হিন্দু সৈন্যদের আক্রমণ ছিল তীব্র এবং সুশৃঙ্খল। আকষ্মিক আক্রমণে মুসলমানরা কাবু হয়ে গেল। প্রতিরোধের আয়োজন করার আগেই ওরা তাদের লক্ষ্য পূর্ণ করে দুর্গে ফিরে যেতে শুরু করল।
এই আকস্মিক আক্রমণের ফলে বিন কাসিমকে তার রণকৌশল এবং চিন্তা-ভাবনাকে ঢেলে সাজাতে হলো। তিনি সকল সৈন্যকে পিছনে সরিয়ে আনলেন। তখন পর্যন্ত হিন্দুদের আক্রমণে শাহাদাত বরণকারী যোদ্ধাদের লাশ তাদের সামনে পড়ে রয়েছে এবং যেসব যোদ্ধা মারাত্মক ভাবে আহত হয়ে ওঠার মতো শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল তারা ময়দানে পড়ে পড়ে কষ্টযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। দিন শেষে রাতের বেলায় নিহত ও আহত সহযোদ্ধাদের উঠিয়ে আনা হলো। পরদিন বিন কাসিম কোন ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিলেন না। আহত ও নিহতদের সেবা শুশ্রুষা দাফন কাফনেই দিন চলে গেল। দিন শেষে সকল সেনাপতি ও কমান্ডারদের ডেকে বিন কাসিম তাদের সাথে পরামর্শ করে নতুন সমরকৌশল গ্রহণ করলেন। সকল মুসলিম কমান্ডারই বুঝতে পেরেছিল, এই দুর্গ জয় করার ব্যাপারটি সহজসাধ্য হবে না।
তৃতীয় দিন বিন কাসিম তীরন্দাজ ও দুর্গ ভেদকারী সৈন্যদের এক জায়গায় জমা করলেন। বিন কাসিম তীরন্দাজকে নির্দেশ দিলেন, ডানে বামে এবং দেয়ালের ওপরে এ ভাবে তীর নিক্ষেপ করবে যাতে দেয়ালের ওপরের কোন শত্রু সৈন্য মাথা ওপরে উঠাতে না পারে? তীরন্দাজরা তীর বর্ষণ শুরু করতেই বিন কাসিম প্রশিক্ষিত দেয়াল ছিদ্রকারীদের দৌড়ালেন। তারা দেয়ালে গাত্রে আঘাত করতে শুরু করল। কয়েক আঘাত করার পরই দেখা গেল দেয়াল খুব শক্ত নয়, পাথর ও মাটি দিয়ে তৈরি। আঘাত করতেই পাথর দেয়াল গাত্র থেকে খসে পড়তে শুরু করল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর বোঝা গেল দুর্গপ্রাচীরটিকে যতোটা নরম ভাবা হয়েছিল আসলে ততোটা নরম নয়। দেয়ালের গড়ন প্যাছানো বাকানো। তাছাড়া দেয়ালটির নীচের অংশ খুবই পুরু। তাতে ভাঙন ধরানো মানে রীতিমতো পাহাড়ে সুড়ঙ্গ তৈরি করা।
দুর্গপ্রাচীর ভাঙার কাজে যে পরিমাণ আরব যোদ্ধা অংশ গ্রহণ করেছিল, তারা নির্বিঘ্নে কাজ করলে তাদের পক্ষে দুর্গপ্রাচীরে গর্ত সৃষ্টি করা অসম্ভব ছিল না। কিন্তু প্রাচীরের কোণায় পাহারারত প্রহরীদের প্রতি তীর নিক্ষেপ না করতে পারায় তারা মুসলিম যোদ্ধাদের দেয়াল ভাঙার অভিযান দেখে ফেলল। তারা দুর্গপ্রাচীরের ওপর থেকে বড় বড় পাথর ও গাছের কাণ্ড নীচে ফেলার ব্যবস্থা করল। সেই সাথে জ্বলন্ত কাঠের টুকরো নীচে গড়িয়ে দিল।
মুহুর্তের মধ্যে দুর্গপ্রাচীরের ওপর থেকে নীচের সৈন্যদের উদ্দেশ্যে বড় বড় পাথর গাছের কাণ্ড ও জ্বলন্ত কাঠ ফেলতে শুরু করলে দেয়াল গাত্রে ধাক্কা খেয়ে পাথর কাঠ নীচে গড়িয়ে পড়তে শুরু করল।
