অস্বাভাবিক অগ্নিকাণ্ড দুর্গবাসীদেরকে কোন দিকে তাকানোর অবকাশ দিলো না। সাধারণ লোকদের সাথে সৈন্যরাও আগুন নেভাতেই ব্যস্তছিল। লোকজন নিজেদের জরুরী আসবাবপত্র টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিল। এমতাবস্থায় মুসলিম সৈন্যরা হামলে পড়ল। মুসলিম যোদ্ধারা ঢুকে কয়েকজন সবচেয়ে কাছের ফটকের দিকে দৌড়ে গেল। সেখানে মাত্র কয়েকজন হিন্দু সেনা ফটক পাহারায় লিপ্ত ছিল। তারা মুসলিম যোদ্ধাদের কিছুতেই মোকাবেলা করতে পারল না। কারণ তারা যখন দেখল দুর্গের ভেতর থেকে মুসলিম সৈন্যরা তাদের ওপর আক্রমণ করছে, তখন তারা ভয়ে জড়সড় হয়ে গেল। প্রধান ফটক খুলে দেয়াটাই যথেষ্ট ছিল। এর মধ্যে ভোরের আলো বিকশিত হওয়ার আগেই হাজার হাজার সৈন্য দুর্গে প্রবেশ করল। বিন কাসিম
নিজেও তখন সৈন্যদের সাথে দুর্গে প্রবেশ করলেন। তিনি তার একান্ত বার্তাবাহকদের নির্দেশ দিলেন, সবাইকে বলে দাও কোন বেসামরিক নাগরিকের ওপর যেন আক্রমণ না করা হয়। সেই সাথে তিনি নির্দেশ দেন, কোন নারী ও শিশুর ওপর যেন হাত উঠানো না হয়। তাদেরকে যেন পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া হয়।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, দুর্গের সৈন্যরা ছিল সত্যিকার অর্থেই লড়াকু, তারা বিপদ আসন্ন দেখে মৃত্যুপণ করে মোকাবেলা করল। কিন্তু সকল মুসলিম সৈন্য তখন দুর্গে প্রবেশ করে প্রবল বিক্রমে হিন্দুদের ওপর হামলে পড়েছে। ফলে অল্পক্ষণের মধ্যে ষোল হাজার হিন্দু সৈন্যের মধ্যে মাত্র কিছু সংখ্যককে পাকড়াও করা গেল, আর বাকীরা নিহত হলো। কিছুসংখ্যক সৈন্য পালিয়ে যেতেও সক্ষম হলো।
দুর্গ জয় হলো বটে কিন্তু বিন কাসিম ও মুসলিম সৈন্যদের অবস্থা এমন হলো যে, ক্লান্তি ও অবসন্নতায় তাদের আর চলার শক্তি ছিল না। প্রায় দু’মাস চলে গিয়েছিল এই দুর্গের নিয়ন্ত্রণ কব্জা করতে, এতো কষ্টকর দুর্গজয়ের পরও বিন কাসিমের পক্ষে দীর্ঘ বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ ছিল না। কারণ তখনো তার সামনে অজেয় দাহলিলা ও ব্রাহ্মণাবাদ দুর্গ। যেখানে শত্রুবাহিনী শক্তি সঞ্চয় করছিল বলে তাঁর কাছে খবর পৌছে গিয়েছিল। বিন কাসিম আশঙ্কা করছিলেন এই দুর্গ থেকে পালিয়ে যাওয়া হিন্দু সৈন্যরা দাহলিলা দুর্গের শক্তি বৃদ্ধি করবে। নয়তো দাহলিলা দুর্গকে খালি করে সকল হিন্দু ব্রাহ্মণাবাদ দুর্গে গিয়ে জড় হয়ে বিশাল শক্তিসঞ্চয় করবে। এই আশঙ্কা বোধ করে সৈন্যদেরকে দীর্ঘ বিশ্রামের অবকাশ না দিয়ে বিন কাসিম দাহলিলা দুর্গের দিকে অগ্রাভিযানের নির্দেশ দিলেন, যাতে ওখানে গিয়ে সৈন্যরা প্রস্তুতি নেয়ার আগেই তিনি দুর্গ কব্জা করতে পারেন। অবশ্য অগ্রাভিযানের অর্থ এই ছিল না যে, পরদিনই তিনি রাওয়া দুর্গ ত্যাগ করেছিলেন। এখানকার প্রশাসনিক অবস্থা পুনর্বহাল করতে তার কয়েক দিন লেগে গেল। প্রায় সপ্তাহখানিক সময় তাঁর এই দুর্গের পরিস্থিতি সামলাতেই চলে গেল। রাওয়া দুর্গ থেকে রওয়ানা হতেই দুই গোয়েন্দা এসে বিন কাসিমকে খবর দিলো, দাহলিলা দুর্গে তেমন কোন বেসামরিক লোক নেই। ভয়ে সব
