নিযুক্ত ছিল তাকেও সেই পদে বহাল রাখা হলো। প্রশাসনিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনের পর বিন কাসিম একদিন সকল কর্মকর্তার উদ্দেশ্যে বললেন, আমরা বিজয়ী শক্তি হওয়ার পরও, তোমাদের সবাইকে নিজ নিজ পদে বহাল রেখেছি। আমরা কি ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে দাস দাসীর পর্যায়ে নামিয়ে দিতে পারতাম না? কিন্তু আমরা তোমাদেরকে দাসদাসীতে পরিণত করিনি। আমি তোমাদেরকে বলছি, শহরের সাধারণ নাগরিকদেরকে দাসদাসী মনে করবে না। তাদের কাছ থেকে আমি যা নির্ধারণ করে দিয়েছি এই পরিমাণ কর আদায় করবে। কেউ যদি কর দিতে অসুবিধা বোধ করে অথবা অক্ষম হয় তাহলে এজন্য তার ওপর অত্যাচার করবে না। এমনটি হলে আমার কাছে খবর পৌছাবে, আমি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সাথে কথা বলে তার করের বোঝা লাঘব করার ব্যবস্থা করব…।
তোমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো, শাসক ও প্রজাদের মধ্যে সুসম্পর্ক ও আস্থা বজায় রাখার চেষ্টা করা। নাগরিকরা যাতে মনে করে প্রশাসক তাদের আপন, তাদের শুভাকাঙ্ক্ষি। কেউ যদি কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায় তাহলে তাৎক্ষণিক আমাকে অবহিত করবে যাতে বিশৃঙ্খলার মূলোৎপাটন করা সম্ভব হয়। কোন মুসলমান যদি কোন অমুসলিমের ইবাদতখানা বা ধর্মালয়ের অমর্যাদা করে তাহলে সে বিজয়ী বাহিনীর লোক বলে তাকে ছেড়ে দেয়া যাবে না, তার এমন শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে যেমনটি যেকোন অপরাধী ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
হিন্দুদেরকে দেয়া বিন কাসিমের সুযোগ সুবিধা ছিল তাদের ধারণাতীত। তাদের বিশ্বাস ছিল, অর্থনৈতিকভাবে মুসলিম বিজয়ীরা তাদের পিঠের চামড়াও তুলে নিতে চেষ্টা করবে আর সামাজিক ভাবে অভিজাত হিন্দুদের অবস্থান হবে নীচু জাতের হিন্দুদের মতো। বিন কাসিমের এই উদার বদান্যতার ফল হলো, মন্দিরের প্রধান পুরোহিত সকল ব্রাহ্মণ ও শহরের অভিজাত হিন্দুদের ডেকে বলল, সবার কাছে আমার এই পয়গাম পৌছে দেবে। হে সিন্ধুবাসী! তোমাদের বিশ্বাস করতে হবে রাজা দাহিরের মৃত্যু হয়ে গেছে এবং তার বংশের রাজত্বও খতম হয়ে গেছে। সিন্ধুর শাসন ক্ষমতা আরব মুসলমানদের হাতে। মুসলমানদের সম্পর্কে তোমাদের জেনে রাখা উচিত, তাদের দৃষ্টিতে উঁচু নীচু, ধনী গরীব গ্রাম্য শহুরে সকল নাগরিক সমান। এটা তাদের ধর্মের শিক্ষা। তাদের এই নীতি সবার কাছে পৌছে দেয়া আমি কর্তব্য মনে করছি। বিজয়ী আরব
মুসলমানরা আমাদের সাথে আরো সুযোগ সুবিধা দেয়ার ওয়াদা করেছে কিন্তু শর্ত হলো তাদের অনুগত থাকতে হবে, কোন অবস্থাতেই বিদ্রোহমূলক কিছু করা যাবে না। তোমাদের কেউ যদি বিশ্বস্ততা বিনষ্ট করে গাদ্দারী করে, তাহলে সকল হিন্দুকেই এজন্য খেসারত দিতে হবে। এর চেয়ে আর সুবিধা কি হতে পারে একটি বিজাতীয় বিজয়ী শক্তি আমাদের ব্রাহ্মণজাতিকে সমাজে তাদের যে মর্যাদা ছিল তাই বহাল রেখেছে এবং মুসলিম শাসক তো শাসন ক্ষমতার সব উঁচু পদও ব্রাহ্মণদের হাতেই সোপর্দ করেছে। বিজয়ী বাহিনী আমাদের ওপর যে কর ধার্য করেছে, তা প্রত্যেক প্রজা খুব সহজেই উসূল করতে পারবে। তারপরও যদি কেউ এই কর দিতে অস্বীকার করে তবে তার উচিত হবে সিন্ধু এলাকা ছেড়ে হিন্দুস্তানের অন্য কোন অঞ্চলে চলে যাওয়া।
