জয়সেনা নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় মুকু ও মাদানীসহ অন্যান্য উর্ধতন সেনাকমান্ডারগণ পরামর্শ করলেন, এলাকাটি শত্রুমুক্ত করার জন্য দাহলিলা ও রাওয়া দুর্গ পর্যন্ত গোটা এলাকা চক্কর দেয়া দরকার। সারারাতের ভ্রমণের ক্লান্তি সৈন্য ও ঘোড়ার বিশ্রামের জন্য এক জায়গায় তাঁবু ফেলা হলো। বিশ্রামের পর আবার চলতে শুরু করল কাফেলা।
চলন্ত কাফেলা হঠাৎ দুই উষ্ট্রারোহীকে দেখতে পেল। মুসলিম কাফেলাকে দেখে আরোহী দু’জন পথ বদল করে ফেলল। ওদের প্রতি সন্দেহ হওয়ায় পাঁচজন অশ্বারোহীকে নির্দেশ দেয়া হলো ওদের পাকড়াও করতে। পাঁচ অশ্বারোহীকে আসতে দেখে ওরা চলার গতি বাড়িয়ে দিয়ে সন্দেহ আরো বাড়িয়ে দিল। কিন্তু পাঁচ অশ্বারোহী উর্ধশ্বাসে ঘোড়া হাঁকিয়ে ঘেরাও করে দুই উষ্ট্ৰারোহীকে পাকড়াও করল। ধরাপড়ে ওরা প্রথমে সাধারণ পথিক হিসাবে নিজেদের প্রমাণ করতে চেষ্টা করল। কিন্তু মুসলিম যোদ্ধারা যখন বর্শার ফলা ওদের বুকের ওপর রাখল তখন স্বীকার করল, তারা জয়সেনার সৈন্য। সেই সাথে তারা জানাল, জয়সেনা তাদের মাধ্যমে এই এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জয়সেনার গোয়েন্দাদের খবর দিয়ে দিয়েছে, তারা যদি জয়সেনার সাথে থাকতে চায়, তাহলে যেন চারু দুর্গে পৌছে, নয়তো নিজেদের বাড়িতে ফিরে যায়। বিন কাসিমের বিশেষ এই ইউনিট দুই তিন দিন গোটা এলাকা চক্কর দিয়ে ব্রাহ্মণাবাদ ফিরে এলো। এর দু’দিনপর সরবরাহ কাফেলাও ব্রাহ্মণাবাদ পৌছে গেল।
দেখতে দেখতে ব্রাহ্মাণাবাদ দুর্গের অবরোধ ছয় মাস পেরিয়ে গেল। কিন্তু দু’মাস পর দুর্গ থেকে হিন্দু সৈন্যরা বেরিয়ে মুসলমানদের ওপর আঘাত করা ছেড়ে দিয়েছিল। এই সুযোগে বিন কাসিম তার সৈন্যদেরকে তবু থেকে বের করে দুর্গ অবরোধ মজবুত করলেন এবং দুর্গপ্রাচীর ভাঙা বা ডিঙানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। দুর্গের অধিবাসীদের নিরাপদ রাখতে তিনি পাথর ও অগ্নিতীর নিক্ষেপ থেকে বিরত রইলেন।
এক পর্যায়ে স্থানীয়ভাষায় অনেকগুলো পয়গাম লিখে রাতের বেলায় দুর্গপ্রাচীরের কাছাকাছি গিয়ে তীরে বেঁধে এগুলোকে এমনভাবে নিক্ষেপের নির্দেশ দিলেন, যাতে এগুলো গিয়ে লোকালয়ে পড়ে।
সব পয়গামে একই বক্তব্য ছিল। পয়গামে লেখা হলো, দুর্গের বেসামরিক অধিবাসীরা যেন দুর্গফটক খুলে দিতে সৈন্যদের বাধ্য করে। নয়তো আমরা অচিরেই দুর্গে পাথর ও আগুন বর্ষণ করতে শুরু করব। তখন আর কাউকেই ক্ষমা করা হবে না। পক্ষান্তরে দুর্গবাসী যদি সৈন্যদের ফটক খুলে দিতে বাধ্য করে তাহলে বেসামরিক সব নাগরিককে ক্ষমা করে দেয়া হবে এবং তাদের জানমাল