বেসামরিক লোক চলে গেছে নয়তো সৈন্যরাই তাদেরকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে। এখানে শুধু সৈন্যরা অবস্থান করছে। এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া লোকেরা ওখানে গিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। ওরা বলেছে, বাঁচতে চাইলে দুর্গ ছেড়ে পালাও মুসলিম বাহিনী আসছে। দুর্গে থাকলে পুড়ে মরতে হবে। এখানে অগ্নিতীর ও মিনজানিক থেকে ছুড়া পাথরের আতঙ্ক এরা এমনভাবে ছড়িয়েছে যে, বেসামরিক লোকজন ঘরবাড়ি ছেড়ে লোকজন নিয়ে দুর্গ থেকে চলে গেছে। এখান থেকে যেসব সৈন্য পালিয়ে গেছে, ওরা কি দাহলিলা দুর্গে উঠেছে? গোয়েন্দাদের কাছে জানতে চাইলেন বিন কাসিম। ওরা পরস্পর কি বলাবলি করে? তোমরা কি ওদের কথাবার্তা শুনতে পেরেছ? এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া সৈন্যরা বেসামরিক লোকদের চেয়ে বেশি আতঙ্কিত, বলল গোয়েন্দা। কিন্তু সৈনিক হওয়ার কারণে ওরা পাল্টা লড়াই করতেই ওখানে থেকে গেছে। কিন্তু আমাদের ধারণা, ওরা দাহলিলা থেকেই সবার আগে পালানোর চেষ্টা করবে। ওরা যে ভাষায় এই দুর্গের হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দিয়েছে, তাতে সৈন্যদের মধ্যেও যে আতঙ্ক ভর করেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
গোয়েন্দাদের কথা থেকে বোঝা যাচ্ছিল, দাহলিলার সৈন্যরা অনেকটাই। ভীতু কিন্তু বিন কাসিম দাহলিলা দুর্গ অবরোধের পর বুঝতে পারলেন আসলে যতটা ভীতু মনে করা হয়েছিল, এখানকার সৈন্যরা ঠিক ততোটা ভীতু নয়। দুর্গ আমাদের কব্জায় দিয়ে দাও; তোমরা তো রাওয়া দুর্গের অবস্থা জানো’ ঘোষক দিয়ে প্রচার করালেন বিন কাসিম।
যারা পালিয়ে যাওয়ার তারা এখান থেকে চলে গেছে। পাথর ফেলো, আগুন লাগাও, দুর্গ জ্বালিয়ে দাও। কিন্তু দুর্গফটক খোলা হবে না। জবাব আসলো দুর্গপ্রাচীর থেকে।
আমরা যদি দুর্গ জয় করি, তাহলে কিন্তু কারো জীবন রক্ষা পাবে না? হুমকি দিলেন বিন কাসিম। আমাদের একটি সৈন্য জীবিত থাকতেও তোমরা দুর্গের দখল নিতে পারবে না, জবাব এলো দুর্গপ্রাচীর থেকে। বিন কাসিম চতুর্দিক প্রদক্ষিণ করে দুর্গপ্রাচীর নিরীক্ষণ করলেন, সেই সাথে তার নিজের সৈন্যদের অবস্থানও দেখে নিলেন, তারা ঠিকমতো যথাস্থানে অবস্থান নিতে পেরেছে কি-না।
