বিন কাসিম দাহলিলা থেকে রওয়ানা হয়ে একটি খরস্রোতা নদী পার হয়ে অপর পাড়ে তাঁবু ফেললেন। বিন কাসিম ওখানে অবস্থান নিয়ে জয়সেনাকে একটি লিখিত পয়গাম পাঠালেন। পয়গামে তিনি লিখলেন, তুমি তোমার বাবার পরিণতি স্বচোখে দেখেছো। সিন্ধের কর্তৃত্ব তোমাদের হাত ছাড়া হয়ে গেছে। এখন আর কতোদিন তুমি এভাবে পালিয়ে বেড়াবে, আর কোথায় পালিয়ে যাৰে? যে ব্রাহ্মণাবাদে তুমি আশ্রয় নিয়েছ, সেটিকেও অস্থায়ী মনে করো। রণ তোমাদের সৈন্যবাহিনী ও তোমাদের শক্তিশালী হস্তি এবং অশ্ববাহিনী আমাদের হাত থেকে নিজেদেরই রক্ষা করতে পারেনি। আমাদের মোকাবেলায় কোন রণাঙ্গনে দাঁড়াতেই পারেনি। তোমার জন্য সবচেয়ে উত্তম হবে তুমি ইসলাম গ্রহণ করো তাহলে সসম্মানে জীবনযাপন করতে পারবে। তা যদি ইচ্ছা না করে তাহলে অন্তত আমাদের বশ্যতা স্বীকার করে নাও, তাহলেও তোমাকে আমরা বন্দি করব না। আমরা তোমাকে গোলাম বানাতে চাই না। এই অবস্থায়ও তুমি স্বপদে সসম্মানে বহাল থাকবে। তাতেও যদি রাজি না হও, তাহলে এমন এক লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকো, যে লড়াইয়ে তোমার পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। কারণ আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করি, তিনি অবশ্যই আমাদের বিজয়ী করবেন।
বিন কাসিমের প্রেরিত দূত পয়গাম নিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এলো। এসে সে বিন কাসিমকে জানালো, দুর্গফটকেই তার পথ রোধ করে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, কেন এসেছে সে? সে জানালো, রাজকুমার জয়সেনার জন্যে সিন্ধু শাসক মুসলিম সেনাপতি বিন কাসিমের পয়গাম নিয়ে এসেছি। তখন তাকে দুর্গশাসকের কাছে নিয়ে গেল। এই পয়গাম কি রাজকুমার ছাড়া আর কাউকে দিতে পারো? দূতকে জিজ্ঞেস করল দুর্গপতি। কারণ রাজকুমার এখানে নেই।
কারণ রাজা দাহিরের পর সেই তো তার একমাত্র স্থলাভিষিক্ত যে একটা সিদ্ধান্ত দিতে পারে।
জয়সেনাতো এখানে আসেনি। তবে আমি জানি তোমরা কি পয়গাম নিয়ে এসেছো? এর জবাব আমিই দেবো’ আমাকে পয়গামটি পড়ে শোনাও।
দূত ছিল সিন্ধু অঞ্চলের লোক। সে ছিল এক নওমুসলিম, স্থানীয় ভাষায় সে যখন পয়গামের বক্তব্য বলল, তখন দুর্গপতি একটা অট্ট হাসি দিয়ে বলল, আমি জানতাম তোমার সেনাপতি এটাই লিখবে। তোমাদের সেনাপতির দেমাগ নষ্ট হয়ে গেছে। শুনেছি, ও নাকি একেবারেই বাচ্চা মানুষ। ওর বোঝা
