ব্রাহ্মণাবাদ দুর্গ জয় ছিল বিন কাসিমের বিজয়গাথার আরেকটি মাইল ফলক। মুসলিম সৈন্যরা ব্রাহ্মণাবাদ দুর্গের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে সর্বত্র ইসলামী পাতাকা উড়িয়ে দিল। ব্রাহ্মণাবাদ ছিল একটি দুর্গবন্দি শহর। শহরের সাধারণ হিন্দুরা মনে করছিল বিজয়ী সেনারা তাদের ঘড়-বাড়িতে লুটতরাজ করবে। তাদের কুমারী কিশোরী মেয়েদের ধরে নিয়ে যাবে। এই ভয়ে সবাই তরুণী-যুবতী মেয়েদের লুকানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। বহুসংখ্যক তরুণী বিজয়ী সেনাদের আক্রমণ থেকে নিজেদের বাঁচানোর জন্যে পুরুষের পোশাক পরিধান করছিল। বহুসংখ্যক হিন্দু মন্দিরে গিয়ে লুকিয়ে ছিল।
মন্দিরে আশ্রয় প্রার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রধান পুরোহিত ঘোষণা করল, হে ব্রাহ্মাণাবাদবাসী। তোমাদের কোন ভয় নেই। আমরা বিজয়ী সৈন্যদের কাছ থেকে তোমাদের জানমালের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি নিয়েছি। দুর্গের প্রধান ফটক বিজয়ী বাহিনীর জন্য আমরাই খুলে দিয়েছি। তোমাদের কোন ভয় নেই। সবাই নিজ নিজ বাড়িঘরে ফিরে যাও। ঘরের দরজা খুলে ঘুমাতে পারো। কোন মুসলিম সৈন্য তোমাদের গায়ে হাত দেবে তো দূরে থাক তোমাদের দহলিজেও পা দেবে না।
এদিকে বিন কাসিম তার সৈন্যদের জন্য হুকুম জারী করলেন, আক্রমণ উদ্যত কোন লোক ছাড়া দুর্গের কোন সাধারণ নারী, শিশু আবালবৃদ্ধ বনিতার গায়ে কেউ হাত ওঠাবে না। কারো বাড়ি-ঘরে উঁকি দিয়েও দেখবে না। বিন কাসিমের এই নির্দেশ শহর জুড়ে আরবী ও সিন্ধি উভয় ভাষায় ঘোষণা করা হচ্ছিল। কারণ মুকুর স্থানীয় সৈন্যরা ছাড়াও বহুসংখ্যক স্থানীয়
নওমুসলিমও বিন কাসিমের বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। যাদের অধিকাংশই আরবী ভাষা জানতো না।
বিন কাসিম আরো ঘোষণা করালেন, কোন সৈন্যকে পালানোর সুযোগ দেবে না। কারণ এরা এখান থেকে পালিয়ে গিয়ে অন্য জায়গার সৈন্যদের সাথে মিশে শক্তি সঞ্চয় করবে। বিন কাসিম! আমি কিন্তু পালিয়ে যাওয়া সৈন্যদের মধ্যে বরং-এর বিপরীতটাই দেখতে পাচ্ছি। মুচকী হেসে বললেন গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী। তিনি বললেন, হিন্দুস্তানের এসব পালিয়ে যাওয়া সৈন্যরা অন্য জায়গায় গিয়ে শক্তিবৃদ্ধির বদলে, বরং আরো ভীতিকেই প্রকট করে।…. তাই যারা পালাতে চায় ওদের পালিয়ে যেতে দেয়াই উচিত। আর যাদেরকে পালাতে দেয়া উচিত না, ওরা আমার জালের ভিতরেই আছে। ওরা আমার দৃষ্টির আড়াল হতে পারবে না।