হিন্দু সৈন্যদের এই ব্যবস্থা মুসলমানদের জন্যে মুসীবত বয়ে আনল। ওপর থেকে পতিত পাথর ও জ্বলন্ত কাঠে বেশ কজন মুসলিম সৈন্য ঝলসে গেল এবং শরীর থেতলে গেল। কয়েকজন সৈন্য মারাত্মক ভাবে পাথর চাপা পড়ে আহত হলো। মোট কথা, কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসাবে হিন্দুসৈন্যদের এই উদ্যোগ সফল হলো। অবশ্য হিন্দুদের এই ব্যবস্থা কার্যকর করতে গিয়ে তাদের বেশ কয়েকজন সৈন্য তীর বিদ্ধ হয়ে নিহত হলো। কিন্তু তাতেও প্রতিরোধ ব্যবস্থায় কোন ধরনের শৈথিল্য দেখা গেল না।
অবশেষে বিন কাসিমের দুর্গপ্রাচীর ভাঙ্গার কৌশলও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হল। ফলে এটা ত্যাগ করে বিন কাসিম দুর্গফটক ভাণ্ডার পরিকল্পনা করলেন। কিন্তু হিন্দু তীরন্দাজরা আরব সৈন্যদেরকে দুর্গফটকের ধারে কাছে ভীড়তেই দিচ্ছিল না। কয়েক ধরনের কৌশল অবলম্বন করলেন বিন কাসিম। কিন্তু কোন কৌশলই দুর্গফটক ভাঙার কাজে সফল হলো না। অপর দিকে হিন্দু সৈন্যরা দুর্গফটক দিয়ে হঠাৎ বের হয়ে ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে আবার দুর্গে ফিরে যাওয়ার কৌশলও অব্যাহত রাখল। অবশেষে বিন কাসিম বুঝতে পারলেন, আমরা যেমন রাতের বেলায় ঝটিকা আক্রমণ করে পালিয়ে যাই হিন্দু সৈন্যরাও অবরোধ ভাঙার জন্য এই ঝটিকা ব্যবস্থাই গ্রহণ করছে।
শত্রুদের এই ব্যবস্থা ব্যর্থ করার জন্য বিন কাসিম চিন্তা করলেন, হিন্দু সৈন্যরা যখন দুর্গ থেকে বের হয়ে ঝটিকা আক্রমণে অগ্রসর হবে তখন আমরা ওদেরকে ঘেরাও এর মধ্যে ফেলে কুপকাত করব।
এই চিন্তার তিন দিন পর পুনরায় হিন্দু সৈন্যরা দুর্গ থেকে বেরিয়ে মুসলিম সৈন্যদের উপর আক্রমণে অগ্রসর হলো। তখন মুসলিম সৈন্যরা পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ডানে-বামে অগ্রসর হয়ে হিন্দু সৈন্যদেরকে ঘেরাও করে ফেলল। এই ঘেরাও করতে গিয়ে মুসলিম যোদ্ধারা দুর্গফটক ও প্রাচীরের একেবারে কাছে চলে গিয়েছিল, ফলে তাদের দিকে দুর্গপ্রাচীর থেকে তীর বৃষ্টির
পাশাপাশি পাথর নিক্ষিপ্ত হতে শুরু করল। এমতাবস্থায় হিন্দু অশ্বারোহীরা অশ্বহাঁকিয়ে মুসলিম যোদ্ধাদের মাড়িয়েই আবার দুর্গে ঢুকে পড়ল। এবার বিন কাসিম বিরাট ত্যাগ স্বীকারের প্রস্তুতি নিলেন। তিনি কয়েকজন জীবন ত্যাগী যোদ্ধাকে দুর্গফটকের কাছাকাছি অবস্থান নেয়ার নির্দেশ দিলেন। এবার দুদিন পর হিন্দু সৈন্যরা দুর্গ থেকে বের হলো। এদিকে ওদের বের হতে দেখেই মুসলিম যোদ্ধারা ঘোড়া হাঁকাল। এবার উভয় দলের মধ্য শুরু হলো মুখোমুখি সংঘর্ষ। মুসলিম যোদ্ধারা পূর্ব থেকে তরবারী ও বল্লম নিয়ে প্রস্তুত ছিল ফলে হিন্দু সৈন্যরা বের হতেই ওদের ওপর মুসলিম যোদ্ধারা হামলে পড়ল। যেহেতু মুসলিম সৈন্যরা ছিল দুর্গের বাইরে এজন্য তারা ডানে-বামে ইচ্ছামতো মোড় নিতে পারছিল কিন্তু হিন্দুদের সেই সুযোগ ছিল না, কারণ তারা এদিক সেদিক হতে চাইলেই প্রতিপক্ষের সহজ আক্রমনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা ছিল। ফলে এবার আরব সৈন্যরা ওদের কাবু করে রীতিমতো কচুকাটা করতে লাগল।
