একই পদ্ধতিতে টানা কয়েকদিন এ ধরণের আক্রমণ প্রতি আক্রমণ চলল। কিন্তু কিছু দিন পর হিন্দুদের আক্রমণের মাত্রা হ্রাস পেতে শুরু করল। দুতিন দিন চলে গেল তারা দুর্গ থেকে বের হয়ে কোন আক্রমণ করল না। তাতে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল হিন্দুদের জনবলে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
৯৪ হিজরী সনের যিলহজ্জ মাসে মুসলমানদের একটি সরবরাহ কাফেলা আসার কথা ছিল। কিন্তু তারিখ পেরিয়ে গেলেও সরবরাহ কাফেলার হদিস পাওয়া গেল না। হঠাৎ এক রাতে অবরোধকারী সৈন্য দলের ওপর গুপ্ত আক্রমণ হলো। অনুসন্ধান করে জানা গেল, গুপ্ত আক্রমণকারীরা দুর্গ থেকে আসেনি ওরা বাইরের। গুপ্ত আক্রমণে মুসলিম সৈন্যরা মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো। পরের রাতে আবারো আক্রমণ হলো।
দীর্ঘ যুদ্ধে এমনিতেই মুসলিম সৈন্যদের জনবলের ওপর চাপ পড়েছিল। এরপর এই গুপ্ত আক্রমণ সেই চাপ আরো বাড়িয়ে দিলো। অপর দিকে সরবরাহ আসার নিশ্চিত সংবাদ আসার পরও কোন ধরনের সরবরাহই পৌছেনি। এমতাবস্থায় দাহলিলা ও বাহরাওয়াতে সরবরাহ না পৌছার কারণ অনুসন্ধানে লোক পাঠানো হলো। কিন্তু সংবাদবাহকরাও তিন দিনের মধ্যে ফিরে এলো না। অথচ উভয় দুর্গের দূরত্ব ছিল কম। ইচ্ছা করলে একদিনেই উভয় দুর্গের খবর নিয়ে ফিরে আসা যায়। কোন খবর না পেয়ে চতুর্থ দিন সকালবেলায় আরো দু’জনকে পাঠানো হলো। দিন শেষে বিকেলবেলায় এদের একজন আহত রক্তমাখা অবস্থায় ফিরে এলো। সে জানালো, দাহলিলা দুর্গের অনতি দূরে তাদের ওপর অতর্কিতে আক্রমণ চালায় চার অশ্বারোহী। তাতে তার সাথী মারা যায়। সে কোন মতে প্রাণ বাঁচিয়ে আসতে সক্ষম হয়। এই আক্রমণ থেকে বিন কাসিম বুঝে নিলেন, সরবরাহ কোন না কোনভাবে পথিমধ্যে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
বিন কাসিম সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন, যারা অবরোধে নিযুক্ত, তারা যেন রাতের বেলায় সজাগ থাকে এবং রাতের আক্রমণকারীদের অন্তত দু’চার জনকে জীবন্ত পাকড়াও করার চেষ্টা করে।
সেই দিনগুলোতে প্রতিরাতেই গুপ্ত আক্রমণ হতো। কয়েক দিন পর একরাতে আক্রমণকারীদের দুজনকে পাকড়াও করা হলো। পাকড়াও করে শত্রু সেনা দুজনকে বিন কাসিমের কাছে উপস্থিত করা হলো। বিন কাসিম বহু চেষ্টা করেও ধৃতদের মুখ খুলতে পারেন নি। অবশেষে তিনি নির্দেশ দিলেন, ওদেরকে ঘোড়ার পিছনে বেধে ঘোড়া দৌড়িয়ে দাও। এমতাবস্থায় মৃত্যু ভয়ে শত্রুসেনারা কথা বলতে শুরু করল। অবশেষে ওরা রহস্য উন্মোচন করে দিলো। শত্রু সেনারা বলল, জয়সেনা বিমল রাজার কাছ থেকে সৈন্য নিয়ে ব্রাহ্মণাবাদ আসতে চাচ্ছিল। যখন সে খবর পেল, ব্রাহ্মণাবাদ অবরুদ্ধ, তখন সে দূরের একটি জায়গায় তাবু ফেলে গুপ্তহামলা চালাতে শুরু করে।
