কোন কোন ঐতিহাসিক লিখেছেন, ডাভেল দুর্গ জয়ের পর দাহিরের হাতে যেসব আরব বন্দি ছিল সবাইকে মুক্ত করে বিন কাসিম তাৎক্ষণিক ভাবে আরব পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কিন্তু সব বন্দি ডাভেল দুর্গে ছিল না। কিছু বন্দি উরুটে মন্ত্রী সিয়াকরের তত্ত্বাবধানে ছিল। যাদের সম্পর্কে এর আগে বিন কাসিমের কাছে কোন তথ্য ছিল না। সিয়াকর তার বিশ্বস্ততা জোরদার করার জন্যে তার আওতাধীন আরব বন্দীদের সাথে নিয়ে এলো এবং বিন কাসিমের উদ্দেশে বলল, মহান সেনাপতি! আমার বিশ্বস্ততার প্রমাণ হিসাবে আমি এদেরকে মুক্ত করে নিয়ে এসেছি। এরাও সেই আরবদের সাথেই বন্দি হয়েছিল কিন্তু ডাভেল দুর্গে না রেখে এদেরকে উরুঢ়ে রাখা হয়েছিল। সিয়াকরের নিয়ে আসা বন্দীদের সবাই ছিল নারী। কিন্তু এরা সবাই ছিল বয়স্কা এবং পরিশ্রমী। দেখেই মনে হলো এরা আরব বংশোদ্ভূত নয়। প্রকৃতপক্ষে যেসব মুসলমান শ্রীলংকা থেকে হজ করার উদ্দেশে আরব রওয়ানা হয়েছিল এসব নারী ছিল তাদের সেবিকা। এরা আরব বনিকদের সেবাদাসী ছিল। আরবদের সংস্পর্শে গিয়ে এরা ইসলাম গ্রহণ করেছিল। বিন কাসিম এদেরকে পরখ করার জন্য আরবীতে নানা কথা জিজ্ঞেস করলে তারা আরবীতে জবাব দিলো। বিন কাসিম তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের সাথে বন্দি অবস্থায় ওরা কেমন আচরণ করেছে। তারা জানালো, আমরা আগের মালিকের যে সব কাজ করতাম এদের কাছে গেলে তারাও আমাদের দিয়ে অনুরূপ কাজ করিয়েছে। আমরা ঘরদোর ঝাড়ু দিতাম, কাপড়
পরিষ্কার করতাম। ওদের বেঁচে যাওয়া খাবারগুলো আমাদের খেতে হতো। আলাদা ভাবে আমাদেরকে তেমন কোন খাবার দেয়া হতো না।
বিন কাসিম এদের সাথে কথা বলে বুঝতে পারলেন, এরা বংশানুক্রমে দাস গোষ্ঠীজাত, বন্দিত্বে এদের মালিক বদল হয়েছে মাত্র। মূলত তাদের জীবনের খুব একটা ছন্দপতন ঘটেনি। এরা শুধু অতটুকুই বুঝতে পেরেছিল, তাদের আগের মালিকরা ছিল মুসলমান, আর এরা হিন্দু।
অবশেষে বিন কাসিম সিয়াকরকে জিজ্ঞেস করলেন, কি কারণে তোমার মধ্যে আমাদের আনুগত্য করার বাসনা জাগলো?
