ্যুষিত। অধিকাংশ অধিবাসী ছিল ব্যবসায়ী। খবর
পাওয়া মাত্রই বৌদ্ধদের সর্দার বিন কাসিমের সাথে সাক্ষাত করতে এলো। বৌদ্ধ সর্দার এসে শুধু আনুগত্যই প্রকাশ করল না, সব ধরনের সহযোগিতা ও বিশ্বস্ততা বজায় রাখার প্রক্রিতি ব্যক্ত করল। বৌদ্ধদের মধ্যে দু’জন ছিল খুবই উঁচুমানের সর্দার। বিন কাসিম তাদের যথাযোগ্য সম্মান দিয়ে তাদেরকে তার সরকারের ট্যাক্স আদায়ের দায়িত্বে নিয়োগ করলেন। বিন কাসিম বৌদ্ধ সর্দারদের বললেন, তোমাদের পাশেই জাটদের বসবাস। তাদের সাথে তোমাদের সম্পর্ক কেমন?
জাট জনগোষ্ঠির ওপর নির্ভর করা যায় না’ বলল এক বৌদ্ধ সর্দার। হিন্দু শাসকরা জাটদেরকে সামাজিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত রেখেছে। ফলে এরা সভ্য সমাজের প্রতি বিরক্ত ও ক্ষুদ্ধ। লুটতরাজ ও হিংস্রতাই এদের জীবন ও পেশা। আমরা তাদেরকে নিয়মিত কিছু চাঁদা দেই এবং তাদেরকে আমাদের উৎপন্ন ফসলের একটা অংশ দেই। এজন্য ওরা আমাদেরকে কোন রকম হয়রানী করে না। এদেরকে সামাজিক মর্যাদা শিষ্টাচারে উদ্বুদ্ধ করতে পারলে হয়তো এই হিংস্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরিবর্তন আসত।
আমরা শান্তিপ্রিয় মানুষ। মানবিকতা ও মানব প্রেমের বৈশিষ্ট দিয়ে আমরা ওদেরকে নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে আসছি। ফলে ওরা আমাদের সাহায্য সহযোগিতাকে সম্মান দেয়, বলল অপর বৌদ্ধ সর্দার।
তারিখে মাসুমীতে বর্ণিত হয়েছে, সেই দিন বিন কাসিমকে খবর দেয়া হলো, দুই জাট সর্দার তার সাথে সাক্ষাত করতে এসেছে। তিনি তখনি তাদের নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন। দুই জাট সর্দার যখন বিন কাসিমের কাছে এলো, তাদের দেখে কোন সর্দার ভাবার অবকাশ ছিল না। উভয়েই কাধ থেকে পা পর্যন্ত মোটা কম্বল দিয়ে শরীর ঢেকে রেখেছিল। তোমরা কোন্ উদ্দেশ্যে আমার কাছে এসেছো? বিন কাসিম দুই জাট সর্দারকে জিজ্ঞেস করলেন।
আমরা আপনার আনুগত্য প্রকাশ করতে এসেছি, বলল দুই জাট সর্দার। তবে আমাদের আরো গোত্র আছে, তাদের সর্দারের সাথে কথা বলে আমরা আপনাকে চূড়ান্ত আনুগত্যের কথা জানাবো। তবে এর মধ্যে আপনি আমাদের সাথে কোন ধরনের ব্যবহার করেন তাও আমরা যাচাই করব। ‘আমিও দেখবো, তোমরা আমাদের সাথে কেমন ব্যবহার করো’ বললেন বিন কাসিম। আমি এটা দেখবো না, তোমরা আমার আনুগত্য করেছ কি
করনি কিন্তু তোমরা যদি তোমাদের অভ্যাস পরিবর্তন না করো, তাহলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ।
আমরা শুনেছি, বিজিত এলাকার লোকদের আপনি দাসদাসীতে পরিণত করেন না। তাদেরকে সবধরনের সুযোগ-সুবিধা ও স্বাধীনতা দেন এবং তাদের জীবন সম্পদ হেফাযত করেন। আপনি যদি পূর্ববতী রাজাদের মতোই আচরণ করেন, তাহলে বাধ্য হয়ে আমাদেরকে আগের পেশাতেই ফিরে যেতে হবে।
তোমরা কি এই বাহিনীকে মোকাবেলা করতে পারবে, যে বাহিনী এতোগুলো দুর্গ ও অঞ্চল জয় করেছে এবং রাজা দাহিরের মতো তুখোড় যোদ্ধাকেও হত্যা করেছে? হে আরব সর্দার! আমাদের আক্রমণ ভিন্ন প্রকৃতির। আপনি আমাদের কখনো মুখোমুখি পাবেন না। কিন্তু বিরুদ্ধে চলে গেলে আমাদের আক্রমণ থেকে কখনোই আপনার লোকজন রেহাই পাবে না। কিন্তু আমরা আপনার কাছে শত্রুতা নয় শান্তির জন্য এসেছি। আপনি আমাদের শান্তি প্রস্তাব কবুল করে নিন। বিন কাসিম তাদের শাস্তি প্রস্তাব মেনে নিলেন। কিন্তু উভয় জাট সর্দারের চেহারা ছবি ও কথাবার্তা শুনে তিনি অনুমান করলেন এরা বেশি দিন তাদের বিশ্বস্ততা বজায় রাখবে না।
‘এদের ব্যাপারে সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে পরামর্শ করে তিনি আপাদত শান্তি প্রস্তাব মেনে নেয়ার সিদ্ধান্ত দিলেন। কিন্তু জাট জনগোষ্ঠী সম্পর্কে তিনি হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাছে বিশদ বর্ণনা দিয়ে পয়গাম পাঠালেন। পয়গামে জাটদের ব্যাপারে কি করণীয় এ ব্যাপারে পরামর্শও চাইলেন।
বিন কাসিম কোন ধরনের ঝুকি নিতে চাচ্ছিলেন না। কারণ জাটরা হিংস্র প্রতিশোধপরায়ণ ও দুর্ধর্ষ। এরা মুসলমানদের প্রতি বিরূপ হলে দাহির পুত্রের সাথে মিশে যেতে পারে। অথবা দাহিরের পুত্র এদেরকে ইরানীদের মতো বিশেষ মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বিন কাসিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও ব্যবহার করতে পারে।