বিন কাসিম সেনাপতিদের ডেকে বললেন, সব সেনাপতি যেন নিজ নিজ ইউনিট থেকে কিছুসংখ্যক অভিজ্ঞ যোদ্ধাকে বাছাই করে দেয়। যারা সম্মিলিতভাবে একটি দলভুক্ত হয়ে জয়সেনাকে তাড়া করবে। সেনাপতিগণ, নির্দেশ পেয়ে কিছুসংখ্যক যোদ্ধাকে বাছাই করলেন। এদেরকে একটি ইউনিটে রূপান্তরিত করে মুকু, নাবাতা বিন হানযালা, আতিয়া প্রমূখকেও অন্তর্ভুক্ত করলেন। এই সেনাদলের কমান্ডার নিযুক্ত করলেন মুকু ও খুরায়েম বিন আমের মাদানীকে। মুকু তখনও পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেনি। কিন্তু বিন কাসিমের প্রতি সে বিশ্বস্ততার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। তাছাড়া স্থানীয় লোক হওয়ায় এই অঞ্চলের সব পথঘাট ছিল তার নখদর্পনে।
এদিকে শত্রুপক্ষের রাতের গুপ্তহামলা অব্যাহত থাকল এবং একরাতে মুসলিম যোদ্ধাদের হাতে আরো তিন হামলাকারী গ্রেফতার হলো। এরা জিজ্ঞাসাবাদের মুখে জানিয়ে দিলো, জয়সেনা কোন এলাকায় আস্তানা গেড়েছে। জয়সেনার অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়ায় সেই রাতেই মুকু ও মাদানীর নেতৃত্বে বিশেষ বাহিনী রওয়ানা হয়ে গেল। তাদের সাথে দেয়া হলো গ্রেফতার হওয়া তিন শত্রুসেনাকে, ওদের দেয়া তথ্য ভুল প্রমাণিত হলে ওদের হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হলো। এই বিশেষ বাহিনী ব্রাহ্মণাবাদ থেকে কয়েক মাইল অগ্রসর হলে হঠাৎ দ’জন অশ্বারোহী উধ্বশ্বাসে ঘোড়া হাঁকাল, এরা রাস্তায় কোন আড়ালে উৎপেতে ছিল। মুকু সাথে সাথে তার চার যোদ্ধাকে ওদের ধাওয়া করতে নির্দেশ দিল। কিন্তু তারা শত্রুসেনাদের নাগাল পেল না। ধাওয়াকারীদের বলে দেয়া হয়েছিল তারা যেন আয়ত্তের বাইরে না যায়। শক্ত সেনারা নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় ধাওয়াকারীরা ফিরে এলো। এই ঘটনা থেকে পরিষ্কার হয়ে গেল এরা নিশ্চয়ই জয়সেনার চর।
জয়সেনাকে ধরার জন্য মুকু ও মাদানীর কাফেলার গতি আরো বাড়িয়ে দেয়া হলো। কিন্তু জয়সেনার অবস্থান ছিল যথেষ্ট দূরে। সকাল পর্যন্ত ইন্দিত স্থানে পৌছে যাওয়ার আশা ছিল। কিন্তু রাতের অন্ধকারে মুসলিম সৈন্যদেরপক্ষে খুব বেশি দ্রুত ঘোড়া দৌড়ানো সম্ভব ছিল না। সারারাত চলার পর সকালবেলায় তারা এমন জায়গায় পৌছাল, যেখানে চতুর্দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কোন সেনাবাহিনীর অবস্থানের চিহ্ন। স্থানীয় লোকজনকে জিজ্ঞেস করে মুকু জানতে পারল, রাজা দাহিরের পুত্র জয়সেনার নেতৃত্বে এখানে কিছুদিন একটি সেনা ইউনিট অবস্থান করেছিল। কিন্তু
গতরাতের শেষপ্রহরে তারা এখান থেকে চলে গেছে। ওদের যাওয়ার সময় হিসাব করে দেখা গেল। পিছু ধাওয়া করা অর্থহীন।
