রাতের বেলায় বিন কাসিম সকল সেনাপতি ও কমান্ডারদের নিয়ে বৈঠকে বসলেন। তিনি হিন্দু সৈন্যদের আকষ্মিক তীব্র আক্রমণ ও ফিরে যাওয়ার কৌশল নিয়ে সবার সাথে মতবিনিময় করলেন। শত্রুদের শক্তি ও সামর্থ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হলো। অনেকেই অনেক ধরনের মতামত ব্যক্ত করলেন।
সবার মতামত শোনার পর বিন কাসিম বললেন, হিন্দু সৈন্যরা চেষ্টা করছে আমরা যাতে দুর্গ অবরোধ করতে না পারি। ওরা ময়দানে আমাদের লড়াইয়ে লিপ্ত রাখতে চায়। আমরা তাদের এই আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করবো। তবে দুর্গকে পশ্চাদভূমি হিসাবে ব্যবহার করার মতো সুবিধা তাদের আছে, আমরা ইচ্ছা করলেও তাদের তাড়া করতে পারব না। তিনি সেনাপতিদের উদ্দেশ্যে বললেন, আপনারা সবাই আমার চেয়ে বয়স্ক ও অভিজ্ঞ। আমি আপনাদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলতে চাই, আমাদের যোদ্ধারা ক্লান্ত। তাদের আবেগ যদিও ক্লান্ত নয় তবে রক্ত গোশতের শরীর অব্যাহত পরিশ্রমে একসময় চুরচুর হয়ে যায়। দ্বিতীয় কথাটি হলো, দুর্গ অবশ্যই আমাদের অবরুদ্ধ রাখতে হবে। আমরা যদি অবরোধ না করি, তাহলে শত্রুদের সরবরাহ পথ উন্মুক্ত রাখা হবে। আপনারা জয়সেনার কথা
শুনেছেন, সে দুর্গে নেই। জয়সেনা আশপাশের রাজা মহারাজাদের সাহায্যের জন্যে বেরিয়েছে। ওর পথ রুদ্ধ করতে হবে। কারণ সে যখন এদিকে ফিরে আসবে তখন সে একা আসবে না, বহু সৈন্য সাথে নিয়ে আসবে। আপনারা দেখেছেন হিন্দু সৈন্যরা খুবই উজ্জীবিত আবেগাপ্লুত।
“বিন কাসিম! বেশি আবেগ ঠাণ্ডা হতে সময় লাগে না,” বললেন বিন কাসিমের পিতৃবয়সী এক সেনাপতি। আপনি যদি ওদের এই আক্রমণে খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে থাকেন, তাহলে এই দুশ্চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিন। আপনাকে আল্লাহ খুব উঁচুমাপের বিবেক বুদ্ধি দিয়েছেন। আপনার চিন্তাশক্তি আমাদের চেয়ে অনেক ভালো। আপনি আল্লাহর দেয়া বিবেক বুদ্ধিকে কাজে লাগান। আমরা আপনার সাথে আছি। আমরা আল্লাহকে ভুলিনি। সবসময় নামায তেলাওয়াত দোয়া দরূদে আল্লাহর মদদ ও সাহায্য প্রার্থনা করছি। আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের মদদ করবেন।
রাতের বেলায় মিনজানিক ও অগ্নিতীর ব্যবহার করাই সঠিক কাজ হবে, বললেন অপর এক সেনাপতি।
বিন কাসিম তার মতামতের জবাবে বললেন, না, এক্ষেত্রে মিনজানিক ও অগ্নিতীর ব্যবহার করা ঠিক হবে না। ব্রাহ্মণাবাদ দুর্গ একটি জনবহুল দুর্গ। মিনজানিক ও অগ্নিতীর ব্যবহার করলে শিশু ও বেসামরিক লোকেরা হতাহত হবে। আমি সাধারণ মানুষের মধ্যে এই আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে চাই না। তাছাড়া আরো ক’দিন দেখি না, শত্রুরা তাদের রণকৌশলে কতোটা দৃঢ় থাকে।