এদিকে রাজা দাহিরের বিশ্বস্ত উজির সিয়াকরও নানা পরীক্ষায় বিন কাসিমের প্রতি বিশ্বস্ততা বজায় রাখলো এবং তাকে বাস্তব ভিত্তিক নানা পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করে যাচ্ছিল।
বিন কাসিম বিদা বিন হুমাইদ আল বাহরীকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করলেন এবং নোভা বিন দিরাসকে রাওয়া দুর্গের শাসক নিযুক্ত করে বললেন, ওখান থেকে যতসম্ভব তুমি নৌকা সরবরাহ করো এবং নদীপথে যদি কোন অপরিচিত নৌকা সামরিক সরঞ্জাম পরিবহণ করে তবে তা আটকে ফেলবে। এভাবে বিজিত প্রতিটি দুর্গের শাসক হিসাবে তিনি মুসলমানদের নিয়োগ করলেন। সালেহ নামের এক মুক্তিপ্রাপ্ত গোলাম বেশ কয়েকটি যুদ্ধে এমন বীরত্ব ও কুশলী যুদ্ধ পারদর্শিতা প্রদর্শন করেছিল যে, দেহে অস্বাভাবিক শক্তি ও বুদ্ধি উভয়টির সমন্বয় না থাকলে কারো পক্ষে এতোটা কুশলী নৈপূণ্য প্রদর্শন সম্ভব নয়। বিন কাসিম তার পারদর্শিতা ও নৈপূণ্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে মাকরানের একটি অঞ্চলের শাসক নিযুক্ত করেন। পরবর্তীতে তারা মাকরানেই বিয়েশাদী করে বসতি স্থাপন করে। যাদের অধস্তন বংশধর এখনো মাকরানে বর্তমান রয়েছে। বিন কাসিমের পরবর্তী লক্ষ্যস্থল ছিল উরুঢ় যা রাজা দাহিরের রাজধানী। কিন্তু উরুঢ়ের আগে ছোট ছোট কয়েকট দুর্গ ছিল। তবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল একটি উপজাতি। স্থানীয় ভাষায় এরা ছিল জাট। খুবই দুর্ধর্ষ ও
স্বাধীনচেতা এই জাট জনগোষ্ঠী। স্থানীয় লোকজন বিন কাসিমকে জানালো, জাটা ছিল রাজা দাহিরের জন্যও চিন্তার কারণ। কেননা তারা কোন রীতিনীতির পরওয়া করে না, কারো শাসন মানতে তারা নারাজ।
বিন কাসিমের কাছে যখন জাট জনগোষ্ঠীর খবর এলো, তখন তিনি সিয়াকরকে ডেকে জাটদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সিয়াকর বলল, এই জনগোষ্ঠী খুবই দুর্ধর্ষ ও জংলী। এরা অসভ্য এবং অপরাধ প্রবণ। সভ্যসমাজে এদের যাওয়ার কোন অনুমতি নেই এবং তাদের কারো অশ্বারোহণের অনুমতি ছিল না। এদের পরিধেয় বস্ত্র মোটা। বিন কাসিম জাট জনগোষ্ঠী সম্পর্কে দীর্ঘ বর্ণনা শুনলেন কিন্তু মন্তব্য করলেন না। এদিকে বিন কাসিম যখন উরুঢ়ের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ওদিকে উরুঢ় তখন বিন কাসিমকে প্রতিরোধ করার প্রাণান্তকর প্রস্তুতি চলছিল। উরুঢ়ের বিষ্ময়কর অবস্থা এই ছিল যে, সেখানকার অধিকাংশ অধিবাসী বিশ্বাস করতো, রাজা দাহির তখনো জীবিত রয়েছে। মন্দিরের পূজা-অর্চনাতেও রাজা দাহিরকে এভাবে স্মরণ করা হতো যে, রাজা দাহির জীবিত।
