স্পর্শ করতে পারবেন যে দিন বিন কাসিমের ছিন্ন মস্তক আমার সামনে পড়ে থাকবে। আর ওর সৈন্যরা বানভাসী খড়খুটোর মতো সিন্ধুর জলে ভেসে সাগরে চলে যাবে। রাজা দাহির কোন কাপুরুষ শাসক ছিল না। ছিল না অনভিজ্ঞ ও মেধাহীন যে তাকে উস্কানী দিয়ে উত্তেজিত করতে হবে। রাণীর ক্ষোভ সে যথার্থই বুঝতে পারল। সিংহাসন ত্যাগ করে উঠে দাঁড়িয়ে গেল রাজা।
হ্যাঁ এমনিটিই হবে রাণী! এমনটিই হবে। তুমি ঠিকই বলেছ, আমার জীবন সিন্ধুর মাটির জন্য। তুমি ঠিকই বলেছ, কথা দিচ্ছি তোমার সামনে হয় বিন কাসিমের ছিন্ন মস্তক দেখবে নয়তো আমার মস্তক ছিন্ন হতে দেখবে। অতঃপর ঘটনা তাই ঘটল। রাণী প্রিয়সী আবেগ উচ্ছাস ও প্রেম ভালোবাসায় সিক্ত করে রাজাকে রণাঙ্গনে বিদায় জানালো। আবেগ উত্তেজনায় রাণী প্রিয়সী রাজা দাহিরের একান্ত সাদা হাতির শুঁড়ে চুমু দিলো। কিন্তু প্রিয়সী জানতো না, তার এই আবেগ ও উত্তেজনা সুফল বয়ে আনবে না।
প্রিয়সী জানতো না, সে এই শেষ বারের মতো রাজা দাহিরকে জীবিত দেখছে। বিন কাসিমের ছিন্ন মস্তক দেখার সৌভাগ্য প্রিয়সীর হয়নি, তাকে রাজা দাহিরের মস্তক ছিন্ন হওয়ার দুঃসংবাদই শুনতে হয়েছে। রাণী প্রিয়সী রাজা দাহিরকে রণাঙ্গনে বিদায় করে ব্রাহ্মণাবাদ দুর্গে চলে আসে। এখানে থাকাবস্থায়ই রণাঙ্গন থেকে দলে দলে সৈন্য পালিয়ে আসার খবর পায়। সেই সাথে রাজার নিহত হওয়ার খবর আসে। একদিন পালিয়ে আসা সৈন্যদের সামনে দাঁড়িয়ে রাণী প্রিয়সী বলল, ব্ৰহ্মণবাদের সকল সৈন্যকে আমার সামনে হাজির করা হোক। সৈন্যদেরকে যখন রাণী প্রিয়সীর সামনে এনে দাঁড় করানো হলো, তখন উচ্চ আওয়াজে রাণী বলল, “তোমরা কি জীবিত থাকার যোগ্যতা রাখো, তোমরা কি এখনো তোমাদের স্ত্রীদের মুখোমুখি হওয়ার সাহস রাখো? তোমাদের চেয়ে অপবিত্র সৃষ্টি এই ধরিত্রীর বুকে আর কোথাও কি আছে? যারা নিজ মাতৃভূমিকে গুটিকতক বিদেশী সৈন্যের দখলে দিয়ে দিয়েছে।
তোমাদের মহারাজা আমার সাথে ওয়াদা করেছিল, হয় সে আমার সামনে বিন কাসিমের ছিন্ন মস্তক ফেলে দেবে নয়তো নিজের মাথা ছিন্ন করাবে। খবর পেয়েছি, সে বিন কাসিমের মাথা ছিন্ন করতে পারেনি কিন্তু নিজের দেহ থেকে মাথা ছিন্ন করিয়েছে। তোমাদের লজ্জা থাকা উচিত ছিল, তোমাদের রাজার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে আর তোমাদের দেহে এখনো মাথা বহাল রয়েছে। ঠিক আছে, তোমাদের মতো কাপুরুষদের আর দরকার নেই। সবাই মাথা ন্যাড়া করে ঘরের কোণে বসে যাও; এখন থেকে এদেশের নারীরাই যুদ্ধ করবে। আজ থেকে আমি নারীদের নিয়েই সেনাবাহিনী গঠন করব। আমরা যদি মুসলমানদের কাছে হেরেও যাই তবুও মনে এতোটুকু শান্তি থাকবে আমরা একটা বাহাদুর জাতির বাদী হয়েছি।