পরদিন ব্রাহ্মণবাদের সৈন্যরা আগের দিনের মতো দুর্গ থেকে বেরিয়ে মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করল। আগের রাতে বিন কাসিম সেনাপতি ও কমান্ডাদের বৈঠকে যে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, সেনাপতিরা তাদের নিজ নিজ ইউনিটকে দিনের শুরুতেই তাঁবু থেকে বের করে জায়গা মতো দাঁড় করলেন। অশ্বারোহী সৈন্যদের দু’প্রান্তে রেখে পদাতিক সৈন্যদের মাঝখানে দাঁড় করানো হলো।
গত দিনের আক্রমণে হিন্দুরা দুর্গপ্রাচীরের কাছাকাছি থেকে লড়াইয়ের চেষ্টা করতে দেখা গেছে। বিন কাসিম পরিকল্পনা মতো পদাতিক সৈন্যদেরকে অগ্রসর করে দিলেন। পদাতিক সেনাকমান্ডারদেরকে কি করতে হবে তা তাদের জানা ছিল। সংঘর্ষ যখন তীব্র আকার ধারণ করলো, তখন তারা
এমনভাবে পিছু হটতে শুরু করে যেনো তারা শত্রুদের আক্রমণে বিপর্যস্ত। মুসলিম সৈন্যদের পিছু হটতে দেখে হিন্দু সৈন্যরা বিপুল উদ্যমে সামনে অগ্রসর হলো।
এমতাবস্থায় হিন্দু সৈন্যদের খেয়াল ছিল না, তারা দুর্গপ্রাচীর থেকে বহুদূরে চলে এসেছে। ঠিক এমন সময় বিন কাসিম দু’প্রান্তের অশ্বারোহীদের ইশারা করলেন। অশ্বারোহীরা ইশারা পাওয়া মাত্র উর্ধশ্বাসে ঘোড়া দৌড়াল। চোখের পলকে অশ্বারোহীরা হিন্দু সৈন্যদের পিছন ও দু’পাশ থেকে আক্রমণ করল। এই আক্রমণে হিন্দু সৈন্যরা বিন কাসিমের পাতা ফাঁদে আটকে গেল। মুসলিম অশ্বারোহীদের তরবারীর আঘাতে ধরাশায়ী হতে লাগল হিন্দু সৈন্যরা। তাদের পিছু হটার পথ আগেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু হিন্দু কমান্ডারও ছিল বুদ্ধিমান। সে দুর্গ থেকে একটি অশ্বারোহী ইউনিটকে তড়িৎ মুসলিম বাহিনীর পিছন ভাগে আঘাত করার জন্য পাঠাল। এরা এসে আঘাত করায় মুসলমানদের ঘেরাও ভেঙে গেল এবং হিন্দু সৈন্যরা বেরিয়ে গেল। কিন্তু তাদেরকে ফেলে যেতে হয়েছে অসংখ্য সহযোদ্ধার মরদেহ। ততোক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বেলা ডুবার আগেই মুসলিম যোদ্ধারা তাদের মৃত ও আহত সহযোদ্ধাদের রণাঙ্গন থেকে তুলে আনল।
পরবর্তী রাতে বিন কাসিম তাঁবু থেকে কিছু সৈন্যকে বের করে দুর্গের চারপাশে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে ছোট ছোট দলে বিভক্ত করে একপ্রকার অবরোধ আরোপ করলেন, যাতে দুর্গবাসীরা বাইরের কোন সরবরাহ না পায়। পরদিনও হিন্দু সৈন্যরা যখন দুর্গ থেকে বের হলো, তখন দু’পাশ থেকে তাদের ঘেরাও করে আক্রমণ করা হলো। হিন্দু সৈন্যরা দ্রুত দুর্গে ফিরে যেতে চাচ্ছিল কিন্তু হুড়োহুড়ি করে প্রবেশ করতে গিয়ে ওরা দুর্গফটকে হজবরল পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটালো। ভীড়ে চাপা পড়ে বহু পদাতিক সৈন্য হতাহত হলো।