দরকার, রাজা দাহির মারা গেলেও আমরা সবাই মরে যাইনি। শুধু জয়সেনাই লড়াই করবে না। জয়সেনা যদি মুসলমানও হয়ে যায় তবে তাকে আর ঠেকাবে কে? কিন্ত ওর কথায় তো আর সবাই মুসলমান হয়ে যাবে না। জয়সেনা এখন পলাতক। তোমার সেনাপতিকে গিয়ে বললো, তার খুব ইচ্ছে হলে সে যেন আসে এবং দুর্গ দখল করে নেয়। আমাদের সেনাপতি তো আসবেনই। তবে তোমাদের মনে রাখা উচিত, সাধারণ সৈনিকদের গণহত্যার দায় দায়িত্ব তোমাকেই বহণ করতে হবে। দূত যখন বিন কাসিমকে দুর্গশাসকের ভাষায় তার জবাব শোনাচ্ছিল, ঠিক তখনই ব্রাহ্মণাবাদ থেকে বিন কাসিমের এক গোয়েন্দা এসে জানাল, জয়সেনা কয়েক দিন ব্রাহ্মণাবাদে ছিল। সেখানে থেকে সে সেনাবাহিনীকে নতুন করে তৈরী করল। পালিয়ে আসা বিচ্ছিন্ন সৈন্যদেরকে নতুন ভাবে সংগঠিত করে ব্রাহ্মণাবাদ ত্যাগ করে চেনসারের দিকে চলে গেছে। ওহ্, সে সহযোগীদের একত্রিত করছে? বললেন বিন কাসিম। আমরা আর ওকে পাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করবো না।
ব্রাহ্মণাবাদে প্রায় ৪০ হাজার হিন্দু সৈন্য ছিল। তাদেরকে জঠিল প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অদম্য করে তোলা হয় এবং কঠিন যুদ্ধের মোকাবেলায় বিজয় ছিনিয়ে আনার মতো মনোবলের অধিকারী করা হয়। বিন কাসিম সবকিছু বুঝে শুনে বাহ্মণাবাদ যুদ্ধের জন্য তার রণকৌশলে পরিবর্তন আনলেন। তিনি দুর্গ অবরোধের পরিবর্তে দুর্গের কাছাকাছি গিয়ে তাবু ফেলে তারুর চারপাশে খাল খনন করলেন এবং দুজন সৈন্যকে দুর্গ ফটকের কাছে গিয়ে ঘোষণা করার নির্দেশ দিলেন ‘দুর্গ আমাদের হাতে ছেড়ে দাও, অন্যথায় আমরা যদি লড়াই করে দুর্গ দখল করি, তাহলে কাউকে প্রাণভিক্ষা দেয়া হবে না।’
ঘোষণাকারীরা দুর্গফটকের কাছাকাছি গিয়ে কয়েকবার ঘোষণা করল কিন্তু তাদের জবাবে কারো কণ্ঠ শোনা গেল না, বরং তাদের প্রতি কয়েকটি তীর ছুটে এলো। ফলে কোন মৌখিক জবাব না পেয়ে ঘোষণাকারীরা ফিরে এলো।
সেদিনটি ছিল ৯৪ হিজরী মোতাবেক ৭১৩ খ্রিস্টাব্দের পহেলা রজব, সোমবার। হঠাৎ দুর্গফটক খুলে গেল। বাধভাঙা পানির মতো হিন্দু সৈন্যরা দুর্গ থেকে বেরিয়ে এলো। সেনাবাহিনীর অগ্রভাগে ছিল দশবারো জনের
একটি বাদক দল। তারা প্রশিক্ষিত সৈন্যদের মতোই শৃঙ্খলা বজায় রেখে দ্রুতগতিতে এসে মুসলিম যোদ্ধাদের ওপর হামলে পড়ল। আক্রমণ ছিল খুবই তীব্র। হঠাৎ অপ্রত্যাশিত তীব্র আক্রমণে মুসলিম বাহিনীর রক্ষণভাগ ভেঙে পড়ল। ব্রাহ্মণাবাদে এতোটা তীব্র আক্রমণের মুখোমুখি হবে এটা মোটেও ভাবেনি মুসলিম বাহিনী।
বিন কাসিম এই আক্রমণ সামলে নিলেন বটে তবে ততোক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। লড়াই চলাকালে সারাক্ষণই হিন্দুবাহিনীর বাদক দল বিরামহীনভাবে ঢোল পেটাচ্ছিল আর তাতে হিন্দু সৈন্যদের রণ-উদ্দীপনা যেন আরো উজ্জীবিত হচ্ছিল। সন্ধ্যা নেমে আসার সাথে সাথে হিন্দুবাহিনী দুর্গে ফিরে গেল। তাদের ফিরে যাওয়াও ছিল বেশ কৌশলী। ধীরে ধীরে পিছিয়ে গিয়ে তারা দুর্গের ভিতরে চলে গেল। মুসলমানরা যখন হিন্দু সৈন্যদের তাড়া করে অগ্রসর হলো, তখন দুর্গের কাছাকাছি যেতেই দুর্গপ্রাচীরে থেকে মুসলমান যোদ্ধাদের প্রতি তীব্র তীরবৃষ্টি ধেয়ে এলো। ফলে আর অগ্রসর না হয়ে মুসলিম যোদ্ধারা তাদের তাঁবুতে ফিরে এলো।