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, রাণী প্রিয়সীর সেই বক্তৃতা এতোটাই উত্তেজনা পূর্ণ ছিল যে, সৈন্যরা আবেগে উত্তেজিত হয়ে শ্লোগান দিচ্ছিল, আর তাদের ঘোড়াগুলো পর্যন্ত পা দিয়ে মাটি আঁচড়াচ্ছিল। সেই দিন রাণী প্রিয়সী উপস্থিত সেনাবাহিনী থেকে কিছু সংখ্যক কমান্ডারঠাকুর ও সৈন্য বাছাই করে নিজের মতো করে একটি সেনাদল গঠন করল এবং নিজে পুরুষের পোশাক পরে তাজি ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে নবগঠিত সেনাদলের ট্রেনিং দিতে শুরু করল। এসব সৈন্য প্রশিক্ষিতই ছিল। তাদের সামরিক ট্রেনিংয়ের খুব একটা প্রয়োজন ছিল না কিন্তু রাণী প্রিয়সী বিভিন্নভাবে এমন মানসিকতা এদের মধ্যে সৃষ্টি করল যে, এই সেনাদল মানুষ খেকো বাহিনীতে পরিণত হলো। এই বাহিনীকে অন্যান্য সেনাদের চেয়ে অনেক বেশি বেতন ভাতা সুযোগ-সুবিধা দেয়া হলো। এই বাহিনীর সৈন্যদেরকে নগদ পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দেয়া হলো। তাছাড়া এই ঘোষণাও দেয়া হলো, লড়াইয়ে বিজয়ী হলে প্রত্যেক সৈনিককে একজন করে তরুণী উপহার দেয়া হবে।
বিন কাসিম ব্রাহ্মণাবাদ দুর্গ অবরোধ করার পর যে হিন্দু সৈন্যরা দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে মুসলিম সৈন্যদের ওপর আক্রমণ করত এবং দুর্গে ফিরে যেত এদের অধিকাংশই ছিল রাণী প্রিয়সীর বিশেষ সৈন্য। অবরোধের শেষ দু’মাসে রাণী প্রিয়সী তার বিশেষ বাহিনীকে তার নিজের প্রাসাদের অনতি দূরে বসিয়ে দিয়েছিল। রাণী ভেবেছিল একসময় ক্লান্ত ও হতাশ হয়ে মুসলিম বাহিনী অবরোধ উঠিয়ে যখন চলে যেতে চাইবে তখন পিছন দিক থেকে আক্রমণ করবে তার বিশেষ বাহিনী।
বিন কাসিমের বাহিনী যখন দুর্গে প্রবেশ করল, তখন রাণীর বিশেষ বাহিনী তাদের ব্যারাকেই অবস্থান করছিল, তারা মুসলিম সৈন্যদের দুর্গে প্রবেশের কোন সংবাদই পেল না। কিন্তু বিন কাসিমের গোয়েন্দা প্রধান শাবান ছাকাফী দুর্গে প্রবেশ করার সাথে সাথেই তার একান্ত গোয়েন্দারা রাণীর বিশেষ বাহিনীর খবর দিলো। ব্রাহ্মণাবাদ দুর্গে শাবান ছাকাফীর গোয়েন্দারা বহু পূর্ব থেকেই অবস্থান করছিল। তারা রাণীর বিশেষ বাহিনীর অবস্থান ও গঠনের পুরোপুরি খবর রাখতো। শা’বান ছাকাফী তার গোয়েন্দাদের রিপোর্ট সম্পর্কে সাথে সাথেই বিন কাসিমকে অবহিত করলেন। তিনি বিন কাসিমের অনুমতি নিয়ে একদল সৈন্য নিয়ে রাণী প্রিয়সীর সৈন্যদের অজান্তেই ওদেরকে ঘেরাও করে ফেললেন। ওরা কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই শা’বান ছাকাফীর সৈন্যরা ওদের পাকড়াও করে
