বিন কাসিম যখন দুর্গপ্রাচীরের চতুর্দিক দেখছিলেন, তখন তার দিকে তাক করে শত্রুরা একটি তীর ছুড়লো। তীরটি বিন কাসিমের অবস্থান থেকে খানিকটা দূরে এসে মাটিতে পড়ল।
শত্রুবাহিনীর তীর দেখে মুসলিম সৈন্যরাও তীর ছুড়তে শুরু করল। শুরু হলো উভয় দিক থেকে তীরবৃষ্টি। এখানকার সৈন্যরাও রাওয়ার সৈন্যদের কৌশল অবলম্বল করল। হঠাৎ দুর্গফটক খুলে ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে আবার দুর্গে ফিরে গেল।
এই দুর্গের ভিতরে পাথর নিক্ষেপ ও অগ্নিতীর কোন ফল বয়ে আনার সম্ভাবনা ছিল না। কারণ এখানকার বসবাসকারী সাধারণ লোকজন দুর্গ ছেড়ে চলে গিয়েছিল। দৃশ্যত দুর্গ ছিল লোকশুন্য। প্রশিক্ষিত সৈন্য ছাড়া আর লোকজন তেমন ছিল না। তাছাড়া রাওয়া দুর্গের ক্ষয়ক্ষতির কথা শুনে এখানকার সৈন্যরা তাদের সব সামরিক সরঞ্জাম দুর্গপ্রাচীর থেকে দূরে রেখেছিল। বিন কাসিম পূর্বেকার সবকৌশলই পরীক্ষা করলেন কিন্তু কোনটিই তেমন ফলোদয় হলো না। অবশেষে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, শত্রুবাহিনী যখন ঝটিকা আক্রমণে বের হবে তখন এদেরকে ঘেরাও করে হত্যা করতে হবে। এই পদ্ধতিতে কিছুটা কাজ হলো। শত্রু বাহিনীর জনবল কমতে শুরু করল। হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকল। একপর্যায়ে তিনি দুর্গফটকের ওপর পাথর নিক্ষেপের নির্দেশ দিলেন। এতেও কিছুটা কাজ হলো।
ফটক খুবই মজবুত ছিল, পাথর নিক্ষেপে তা ভাঙ্গা সম্ভব ছিল না কিন্তু হিন্দু সৈন্যরা তাতে ভীত বিহ্বল হতে লাগল। কারণ তাদের মনোবল এমনিতেই ভঙ্গুর ছিল। শত্রু সৈন্যদের বিপর্যয় ঘটানোর জন্য বিন কাসিম নতুন কৌশল গ্রহণ করলেন। তিনি তার সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন, এখন থেকে তীরন্দাজ ইউনিট দুর্গফটকের অপেক্ষাকৃত কাছাকাছি অবস্থান করবে, শত্রু সৈন্যরা যখনই দুর্গফটক খুলে বের হবে তখনই ওদের ওপর তুমুল তীরবৃষ্টি শুরু করবে। বিন কাসিমের এই কৌশলও কিছুটা কার্যকর প্রমাণিত হলো। কিন্তু সব ধরনের কৌশল অবলম্বন করার পরও দু’মাস পর্যন্ত অবরোধ বহাল রাখতে হলো। দু’মাসের টানা অবরোধে শত্রু সৈন্যরা জনবল হারিয়ে যেমন দুর্বল হয়ে পড়েছিল তদরূপ সরঞ্জামাদির সাপ্লাই না থাকায় তারা নানা দুর্ভোগের শিকার হয়েছিল। অবশেষে একদিন দুর্গফটক খুলে একটি মৌনমিছিল বের হতে দেখা গেল। মিছিলের সবার পরনে সাদা পোশাক এবং সবাই পদব্রজে