দুর্গের রাজ মহলে হৈচৈ পড়ে গেল। ব্রাহ্মণাবাদ দুর্গে একটি রাজপ্রসাদ ছিল। এখানে রাজা দাহির এসে মাঝে মধ্যে অবকাশ যাপন করত। ছেলে এবং রাণীরাও আসতো মাঝে মাঝে। রাজমহলে যখন খবর পৌছল দুর্গে মুসলিম সৈন্যপ্রবেশ করেছে, তখন প্রাসাদের অনেকেই ব্যাপারটি বিশ্বাস করে নি। প্রাসাদে অবস্থানকারী রাজা দাহিরের এক মন্ত্রী বলল, “ছয় চাঁদ চলে গেছে। মুসলিম বাহিনী দুর্গপ্রাচীরের ধারে কাছে ঘেষতে পারেনি। আর এখন। শুনছি ওরা দুর্গে ঢুকে পড়েছে। কখনোই না, এমনটা হতেই পারেনা।” একথা বলছিল বিন কাসিমের আনুগত্য স্বীকারকারী মন্ত্রী সিয়াকর। সে কিছুদিন বিন কাসিমের সাথে থেকে তাঁর অনুমতি নিয়ে ব্রাহ্মাণাবাদ এসে অবস্থান নিয়েছিল। সে বলেছিল ব্রাহ্মণাবাদ দুর্গ জয়ের পর সে প্রকাশ্যে ইসলামে দীক্ষা নেবে।
আরেক সংবাদ দাতা হস্তদন্ত হয়ে এসে বলল, মহামহিম উজির। মুসলিম বাহিনী দুর্গের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। মহারাণীকে এখান থেকে সরিয়ে ফেলা দরকার।
রাণী ঘুমিয়ে আছে। যে পর্যন্ত আমি নিজ চোখে মুসলিম সৈন্য না দেখব ততোক্ষণ পর্যন্ত রাণীকে জাগানোর দরকার নেই, বলল মন্ত্রী সিয়াকর।
কথিত রাণী ছিল রাজা দাহিরের প্রিয়সী। তাকে প্রিয়সী বলেই ডাকা হতো। এই রাণী ছিল রাজা দাহিরের খুবই প্রিয়। বয়সে তরুণী, অত্যধিক সুন্দরী, বুদ্ধিমতী ও আত্মাভিমানী। রাজার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যথেষ্ট দখলদারিত্ব ছিল এই রাণীর। সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও যুদ্ধনীতি সম্পর্কেও এই রাণীর দখল ছিল। মুসলিম বাহিনী যখন একের পর এক দুর্গ জয় করে রাজধানীর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন রাণী প্রিয়সী এক দিন রাজার মুখোমুখি হলো।
অসময়ে রাণীকে তার খাস কামরায় দেখে রাজা জিজ্ঞেস করল, কি ব্যাপার প্রিয়সী? এই সময়ে তুমি রাজদরবারে? তাছাড়া তোমার চেহারা কেমন যেন মলীন দেখাচ্ছে?
শুধু আমার চেহারায় নয়, মহারাজ! গোটা সিন্ধুর আকাশেই আজ গাঢ় মেঘের ঘনঘটা। এই মেঘ আরব থেকে এসেছে এবং মাকরানকে ডুবিয়ে দিয়ে এখন মহারাজের আত্মসম্মানকেই হুমকি দিচ্ছে। আরে আমি তো মরিনি রাণী! আমিই ওদের এতটুকু বাড়তে দিয়েছি। এসো, আমার কাছে এসো রাণী। রাজা রাণীর দিকে তার দু’হাত বাড়িয়ে দিলো।
কিন্তু রাণী পিছনে সরে গিয়ে বলল, মহারাজ! আজ থেকে আমি আপনার রাণী নই, আর আমার কোন রাজাও নেই। আপনার হৃদয়ে যদি আমার প্রতি সামান্য ভালোবাসাও থেকে থাকে তাহলে তা সিন্ধুর ভূমিকে দিয়ে দিন। আর সিন্ধুর চেয়ে যদি আমার প্রতি আপনার বেশি ভালোবাসা থেকে থাকে তাহলে বিন কাসিমের ছিন্নমস্তকটা আমার সামনে নিয়ে আসুন। যদি তা-না পারেন, তাহলে আপনার মাথাটাই বিচ্ছিন্ন করে ফেলুন। আমি এখন মুহাম্মদ বিন কাসিম না হয় আপনার ছিন্ন মস্তক দেখতে চাই! মুসলমানরা এখন রাওয়া থেকে এক হাত সামনে আসাটাকেও আমি সহ্য করতে পারছি না। মুসলিমরা রাওয়ার জল-মাটি নোংরা করে ফেলেছে। আপনি সেই দিন আমার শরীর
