ফেলল। রাণীর বাহিনীর পক্ষে কোন ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ হলো না।
রাণীর বিশেষ বাহিনী পাকড়াও হওয়ার সাথে সাথে রাজ প্রাসাদে খবর হয়ে গেল বিন কাসিমের সৈন্যরা দুর্গে ঢুকে পড়েছে। ঠিক সেই সময়ে মন্ত্রী সিয়াকর রাণী প্রিয়সীকে ঘুম থেকে জাগালো। তখন বেলা অনেক ওপরে উঠে গেছে কিন্তু রাণী তখনো বেঘোরে ঘুমাচ্ছিল।
রাণী, আরব সৈন্যরা দুর্গে ঢুকে পড়েছে।
মুসলিম সৈন্যরা ক্লান্ত হয়ে শহরের বাইরে বসে আছে আর তোমরা এখনো দুর্গের ভিতরে আরামে দিন কাটাচ্ছ উজির। তোমার মতো বুদ্ধিমান ব্যক্তির কাছ থেকে এমনটাই কি প্রত্যাশিত?
রাণী, তোমার হুকুম আমার ওপর চলতে পারে কিন্তু মুসলিম বাহিনীর ওপর তোমার কোন হুকুম চলবে না, এখন পরিস্থিতি বুঝতে চেষ্টা করো। ওঠো এখান থেকে পালানোর চেষ্টা করো। দৃঢ়কণ্ঠে বলল উজির সিয়াকর। আরে আমার বাঘের বাচ্চারা সব কোথায়? তুমি এসব কি বলছ? ওদের বলল, আমি ওদেরকে যে জন্য অপেক্ষা করতে বলেছিলাম, সেই সময় এখন এসে গেছে।
সেই সময় আর হবে না রাণী। তোমার বাঘের বাচ্চারা সব শিয়ালের মতো মুসলিম বাহিনীর হাতে বিনা প্রতিরোধে বন্দি হয়েছে। রাণী, তুমি কি পালাতে চাও, না স্বেচ্ছায় মুসলমানদের হাতে বন্দি হতে চাও? ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল উজির সিয়াকর।
আমাকে এখান থেকে বের করার ব্যবস্থা করো। আমি এক্ষুণি পুরুষের পোশাক পরে নিচ্ছি।
রাণী প্রিয়সী তার সেবিকাদের বলল, কে আছে, তাড়াতাড়ি মহারাজের পোশাক ও তরবারী নিয়ে এসো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রাণী প্রিয়সী রাজা দাহিরের পোষাক পরে হাতে তরবারী নিয়ে একটি ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ল।
কিন্তু রাণী প্রিয়সী রাজপ্রাসাদের আঙিনা অতিক্রম করার আগেই মুসলিম বাহিনীর পনের ষোলজন অশ্বারোহী প্রাসাদের প্রধান ফটকে প্রবেশ করল।
তাদের সাথে শাবান ছাকাফীও ছিলেন। তিনি রাণীকে দেখেই তার গতিরোধ করলেন।
“আমি তোমাদের আনুগত্য কবুল করে নিয়েছি,” শা’বান ছাকাফীর উদ্দেশ্যে কণ্ঠে পুরুষালী ভাব এনে বলল, পুরুষরূপী রাণী প্রিয়সী।
আরে নারী! বাঘ যদিও বা সিংহের রূপ ধরতে পারে, তুমিও হয়তো পুরুষের বেশ ধারণ করতে পারো। কিন্তু আমি দৃঢ়তার সাথেই বলতে পারি, তোমার মতো এতো সুন্দর পুরুষ সিন্ধুর মাটি জন্ম দিতে পারেনি। মাথা থেকে পাগড়ী খুলে ফেলল। বলল, তোমার আসল পরিচয় কি? বললেন গোয়েন্দা প্রধান। সেই সাথে তিনি সহযোদ্ধাদের নির্দেশ দিলেন, প্রাসাদের সবাইকে বন্দি করে ফেলো।
কিছুসংখ্যক সৈন্য মহলের দিকে অগ্রসর হলে শা’বান ছাকাফী তার ঘোড়াকে রাণীর ঘোড়ার পাশে নিয়ে হঠাৎ রাণীর মাথার পাগড়ী একটানে খুলে ফেললেন। পাগড়ী খোলার সাথে সাথেই রাণীর দীর্ঘ কেশরাজী তার সারা কাধ ও পিঠে ছড়িয়ে পড়ল। তোমাকে কি এখনও কেউ বলেনি, আমরা নারীর ওপর কখনো আঘাত করি না? দেখেতো মনে হচ্ছে তুমি কোন সাধারণ নারী নও। রাজা দাহিরের সাথে তোমার কি সম্পর্ক ছিল?
