জীবিত ও আহত শত্রু সেনাদেরকে গোয়েন্দা প্রধানের কাছে নেয়া হলো। তিনি শত্রুসেনাদের প্রত্যেককেই ভিন্ন ভিন্ন ভাবে জিজ্ঞেস করলেন। গতরাতে দুর্গের ভিতরে কেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং এই আক্রমণ সম্পর্কে দুর্গবাসীরা কি বলাবলি করছে? মৃত্যুভয়ে শত্রুসৈন্যদের অনেকেই দুর্গের প্রকৃত অবস্থা বলে দিল। পাথর বর্ষণে কয়েকটি দালান বাড়ির ছাদ ধসে গিয়েছিল। ফৌজী আস্তাবলে পাথর পতিত হওয়ায় ডজন খানিক ঘোড়ার মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বেশি আশাপ্রদ ঘটনা ছিল দুর্গবন্দি শহরবাসী পাথর ও অগ্নিবাহী তীর নিক্ষেপে মারাত্মকভাবে ভয় পেয়ে গেছে। ভয়ে লোকজন ঘরের বাইরে খোলা আকাশের নীচে রাত্রি যাপন করতে শুরু করে। সাধারণ লোকজনের মধ্যে মারাত্মক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সৈন্যও অগ্নিতীর এবং পাথর নিক্ষেপে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।
গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী তাদের জিজ্ঞেস করলেন, সেনাদের রসদপত্র ও সাজসরঞ্জাম কোথায় রাখা হয়েছে? তারা কয়েকটি সেনা ছাউনীর কথা বলল। এও জানালো, কোথায় সৈন্যদের রসদপত্র রাখা হয় এবং দুর্গপ্রাচীরে থেকে এগুলোর দূরত্বের কথাও তারা জানিয়ে দিলো ওদের কাছ থেকে রিপোর্ট নিয়ে গোয়েন্দা প্রধান বিন কাসিমকে জানালেন, আজ রাতে এসব স্থানে পাথর ও অগ্নিতীর নিক্ষেপ করতে হবে।
সূর্য ডুবে গেল। গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে গেল রাত। রুটিন মতো মুসলমান তীরন্দাজ ও মিনজানিক ইউনিট দুর্গপ্রাচীরের দিকে অগ্রসর হতে লাগল। হিন্দু বন্দীদের থেকে উদ্ধারকৃত তথ্য মতে লক্ষ বস্তুতে আঘাত হানতে মিনজানিকগুলো তীরন্দাজদের সুবিধা মতো জায়গায় দাঁড় করানো হলো। দুর্গের অধিবাসীরা যাতে নিরাপদ মনে করে ঘরে ঘরে ঘুমিয়ে পড়ে এজন্য তীর ও পাথর নিক্ষেপ অর্ধরাতের পর করার সিদ্ধান্ত হলো। ঘুমন্ত অবস্থায় নিক্ষিপ্ত পাথর ও অগ্নিতীরে আতঙ্কিত মানুষ ঘাবড়ে গিয়ে দিগ্বিদিক ছুটাছুটি শুরু করে দেবে এবং প্রতিরোধের কথা চিন্তা করার অবকাশ পাবে না। এ ধরনের হুলস্থুল কাণ্ড মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়, পরিস্থিতি বেশামাল হয়ে পড়ে। মাঝরাতের পর সবগুলো মিনজানিক থেকে একই সাথে পাথর নিক্ষিপ্ত হলো, সেই সাথে অগ্নিবাহী তীরগুলো শুরু করল অগ্নিবর্ষণ। কিছুক্ষণ পর
দ্বিতীয় বার একই সাথে মিনজানিকগুলো পাথর নিক্ষেপ করল। এবার দুর্গের ভিতরকার লোকজনের চিৎকার চেচামেচি হই হুল্লোড় এতোটাই প্রকট শোনা গেল যেন দুর্গের সব লোক দুর্গপ্রাচীরের ওপরে উঠে চিৎকার করছে। দুর্গের এপাশ থেকেও দেখা গেল নিক্ষিপ্ত পাথরের আঘাতে বাড়িঘর ধ্বসে পড়ার শব্দ। বিন কাসিম এদিক থেকে ঠিকই অনুমান করলেন এ মুহূর্তে শহরে কোন পর্যায়ে হই হুল্লোড় শুরু হয়েছে। প্রাচীরের এ পাশ থেকে দেখা গেল বিশাল কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উড়ছে। আগুনের শিখা এতোটাই ওপড়ে উঠে গেল যে, দুর্গের সবটাই আলোকিত হয়ে গেল। দুর্গের আগুনের আলো দুর্গের বাইরেও আলোকিত করে ফেলল। এই অগ্নিকাণ্ড ঘটলো দুর্গপ্রাচীরের কাছেই সৈন্যদের ঘোড়ার খাবার হিসাবে সংরক্ষিত ঘাসের স্তুপে অগ্নি সংযোগের কারণে। মুসলিম তীরন্দাজদের ছোড়া অগ্নিতীর হিন্দু সৈন্যদের সংরক্ষিত পশু খাদ্যে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে জ্বলে ওঠে আগুন। গোটা এলাকা গ্রাস করে ফেলে আগুনের কুণ্ডলী। এসময় দুর্গপ্রাচীরের ওপরে দাঁড়ানো হিন্দু প্রহরীদের দেখে মনে হচ্ছিল যেন একেকটি জীবন্ত ভূত।
