ভিতরের লোকজনকে তুমি ডাকো স্থানীয় লোকটিকে নির্দেশ দিলেন গোয়েন্দা প্রধান। তিনি আরো বললেন, ভিতরের অধিবাসীদের বলল, তাদের ওপর কোন ধরনের শাস্তি হবে না এবং তাদের কোন ধরনের হয়রানী করা হবে না।
এখানে কেউ থাকে না। যদি ভিতরে কেউ থেকেও থাকে, তবে সে এখানকার বাসিন্দা নয়, কেউ হয়তো এখানে এসে লুকিয়ে থেকে থাকবে। আপনারা দরজা ভেঙে দেখুন, বলল লোকটি। শাবান ছাকাফী ইশারা করতেই তার সাথীরা একটি দরজার খিল ভেঙে ফেলল এবং সাথে সাথে ক্ষীপ্ত গতিতে তরবারী উঁচিয়ে সবাই ভিতরে প্রবেশ করল।
ঘরের ভিতরের পরিবেশ ছিল ভীতিকর। ঘরের ভিতরে আগুনে পোড়া মানুষের দুর্গন্ধে দমবন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। সবাই দুর্গন্ধ থেকে বাঁচতে নাকে কাপড় দিলো। সবার চোখ জ্বলতে শুরু করল। একটি খেরকী দরজা দিয়ে অন্য কক্ষে গেলে এটির ফাঁক দিয়ে কিছুটা আলো দেখা গেল। আলো অনুসরণ করে আরেক কক্ষে গেলে দেখা গেল একটু মেঝে ও আঙিনা। আঙিনায় জ্বলন্ত কাঠের কয়লা দেখা গেল। কয়লার মধ্যে তিনটি মরদেহ দেখা গেল, যেগুেলো পুড়ে ভস্ম হয়ে গেছে। এগুলো এতোটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে, হাত, পা, নাক, মুখ চেহারার অবয়ব বোঝা যায় না।
হঠাৎ অপর পাশের কোথাও কোন মানুষ দৌড়ানোর শব্দ পাওয়া গেল। শব্দ অনুসরণ করে অগ্রসর হয়ে দরজার কাছে পলায়নকারী দুজনকে পাকড়াও করা হলো। গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশী করে তার কাছ থেকে গলে যাওয়া কিছু স্বর্ণের টুকরো পাওয়া গেল। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানালো, তারা উভয়েই ছিল মায়ারাণীর একান্ত কর্মচারি। তারা জানতো মায়ারাণী এক পুরোহিত ও এক সেবিকাসহ স্বর্গবাসী হচ্ছে। তারা এও জানতো মায়ারাণীর শরীরে স্বর্ণের অলংকার রয়েছে, এজন্য তারা লোক চক্ষুর আড়ালে মায়ার চিতা থেকে স্বর্ণ তুলে নেয়ার জন্য এখানে এসেছিল।
কোন হিন্দু জ্বলন্ত চিতায় আত্মহুতি দিয়েছে, এ নিয়ে বিন কাসিম ও শা’বান ছাকাফীর কোন মাথা ব্যাথা ছিল না। তারা শুধু নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন, সত্যিকার অর্থেই মায়রাণী আত্মহুতি দিয়েছে কি-না। শাবান ছাকাফী মন্দিরে গিয়ে সেই দুই পুরোহিতকে আলাদা করলেন। এদের একজন ছিল যথেষ্ট বয়স্ক। তাদের জিজ্ঞাসা করলে বয়স্ক পুরোহিত বলল, ‘হ্যাঁ’ মায়ারাণী এক পুরোহিত ও তার একান্ত সেবিকাকে নিয়ে আত্মহুতি দিয়েছে।
আমরা জানি, তোমাদের ধর্মে সতীদাহ প্রথা রয়েছে কিন্তু রাণী প্রিয়সী নিজেকে সতীদাহ করল না কেন? পুরোহিতকে জিজ্ঞেস করলেন ছাকাফী।
মায়ারাণীও আত্মহুতি দেয়ার মতো নারী ছিল না, বলল বৃদ্ধ পুরোহিত। আমি শুনেছি, সে এই ঘরে লুকিয়ে থাকার জন্য তার একান্ত চাকরাণীকে নিয়ে এসেছিল। কারণ, আপনারা দুর্গে প্রবেশ করার পর তার আর পালানোর মতো সুযোগ ছিল না। সে এই ভেবে এই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে বেশ বদল করে উড়ে চলে যাবে এবং সেখানে গিয়ে সেনাবাহিনীকে পুনর্গঠিত করে আপনাদের
বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ করবে। সে বলেছিল, নিজে সে রণাঙ্গনে যাবে এবং নিজ ভাই হত্যার প্রতিশোধ নেবে। কিন্তু যে ঘরে সে আশ্রয় নিয়েছিল এই ঘরটি মানুষের বসবাসের উপযোগী ছিল না। কেন, ঘরটি কি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ছিল? জানতে চাইলেন শাবান ছাকাফী। না, ব্যাপারটি এমন নয়। এই বাড়িটি প্রেতাত্মার আখড়া। সেখানে যে কেউ দু’একদিন কাটালে প্রেতাত্মাদের প্রভাবে আত্যহত্যার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। আমি নিজেই প্রেতাত্মার নারী কন্ঠের আওয়াজ শুনেছি। এই হলো তোমাদের ধর্মের একটা খারাপ দিক। তোমরা নানা আজগুবী অলৌকিকতায় বিশ্বাস করো, যার কোন বাস্তবতা নেই, বললেন গোয়েন্দা প্রধান। ব্রাহ্মণাবাদকে বিন কাসিম তাঁর শক্তিশালী একটি সেনা শিবিরে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করছিলেন। এ পর্যন্ত যে কয়টি দুর্গ তিনি জয় করেছেন সবগুলোতেই প্রশাসনিক ব্যবস্থা সুন্দর করেছিলেন। নাগরিকদের ওপর এমন সহজ করারোপ করেছিলেন, যা তারা অনায়াসে পরিশোধ করতে পারে। কিন্তু ব্রাহ্মণবাদের প্রশাসনের ব্যাপারে তিনি পূর্বের চেয়েও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করলেন। তিনি ব্রাহ্মণবাদের অধিবাসীদের নিশ্চিন্ত করার জন্য যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তাদেরকে মুসলমানদের প্রাপ্য সব সুযোগ সুবিধা দিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, যে সব হিন্দু ও বৌদ্ধ স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ না করবে তাদের ওপর ইসলাম গ্রহণের জন্য কোন চাপ সৃষ্টি করা হবে না।
কিন্তু তাদেরকে অবশ্যই জিযিয়া পরিশোধ করতে হবে। তিনি বিত্তশালী, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত এই তিন ভাগে নাগরিকদের ভাগ করে পয়তাল্লিশ দিরহাম, চব্বিশ দিরহাম ও বারো দিরহাম জিযিয়া আরোপ করলেন। দুর্গের পুরোহিতদেরকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হলো। যাদের কাছে পূর্ব থেকেই সরকারি জায়গা জমি ছিল তা তাদের কব্জায়ই বহাল রাখা হলো। হিন্দু বাহিনী যেসব ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জবরদস্তিমূলক মোটা অংকের টাকা উসূল করছিল কিংবা যুদ্ধের কারণে যাদের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তাদের জন্য প্রায় এক লাখ বিশ হাজার দিরহামের নগদ সাহায্য দেয়া হলো।
শহরের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বহু উচ্চ পদে ব্রাহ্মণদের পদায়ন করা, হলো। হিন্দু প্রশাসনে যারা উচ্চপদে আসীন ছিল তাদেরকে সপদে বহাল রাখা হলো। এবং দুর্গের প্রধান ফটক রক্ষায় সেনাবাহিনীর যে অফিসার