“আমি মহারাজ দাহিরের স্ত্রী। আমি রাণী প্রিয়সী।”
কই তোমার সেই বিশেষ বাহিনী কোথায়? আমাদের পরাস্ত করতে তুমি যে বাহিনী গঠন করেছিলে? জানতে পারলাম, তোমাদের প্রতিরোধ করার সুযোগই ওদের হয়নি। ওরা যদি মোকাবেলার সুযোগ পেতো, তাহলে আর আমাকে পুরুষের পোশাক পরতে হতো না।
কিছুক্ষণ পর রাণী প্রিয়সীকে বন্দী করে বিন কাসিমের সামনে হাজির করা হলো।
“ওকে মহলেই নিয়ে যাও। তাকে কাপড় বদলাতে দাও এবং কোন ধরনের পেরেশানী না করে সসম্মানে থাকার সুযোগ দাও।” নিজ সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন বিন কাসিম।
রাণীকে প্রাসাদে পৌছে দেয়া হলো। প্রাসাদে রাজা দাহিরের প্রিয়পাত্র উজির সিয়াকরকে গ্রেফতার করে বিন কাসিমের সামনে হাজির করা হলো।
বিন কাসিম সিয়াকরকে দেখেই চিনে ফেললেন, কারণ এর আগে সিয়াকর তার সান্নিধ্যে কিছুদিন কাটিয়ে ছিল। সম্মানীত সেনাপতি! আমি আপনার কাছে জানতে চাই, আমাদের শহরের সাধারণ মানুষের সাথে আপনার আচরণ কেমন হবে? বিন কাসিমের উদ্দেশ্যে বলল সিয়াকর।
যে ব্যবহার তোমার সাথে করা হচ্ছে, সবার সাথে একই আচরণ করা হবে। কাউকেই যুদ্ধবন্দি কিংবা দাসে পরিণত করা হবে না। তোমার পূর্ব মর্যাদা বহাল রাখা হবে। এজন্যই তোমাদের রাণীকে তার প্রাসাদে পৌছে দেয়া হয়েছে।
তিন চারদিন পর বিন কাসিমকে খবর দেয়া হলো, প্রায় হাজারখানিক লোক যাদের সবার দাড়ি গোঁফ সম্পূর্ণ ছাটা বিন কাসিমের সাথে সাক্ষাত করতে এসেছে। বিন কাসিম তার কক্ষ থেকে বেরিয়ে দেখলেন, সুশৃঙ্খল ভাবে দাড়ানো এবং একই পোশাক পরিহিত একদল লোক তার জন্য অপেক্ষা করছে।
বিন কাসিম তার স্থানীয় দুভাষীকে বললেন, এদেরকে দেখে মনে হচ্ছে, এরা সাধারণ কোন নাগরিক নয়। এরা কোথেকে এসেছে? কি চায়? কি তাদের পরিচয়? জিজ্ঞেস করো? দুভাষী জিজ্ঞেস করলে তারা জানালো, আমরা কোন সেনাবাহিনীর সদস্য নই। আমরা সবাই ব্রাহ্মণ। আমাদের বহু লোক দুর্গ পতনের দুঃখে আত্মহত্যা করেছে। আমরা আপনাদেরকে তাদের মরদেহ দেখাতে পারি।
তাহলে তোমরা কেন আত্মহত্যা করনি? তোমাদের ধর্ম কি আত্মহত্যা সমর্থন করে? জানতে চাইলেন বিন কাসিম।
আমাদের ধর্ম আত্মহত্যা সমর্থন করে না, বলল ব্রাহ্মণদের মুখপাত্র। যারা আত্মহত্যা করেছে, তারা মৃত রাজার প্রতি বিশ্বস্ততা প্রকাশ করতে আত্মহুতি দিয়েছে। কিন্তু আমরা আমাদের প্রভুর প্রতি বিশ্বস্ত যিনি আমাদেরকে সমাজে উঁচু মর্যাদা দিয়েছেন। সেই সাথে আমরা তাদের প্রতিও বিশ্বস্ত থাকি, যে আমাদের সামাজিক উঁচু মর্যাদা বহাল রাখে।
