তোমরা কি আমার কাছে তোমাদের উঁচু মর্যাদার স্বীকৃতি আদায় করতে এসেছ? জিজ্ঞেস করলেন বিন কাসিম।
আমরা জানতে এসেছি, এদেশের সবচেয়ে মর্যাদাবান ব্রাহ্মণ শ্রেণির প্রতি আপনার মনোভাব কি?
তোমরা যদি লড়াইকারীদের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে থাকো এবং ভবিষ্যতে কোন ধরনের আক্রমণ বা যুদ্ধ চেষ্টা না করো, তাহলে আমরা তোমাদেরকে শান্তিতে বসবাস করার অধিকার দেবো। কিন্তু অন্য লোকদের থেকে আমরা তোমাদের ভিন্ন মর্যাদায় বিশ্বাস করি না। আমাদের ধর্মে ধনী-গরীব, ছোটবড় এমন কোন শ্রেণি বৈষম্য নেই। আমি আরব বাহিনীর প্রধান সেনাপতি এবং বিজিত অঞ্চলের শাসক পদে আমাকে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। এই দায়িত্ব অনেকটা তোমাদের প্রধান পুরোহিতের মতো। কিন্তু আমাদের আল্লাহর কাছে আমার মর্যাদা ও আমার সওয়াব এতটুকুই যতোটুকু আমার বাহিনীর এক সাধারণ সৈনিকের। আমার নেতৃত্বে ও ইমামতিতে যারা নামায পড়ে তাদের কারো থেকে আমার বিশেষ কোন মর্যাদা নেই। এখানকার একজন সাধারণ নাগরিক যতটুকু অধিকার পাবে তার সবটুকু তোমরাও পাবে, এর বেশি নয়। তোমরা যদি সাধারণ মানুষ থেকে বেশি মর্যাদা ও অধিকার ছিনিয়ে নিতে চাও, তাহলে তা হবে আমাদের আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ যা আমাদের বিধানে শাস্তিযোগ্য।
ঠিক আছে, আমরা আপনার এই নির্দেশ মেনে চলবো, বলল ব্রাহ্মণদের মুখপাত্র। কিন্তু হে আরব সেনাপতি! আমাদের কি স্বাধীনভাবে আমাদের মন্দিরে ধর্মকর্ম করার অধিকার থাকবে না আপনারা তরবারীর জোরে আমাদেরকে ইসলাম ধর্মগ্রহণে বাধ্য করবেন?
আমি তোমাদেরকে একথা অবশ্যই বলব, তোমরা আমাদের ধর্মের বিধিবিধান ও কর্মকাণ্ডকে গভীরভাবে অবলোকন কর, তোমরা পর্যবেক্ষণ করো, আমরা আমাদের ধর্মের শিক্ষা কতটুকু বাস্তবায়ন করি এবং ধর্মপালনে কোন ধরনের শ্রেণিভেদ করি কি-না?
আমাদের রাজা নিহত হয়েছে’ বললেন ব্রাহ্মণদের মুখপাত্র। আমরা তার প্রতি বিশ্বস্ত ছিলাম। আমরা তার সম্মানে মাথা ন্যাড়া করেছি এবং শোকের পোশাক পরেছি। এটা আমাদের দেশের রীতি। কেউ যদি মারা যায় তার বড় ছেলে শোক প্রকাশে মাথা ন্যাড়া করে এবং সেলাই বিহীন কাপড় পরিধান করে। এখন আপনি আমাদের রাজা। আমরা আগের রাজার মতোই আপনার প্রতি বিশ্বস্ত থাকব।
ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন, ব্রাহ্মণ দলের সাথে কথোপকথনের এক পর্যায়ে রাজা দাহিরের অধস্তন বংশধরদের তথ্য জানার জন্য বিন কাসিম ব্রাহ্মণদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা যদি আমার আনুগত্য স্বীকার করেই
থাকো, আর আমার প্রতি বিশ্বস্ততার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে থাকো, তাহলে বলল, রাজা দাহিরের যেসব আপনজন এখনো বেঁচে আছে, তারা কে কোথায় অবস্থান করছে এবং কে কে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।’