ইজ্জত আব্রু সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে। তীরে বাঁধা নিক্ষিপ্ত পয়গামে কাজ হলো। দু’তিন দিন পর রাতের বেলায় দুর্গ থেকে একটি ছোট্ট দরজা দিয়ে দু’জন লোক বেরিয়ে মুসলিম শিবিরের দিকে এগিয়ে এলো। তাদের হাতে ছিল সাদা পতাকা। এরা মুসলিম শিবিরের দিকে অগ্রসর হলে কয়েকজন সৈন্য এদের ধরে বিন কাসিমের কাছে নিয়ে এলো। তারা জানাল, তীরে বাঁধা পয়গামের খবর দুর্গের অধিবাসীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই পয়গাম পাওয়ার পর দুর্গের নেতৃস্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী ও মন্দিরের প্রধান পুরোহিত সৈন্যদের সাথে আলোচনা করল, তোমরা দুর্গের কর্তৃত্ব ত্যাগ করে আত্মসমর্পণ কর। সৈন্যরা বলল, তা সম্ভব নয়। অন্য কোন ব্যবস্থা করা যেতে পারে যাতে আমরা দুর্গ ত্যাগ করে চলে যেতে পারি। এর পর সিদ্ধান্ত হলো, তাদেরকে দুর্গ ত্যাগের সুযোগ করে দিলে তারা দুর্গের কর্তৃত্ব ছেড়ে দেবে। অত:পর দুর্গফটকের প্রহরীদের এই কথা বলা হলো, তোমাদের একটি সেনাদল ছোট্ট একটি দরজা খুলে মুসলিম সৈন্যদের আক্রমণ করবে, ওরা পাল্টা আক্রমণ করলে তোমরা প্রধান ফটক দিয়ে দুর্গে প্রবেশ করবে কিন্তু দুর্গফটক খোলা থাকবে। খোলা দরজা দিয়ে মুসলিম। সৈন্যরা প্রবেশ করবে আর অপর দরজা দিয়ে তোমরা পালিয়ে যাবে। এ দুই সংবাদবাহক বিন কাসিমকে জানাল, দুর্গের অধিবাসীরা অনেক দিন থেকে দিনে একবেলা আহার করছে। সেই সাথে দুর্গের ভিতরে সুপেয় পানির তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে। এমতাবস্থায় দুর্গের অধিবাসীরা সৈন্যদের ওপর ভীষণ চাপ সৃষ্টি করেছে আত্মসমর্পণ করতে। কিন্তু জীবন ও মান রক্ষায় সৈন্যরা আত্মসমর্পনে রাজী হচ্ছিল না। তাছাড়া তাদের অর্ধেক সৈন্যই মারা গেছে। এমতাবস্থায় তাদেরকে পালানোর সুযোগ দিলে তারা দুর্গ ত্যাগ করে চলে যাবে। তিনদিন পর ছোট্ট একটি ফটক দিয়ে কিছুসংখ্যক হিন্দু সৈন্য বেরিয়ে মুসলিম যোদ্ধাদের ওপর আঘাত করল। বিন কাসিম আগে থেকেই প্রস্তুত
ছিলেন, তিনি একটি ইউনিটকে ওদের ধাওয়া করার নির্দেশ দিলেন। মুসলমানরা ধাওয়া করতেই ওরা প্রধান ফটক দিয়ে দুর্গে ঢুকে পড়ল। কিন্তু দুর্গফটক খোলা রইলো, বিন কাসিমের সেই ইউনিট খোলা ফটক দিয়ে দুর্গে প্রবেশ করল। সেই সাথে মুহূর্তের মধ্যেই গোটা মুসলিম বাহিনী দুর্গের ভিতরে চলে এলো। আর হিন্দু সৈন্যরা অপর দিকের ফটক খুলে পালিয়ে গেল। বিন কাসিম ওদের পিছু ধাওয়া করতে নিষেধ করেলেন।
১১. মূর্তি পূজা
যেসব মূর্তি নিজেদের অস্তিত্বই রক্ষা করতে পারেনা তোমরা এগুলোর পূজা কেন করো?