ইবনে কাসিম! এরা আগুন নেভাতে গিয়ে দুর্গের গোটা পানিই খরচ করে ফেলবে। দেখবেন পানির অভাবে তৃষ্ণায় কাতর হয়ে ওরা আগামীকালের মধ্যে আত্মসমর্পন করতে দুর্গের ফটক খুলে দেবে, বিন কাসিমের কাছে এসে বললেন, এক জ্যৈষ্ঠ সেনাপতি। হু, দুর্গে আপনার মতো এমন বুদ্ধিমান সেনাপতির অভাব নেই। আমরা। এতোদূর পর্যন্ত এসে অনায়াসে দুর্গেরপর দুর্গ জয় করেছি কিন্তু এই দুর্গটি দখলে নিতে কঠিন বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। আপনি কি দেখেননি, এরা কতো শক্তিশালী মোকাবেলা করছে? বললেন বিন কাসিম। আপনি ভেবেছেন, এখানে পানি স্বল্পতা দেখা দেবে কিন্তু এটা ভাবতে পারেননি, এরা আগুন। নেভাতে পানির বদলে বালু ব্যবহার করবে। কারণ এখানে বালুর কোন অভাব নেই। আগুন নেভাতে পানির চেয়ে বালু আরো বেশি কার্যকর।
তবুও দেখবেন আগামী সন্ধ্যার মধ্যে আমরা দুর্গে প্রবেশ করবো, বললেন সেনাপতি। বলুন এখুনি দুর্গে প্রবেশ করবো আমি। আগামীকাল পর্যন্ত বেচে থাকার কোন নিশ্চয়তা কি আপনার কাছে আছে? তিনি একান্ত এক সংবাদবাহককে বললেন, প্রাচীর গর্তকারী ইউনিটকে এখুনি আসতে বল।
বিন কাসিম দেখতে পাচ্ছিলেন, দুর্গের ভিতরে মারাত্মক হাঙ্গামা শুরু হয়ে গেছে। দুর্গপ্রাচীরের ওপর কোন সৈন্যকেই আর দেখা যাচ্ছে না। প্রাচীর ছিদ্রকারী ইউনিট এলে বিন কাসিম নিজে তাদেরকে নিয়ে দুর্গপ্রাচীরের কাছে চলে গেলেন। প্রাচীর গাত্রে হাত রেখে একটি জায়গা দেখিয়ে বললেন, এই জায়গায় ছিদ্র করার চেষ্টা কর। এতটুকু ছিদ্র করবে, যাতে দু’জন পদাতিক সৈন্য নির্বিঘ্নে ঢুকতে পারে।
সৈন্যরা প্রাণপণে দুর্গপ্রাচীর ভাংতে শুরু করল। বিন কাসিম দুর্গপ্রাচীর থেকে দূরে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং সেনাপতিদের ডেকে বললেন, আমার কিছুসংখ্যক জীবন ত্যাগী পদাতিক দরকার, ভেতরের ভয়াবহ হৈ হুল্লোড়ের সুযোগে যারা দুর্গপ্রাচীরের ছিদ্র দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবে। এ দিকে সৈন্যরা বিপুল উদ্যোমে প্রাচীর ভাংতে শুরু করল। সূর্য ওঠার আগেই দুর্গপ্রাচীরে এমন ছিদ্র করে ফেলল, যা দিয়ে দু’জন বিশালদেহী মানুষও অনায়াসে আসা-যাওয়া করতে পারবে। প্রাচীর ভেদ করে দুর্গে প্রবেশের জন্যে নির্বাচিত সৈন্যরা নির্দেশের অপেক্ষায় ছিল। তন্মধ্যে সবার অগ্রগামী ছিল বসরার অধিবাসী হারুন বিন জাফর, আর দ্বিতীয়জনের নাম আবুল কাসেম। এই দুজনের পরেই যারা দুর্গেরপ্রবেশ করলো এদের মধ্যে কয়েকজন ছিল মুকুর সৈন্য। আগেই বলা হয়েছে, রাওয়া যুদ্ধ থেকেই মুকু তার দলবল নিয়ে বিন কাসিমের সাথেই ছিল এবং সমতালে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করছিল। এবার দুর্গে প্রবেশের জন্য মুকুর সৈন্যদল থেকে কয়েকজনকে নির্বাচন করা হলো।
