দৃশ্যত পরিস্থিতি এমন মনে হচ্ছিল যে, মুসলিম সৈন্যরা এবার ওদের কচুকাটা করে দুর্গে প্রবেশ করবে। বিন কাসিম সহযোদ্ধাদের উৎসাহিত করতে একেবারে কাছে চলে গিয়েছিলেন। এমন সময় হঠাৎ একটি তীর এসে বিন কাসিমের ঘোড়ার জিনে বিদ্ধ হলো। অবস্থা এমন যে তার জীবন মৃত্যুর মাঝে মাত্র কয়েক চুল ব্যবধান ছিল। এই অবস্থা মুসলিম শিবিরের এক অশ্বারোহী দেখে ফেলল। বিন কাসিম তার দিকে ছোড়া তীরটি জিন থেকে তুলে ফেলে দেয়ারও প্রয়োজন বোধ করলেন না। তিনি একে কোন গুরুত্বই দিলেন না। তিনি বরং বিপুল উৎসাহে সহযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করার জন্যে চিৎকার করে তাদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন।
যে আরব যোদ্ধা বিন কাসিমের জিনে তীর বিদ্ধ হতে দেখেছিল, কাল বিলম্ব না করে সে বিন কাসিমের দিকে ঘোড়া হাঁকাল। সে এসে বলল, সম্মানিত প্রধান সেনাপতি! আপনি এখান থেকে চলে যান। আল্লাহ না করুন, আপনি না থাকলে আমাদের সবকিছুই নাই হয়ে যাবে।
যাও এখান থেকে, নিজের জায়গায় চলে যাও। সেই যোদ্ধাকে ধমক লাগালেন বিন কাসিম। কিন্তু সেই আরব যোদ্ধা প্রধান সেনাপতির ধমকি হুমকিকে কোন পরওয়া না করে, থাবা দিয়ে বিন কাসিমের ঘোড়ার লাগাম ধরে তাঁর ঘোড়া দৌড়িয়ে দিল। বিন কাসিম চিৎকার করলেন কিন্তু সেই
সহযোদ্ধা তার চিৎকারে থামল না। তাঁর ঘোড়াকে টেনে অনেকটা দূরে নিয়ে গেল যেখানে তীর বিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা নেই।
ইবনে কাসিম! আপনার মূল্য অনেক। আমার মতো হাজারো আরব মারা গেলে কিছু হবে না। এই অশ্বারোহী বিন কাসিমকে পুনর্বার কিছু বলার অবকাশ না দিয়েই লড়াইয়ের দিকে অশ্ব হাকাল। ঠিক সেই সময় একটি তীর এসে তার পাজরের নীচে বিদ্ধ হলো। যোদ্ধাটি তীর বিদ্ধ হয়ে ঘোড়া থেকে এক পাশে ঝুকে পড়তে শুরু করল, বিন কাসিম তা দেখে বিজলীর মতো গিয়ে তাকে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করলেন এবং তার ঘোড়াটিকেও বিন কাসিম নিজের ঘোড়ার পিছনে আটকে ফেললেন।
আপনি জীবিত থাকুন বিন কাসিম! আপনি বেঁচে থাকলে বিজয় আমাদের অনিবার্য। একথা বলতেই যোদ্ধার মাথা বিন কাসিমের ঘাড়ে নেতিয়ে পড়ল। বিন কাসিম তাকে ধরাধরি করে ঘোড়া থেকে নামানোর জন্য আর দু’জনকে ডাক দিলেন। অপর দিকে হিন্দু বাহিনীর চোখের সামনে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল। তাদের মনে হচ্ছিল এবার আর রক্ষা নেই, মুসলিম বাহিনী দুর্গে ঢুকে পড়বে। ভয় পেয়ে বিপুল সংখ্যক হিন্দুযোদ্ধাকে দুর্গের বাইর রেখেই তারা দুর্গফটক বন্ধ করে ফেলল। দুর্গে ফেরার পথ বন্ধ হতে দেখে হিন্দু সৈন্যদের মন ভেঙে গেল। আর এই সুযোগে আরব যোদ্ধারা ওদেরকে কচুকাটা করল।