এখন আমি স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ পেয়েছি। এর আগে আমি রাজার উজির ছিলাম বটে কিন্তু পুরো পরিবার পরিজনসহ রাজার বন্দিত্বে ছিলাম। আমি রাজাকে পরামর্শ দিতাম বটে কিন্তু তখন আমাকে ভাবতে হতে কোন ধরনের কথা রাজা প্রছন্দ করবে। রাজা দাহির যখন মুসলমানদের জাহাজ লুট ও তাদের বন্দি করার চিন্তা করল, তখন আমি বলেছিলাম, এমনিতেই সিন্ধুর প্রতি আরবদের দৃষ্টি রয়েছে। তাছাড়া মাকরানের একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ আরবদের হাতে। এমতাবস্থায় কোনভাবেই আরবদের ক্ষিপ্ত করা ঠিক হবেনা। কিন্তু রাজা আমার পরামর্শ মানল না। এরপর যখন একাধারে দুজন আরব সেনাপতিকে হত্যা করে আরব বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করল, তাতে তার দেমাগ আরো বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা এবং নিরঙ্কুশ করার জন্য সে অপর এক প্রভাবশালী উজির বুদ্ধিমানের পরামর্শে নিজের আপন বোনকে পর্যন্ত স্ত্রী করে রাখল।
তোমাদের ধর্মীয় গুরুরা কি রাজাকে সতর্ক করেনি যে, কোন ধর্মেই আপন বোনকে ভাই স্ত্রী করে রাখতে পারে না? সিয়াকরকে জিজ্ঞেস করলেন বিন কাসিম। ধর্মীয় গুরুজন! রহস্যজনক অবজ্ঞাময় হাসি দিয়ে বলল সিয়াকর। ধর্মীয় গুরুরা তো রাজার সন্তুষ্টি লাভকেই ধর্ম মনে করে। আর রাজার নিজের কাছে ধর্মের চেয়ে ক্ষমতা ও রাজপাট বেশি প্রিয় ছিল। পুরোহিত যখন রাজাকে বলল, মহারাজ। আপনার ভবিষ্যত ভগ্নিপতি আপনার কাছ থেকে রাজ্যপাট ছিনিয়ে নেবে। তখন উজির বুদ্ধিমান পরামর্শ দিলো, মহারাজ! আপনিই বোনকে স্ত্রী বানিয়ে ফেলুন, তা হলে আর ভগ্নিপতি অস্তিত্বেই আসবে না। পরিহাসের ব্যাপার হলো, যেসব পুরোহিত রাজাকে তার আপন বোন বিয়ে করতে প্ররোচিত করেছিল, তারাই আমাকে বলেছিল,
জানি না রাজার এই পাপের অভিশাপ রাজদরবার ও প্রজাদেরও ভোগ করতে হয় কি না। আসলে এই পাপের অভিশাপ সবাইকে ঠিকই ভোগ করতে হলো। আমার দুর্ভাগ্য হলো, আমি সেই অভিশপ্ত রাজার উজির হয়ে রইলাম। কিন্তু মনে মনে আমি আশঙ্কা বোধ করছিলাম এই পাপের শাস্তি আমাকেও না হয় ভোগ করতে হবে। আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে আমি আপনার কাছে এসেছি। আপনি যদি আমাকে গ্রহণ করেন, তাহলে আমি আপনার সাথেই থাকবো।
এক আরব সর্দার হারেস আলাফীও তো রাজার দরবারে থাকত। সে এখন দাহিরের ছেলে জয়সেনার সাথে রয়েছে, বলল সিয়াকর।
সে কেমন লোক? সিয়াকরকে জিজ্ঞেস করলেন বিন কাসিম। কার প্রতি সে মনেপ্রাণে অনুগত?
সে আসলে দুমুখো। আমি জানি, সে আপনাকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে, কিন্তু রাজা দাহিরের প্রতিও সে ঠিক ততোটাই বিশ্বস্ত। অবশ্য আমি একথা নিদ্বিধায় বলতে পারি, সে আরব শাসকদের প্রতি বিদ্রোহী কিন্তু ইসলামের প্রতি অনুগত। রাজা দাহির তাকে বহু ধরনের লোভ দেখিয়েছে, কিন্তু সে প্রকান্তরে বুঝিয়ে দিয়েছে আরবদের বিরুদ্ধে কিছুতেই অস্ত্র ধারণ করবে না সে। একপর্যায়ে রাজা দাহির তাকে হুমকি দিলো, রাজা ইচ্ছা করলে তাদেরকে তার এলাকা থেকে তাড়িয়ে দিতে পারে। এর জবাবে সে রাজা দাহিরেকে বলেছিল, মাকরানে আশ্রয় প্রাপ্ত আরবদেরকে যদি রাজা এখান থেকে চলে যেতে বলে তাহলে এরা আরব বাহিনীর শক্তিশালী সহযোগীতে পরিণত হবে। তখন তারা রাজধানীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে ওঠবে। বিন কাসিম এতোটা আনাড়ি ও অদূরদর্শী ছিলেন না যে, শত্রুবাহিনীর এক উজিরের কথায় তাকে আপন কোলে আশ্রয় দিয়ে দেবেন। তিনি দৃশ্যত সিয়াকরকে গ্রহণ করলেন এবং প্রকাশ্যে নির্দেশ দিলেন, তাকে রাজদরবারে যে মর্যাদা দেয়া হতো এখানেও সেই ধরনের মর্যাদায় রাখা হোক। আপরদিকে গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফীকে বললেন, এর ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা দরকার, যাতে এর আসল উদ্দেশ্য আন্দাজ করা যায়।