আরব-কন্যার আর্তনাদ অস্ত্রহীন। সবার শরীর থেকে আতরের ঘ্রাণ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। মিছিলটি গুণগুণিয়ে কি যেন জপমালা পাঠ করতে করতে মুসলিম সৈন্যদের অতিক্রম করে এগিয়ে গেল। একটু পরেই দেখা গেল দুর্গফটক খালি, দুর্গপ্রাচীরের কোথাও কোন সৈন্য নেই। দুর্গের সৈন্যরা যখন দেখল মুসলিম বাহিনীর মোকাবেলা করার মতো কোন শক্তি আর তাদের অবশিষ্ট নেই, তখন তারা অস্ত্রশস্ত্র ফেলে দিয়ে শোক মিছিল সহকারে নিরস্ত্র অবস্থায় দুর্গ ত্যাগ করে চলে গেল। করল নীরব আত্মসমর্পণ। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। তারা কোন লোকালয় বা দুর্গের দিকে না গিয়ে বিজন মরুভূমির পথে চলে গেল। বিন কাসিম তাঁর সৈন্যদের নিয়ে দুর্গে প্রবেশ করলেন। তারা শত্রুসৈন্যদের রেখে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র একত্রিত করলেন। দুর্গের ভিতরে কিছুসংখ্যক বেসামরিক লোক ছিল। তাদের বলা হলো, তোমরা তোমাদের আত্মীয় স্বজনদের দুর্গে ফিরে আসার জন্য খবর দাও। নাবাহ বিন হারুনকে বিন কাসিম দাহলিলা দুর্গের প্রশাসক নিযুক্ত করলেন এবং এখানেই অবস্থান নিলেন।
বিন কাসিম দাহলিলা দুর্গ থেকে হিন্দুস্তানের বিভিন্ন রাজা মহারাজাদের কাছে পয়গাম পাঠালেন। পয়গামে তিনি হিন্দু রাজা মহারাজাদেরকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলেন। এই দাওয়াত ছিল সৌজন্যমূলক। তাতে কোন ধরনের হুমকি ছিল না। পয়গামে তিনি ইসলামের আদর্শিক সৌন্দর্যের কথা লিখলেন এবং ইসলামের মৌলিক ভিত্তিগুলোর বর্ণনা দিলেন। তিনি আরো লিখলেন, এপর্যন্ত যেসব এলাকা আমরা জয় করেছি, সেগুলোর অধিবাসীদের খোঁজ নিয়ে দেখুন, তারাই ইসলামের সৌন্দর্যের কথা বলতে পারবে। দাহলিলা দুর্গে চারজন অপরিচিত ব্যক্তি এসে বিন কাসিমের সাথে সাক্ষাত করার আগ্রহ প্রকাশ করল। তাদেরকে বিন কাসিমের কাছে সরাসরি না
নিয়ে আগে গোয়েন্দা প্রধান শাবান ছাকাফীর কাছে উপস্থিত করা হলো। এটা ছিল গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফীর নির্দেশ। যেকোন অজ্ঞাত পরিচয় লোক এলে যাতে বিন কাসিমের কাছে সরাসরি যেতে দেয়া না হয়। কারণ তাতে তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। কোন শত্রুর চর তার ওপর অতর্কিতে আত্মঘাতি আক্রমণ করে বসতে পারে। বিন কাসিমের নিরাপত্তার
প্রশ্নে প্রহরীদের প্রতি এমর্মে কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন গোয়েন্দা প্রধান। লোক চারজন এসে বিন কাসিমকে জানালো, তারা রাজা দাহিরের এক মন্ত্রী সিয়াকর এর পক্ষ থেকে এসেছে। সিয়াকর একান্তই বিন কাসিমের বশ্যতা স্বীকার করে তার সংস্পর্শে থাকতে আগ্রহী। তবে ইসলাম গ্রহণ করা না করার ব্যাপারে সে স্বাধীন থাকতে চায়।
সিয়াকর ছিল রাজা দাহিরের মন্ত্রী সভার মধ্যে সবচেয়ে যোগ্য ও জ্ঞানী উজির। শাবান ছাকাফীও বিন কাসিমকে সিয়াকরের জ্ঞান বুদ্ধি সম্পর্কে আগেই অবহিত করেছিল। সিয়াকরের আনুগত্য স্বীকার করে নেয়ার সংবাদে উভয়েই খুব খুশি হলেন। বিন কাসিম আগত চার দূতকে ক্ষমামূলক পয়গাম দিয়ে তাদের বিদায় করলেন। ওদের চলে যাওয়ার কয়েক দিন পর সিয়াকর নিজে বিন কাসিমের দরবারে হাজির হলেন।