বিন কাসিমকে তার কোন এক সেনাপতি পরামর্শ দিলেন, লড়াই না করে অবরোধ দীর্ঘায়িত করা হোক যাতে কষ্ট যাতনায় অতীষ্ট হয়ে দুর্গবাসীরা সৈন্যদেরকে অস্ত্র সমর্পনে বাধ্য করে। সেই যুগে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাসের পর মাস দুর্গ অবরোধ করে রেখে শত্রুদের আত্মসমর্পনে বাধ্য করা হতো। এমন ছিল যে, টানা দু’বছর পর্যন্তও অবরোধ ছিল। ফলে শেষ পর্যন্ত দুর্গপতি আত্মসমর্পন করে প্রথমেই বলতো, যা আছে আমাদের আগে কিছু খাবার দাও। না, তা হতে পারে না, প্রস্তাব প্রত্যাখান করলেন বিন কাসিম। আমার হাতে এতো সময় নেই। আমাদের লক্ষ্য বহু দূর। অথচ জীবনের কোন নিশ্চয়তা নেই। তাছাড়া আমি শত্রুদের এ ধারণা করার সুযোগ দিতে চাই না
যে, আমরা তাদের শক্তিকে ভয় পেয়ে দূরে বসে আছি। এখন থেকে রাতেও লড়াই অব্যাহত থাকবে।
সকল সেনাপতি ডেপুটি সেনাপতি ও কমান্ডারদেরকে ডাকলেন বিন কাসিম। তিনি গোটা বাহিনী ও অফিসারদের দু’ভাগে ভাগ করলেন। নির্দেশ দিলেন, এক অংশ দিনের কার্যক্রম চালু রাখবে এবং অপর অংশ রাতের বেলায় অগ্ৰিতীর ও মিনজানিক চালাবে। পর দিন থেকে নতুন নিয়মে লড়াই শুরু হল। দিনের বেলায় উভয় দিক থেকে তীর নিক্ষিপ্ত হতো, দেয়াল ভাঙার ইউনিট দেয়াল গাত্রে ছিদ্র করার চেষ্টা চালাতো, আবার কখনো শত্রুপক্ষের কোন ইউনিট বেরিয়ে এসে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে আবার দুর্গে চলে যেত। এটা ছিল গতানুগতিক রীতি। কিন্তু একরাতে হঠাৎ দুর্গের ওপর থেকে আগুন পড়তে শুরু করল আর দুর্গের। ভিতরে ভারী পাথর আঘাত হানতে শুরু করল। অগ্নিতীর নিক্ষেপের প্রথম রাতেই এই সাফল্য দেখা গেল যে দুর্গের ভিতর থেকে আগুনের কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেল। তাতে বুঝা গেল ঘরবাড়ি জ্বলছে। একপর্যায়ে বিন কাসিম অগ্নিতীর ও পাথর নিক্ষেপ বন্ধ করিয়ে দিলেন, কারণ জ্বালানী ও পাথর তাকে খুবই কার্যকর ভাবে ব্যবহার করতে হবে। কারণ সিন্ধু অঞ্চলের এ জায়গাটা বালুময় এখানে কোন পাথর নেই।
জ্বালানী সংকটও তীব্র। অতএব পাথর ও জ্বালানীর ব্যবহার সঠিক ভাবে করা হলে তার বাহিনীকেই জরুরী এই দুটি পণ্যের জন্যে বিপদে পড়তে হবে। পরদিন সকল বেলায় সৈনিকদের পালা বদল হলো। দিনের ডিউটি করার জন্য সৈন্যরা রাতের সৈন্যদের স্থলাভিষিক হল। গোয়েন্দা প্রধান শাবান ছাকাফী সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন, আজ যদি শত্রুবাহিনী ঝটিকা অভিযান চালায় তবে ওদের দু’চারজনকে জীবিত পাকড়াও করার চেষ্টা করবে।
সেদিনের দ্বিপ্রহরের পর একটির বদলে একসাথে দুর্গের তিনটি ফটক খুলে গেল। এসব ফটকের একটি দিয়ে পদাতিক এবং অপর দুটি দিয়ে অশ্বারোহী সৈন্যরা দ্রুত বেরিয়ে জোরদার ঝটিকা আক্রমণ চালালো কিন্তু মুসলমানরা যেহেতু পূর্ব থেকেই জীবিত শত্রুসেনা পাকড়াও করতে প্রস্তুত ছিল, তাই তারা পূর্ণ সতর্কতায় এ ভাবে মোকাবেলা করল যে, তিন শত্রু সৈন্যকে তারা পাকড়াও করে ফেলল এবং কয়েকজন আহত সৈন্যকে ফেলে রেখেই বাকীরা দুর্গে ফিরে গেল।