এই দুর্গে শুধু রাণী প্রিয়সী অবস্থান করছিল, যাকে আপনি গ্রেফতার করেছেন, বলল ব্রাহ্মণ মুখপাত্র। রাণী প্রিয়সী একদল রক্ত পিপাসু সৈন্য তৈরি করেছিল। তাদেরও আপনি গ্রেফতার করে ফেলেছেন। সে মুক্ত থাকলে আপনার জন্যে বিপদ হয়ে উঠতো। তাকে আপনি নাগিনী মনে করতে পারেন। তবে নাগিনীর বিষ দাঁত আপনি ভেঙে ফেলেছেন। তবে আরেকটি কথা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, রাণী প্রিয়সী খুবই সুন্দরী ও ধূর্ত। তার মুখের ভাষাও যাদুমাখা। আপনি যুবক মানুষ। আপনাকে তার মোহনীয় রূপ সৌন্দর্য আর যাদুকরী কথা যেনো পেয়ে না বসে, বলল অপর এক ব্রাহ্মণ। ব্রাহ্মণদের কথায় বিন কাসিমের মধ্যে কোন ভাবান্তর ঘটলো না, তিনি পূর্ববৎ ভাবলেশহীন রইলেন। কোন প্রতিক্রিয়াই ব্রাহ্মণের কথায় প্রকাশ করলেন না।
আরেকজন নারী আপনার জন্যে ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারতো, সে ছিল মায়ারাণী। আপনি হয়তো শুনে থাকবেন, মহারাজা দাহিরের সাথে তার ছিল দ্বৈত সম্পর্ক। সে রাজার সহোদরা ছিল, আবার তার বিয়ে করা স্ত্রীও ছিল। এজন্য ভগবানের গজব নেমে আসে। কারণ আপন সহোদরাকে বিয়ে করা মহাপাপ।
মায়ারাণী এখন কোথায়? ব্রাহ্মণকে জিজ্ঞেস করলেন বিন কাসিম।
নিশ্চিত বলতে পারব না, তবে শুনেছি, সে সতীদাহ স্বরূপ আত্মহুতি দিয়েছে।
কোথায়?
এই শহরেই। এই শহরের একপ্রান্তে আপনি একটি পতিত বাড়ি দেখতে পাবেন। শুনেছি, সেখানে সে কাঠখড়ি জড়ো করে চিতা জ্বালিয়ে আত্মহুতি দিয়েছে।
বিন কাসিম ব্রাহ্মণদের সাথে আর কথা না বাড়িয়ে তাদের বিদায় করে দিলেন।
ব্রাহ্মণরা চলে গেলে বিন কাসিম শা’বান ছাকাফীকে ডেকে মায়ারাণী সম্পর্কে দেয়া ব্রাহ্মণদের তথ্য যাচাই করার নির্দেশ দিলেন। বললেন, ব্রাহ্মণদের কথা কতটুকু বাস্তব তা যাচাই করে দেখা দরকার। ব্রাহ্মণরা খুশি মনেই বিন কাসিমের কাছ থেকে বিদায় নিল। কারণ প্রথমত: তারা তাদের জীবনের নিরাপত্তা পেল, দ্বিতীয়ত: তারা স্বাধীনভাবে নিজেদের মন্দিরে ধর্মকর্ম করার সুযোগ পেল।
এদিকে কিছু দূর যেতেই শা’বান ছাকাফী ব্রাহ্মণদের পথরোধ করে তাদের কাছে জানতে চাইলেন, তারা কার কাছে শুনেছে, মায়ারাণী আত্মহুতি দিয়েছে?
ব্রাহ্মণরা তাকে সব ঘটনা বলল এবং একটি পতিত বাড়ির দিকে ইঙ্গিত করে বলল, সেখানে মায়ারাণী আত্মহুতি দিয়েছে। গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী তার একান্ত দু’জন যোদ্ধাকে নিয়ে পতিত অনাবাদী এলাকার কাছাকাছি বাসিন্দাদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের দু’জন জানালো, একরাতে তিনজন পুরোহিতকে তারা এই পতিত বাড়ির দিকে যেতে দেখেছে। তাদের একজন আরো জানালো, সেই রাতে অনেক দেরীতে তিন পুরোহিতের মধ্যে দু’জনকে সে পতিত বাড়ি থেকে ফিরে আসতে দেখেছে। শাবান ছাকাফী তাদের একজনকে সাথে নিলেন। কিছুক্ষণ অগ্রসর হলে ঘন গাছগাছালির ভিতরে একটি বাড়ি দেখতে পেলেন। শাবান ছাকাফী দেখতে পেলেন, বাড়িতে একটি মাত্র পুরনো ইটের ঘর। ঘরটির মাত্র দুটি দরজা। দরজা ধাক্কা দিলে বোঝা গেল ভিতর থেকে খিল আটকানো। কয়েকবার ধাক্কা দেয়া হলো, কিন্তু ভিতর থেকে কারো সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না।
