তাদের প্রতিশোধ কি আমার ওপরে নেয়া হবে?
প্রতিশোধ যার ওপর নেয়ার দরকার ছিল তার ওপর নেয়া হয়েছে। তোমার ওপর কোন প্রতিশোধ নেয়া হবে না এবং তোমাকে যে কারো রক্ষিতা হয়ে থাকতে হবে না, বরং তুমি সসম্মানে মর্যাদাপূর্ণ মানুষের বেগম হয়ে থাকবে। তুমি যদি সিন্ধুতে থাকতে তাহলে লড়াইরত অবস্থায় জীবন বাঁচাতে গিয়ে না জানি কার হাত থেকে কার হাতে গিয়ে পড়তে। তখন হয়তো তোমাকে গণহারে ব্যবহার করা হতো, কিন্তু আমাদের যেসব যোদ্ধা সিন্ধুতে যুদ্ধ করছে, তাদের কারো বেলায় এমন একটা উদাহরণ কি দিতে পারবে যে, তারা বিজিত কোন এলাকার কোন একজন নাগরিকের ইজ্জত সম্ভ্রম দূরে থাক সহায় সম্পদ ও বাড়ি-ঘরে হামলা করেছে? তুমি কি শোননি, মুসলিম বিজয়ী সৈন্যরা নারীর সম্ভ্রমকে খুব বেশি মূল্য দিয়ে থাকে। তুমি কি আমাদের
তরুণ সেনাপতি বিন কাসিমকে দেখোনি। সে ইচ্ছা করলেই তো তাঁর রক্ষিতা হিসেবে তোমাকে রাখতে পারতো।
হ্যাঁ, তা সেই সেনাপতি করতে পারত বটে। কিন্তু এরপরও আমি ভয় পাচ্ছি, কে আমাকে বিয়ে করবে?
আমিও করতে পারি? কিন্তু এজন্য তোমাকে হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে কায়মনে ইসলাম গ্রহণ করতে হবে এবং মনে প্রাণে আমাকে গ্রহণ করতে হবে।
উপস্থিত এক লোক হঠাৎ বলে উঠল, খলিফাতুল মুসলিমীন! এই তরুণীকে বিয়ে করার আমার সাধ কি তাহলে পূরণ হবে না? একে আমি নিজের জন্যেই পছন্দ করেছিলাম কিন্তু তোমাকে বিমুখ করতে চাই না আমি। ঠিক আছে, তোমার সাথেই ওর বিয়ে হবে, বললেন খলিফা।
ইতিহাসে সেই ব্যক্তিকে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মালেক লেখা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস একথাটি পরিষ্কার করেনি কেন এই লোকটি এই তরুণীকে বিয়ে করতে আগ্রহী ছিল এবং কি ছিল তার পদবী ও পরিচয়। তাছাড়া খলিফাই বা কেন সেই লোকের সাধকে তার নিজের আকাক্ষার ওপর প্রাধান্য দিয়েছিলেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, দাহিরের ভাগ্নী ইসলাম গ্রহণ করলে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের সাথে বিয়ে হয়। দীর্ঘ দিন সে আব্দুল্লাহর সংসারে ছিল কিন্তু এর গর্ভজাত কোন সন্তানাদি হয়নি। এরপর খলিফা আব্দুল মালেকের মনোভাব সম্পূর্ণ বদলে গেল। তিনি সিন্ধু অভিযানের সার্বিক খোজ খবর নেন এবং সাহায্য সহযোগিতা করতে শুরু করেন। তিনি এই অস্বাভাবিক বিজয়ের জন্য হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাছে মোবারকবাদ পাঠিয়ে বলেন, আমার এই বার্তা বিন কাসিমকেও পৌছে দেবেন।
এদিকে দামেশকে রাজা দাহিরের ছিন্নমস্তকটি একটি বল্পমে বিদ্ধ করে সারা শহরে প্রদক্ষিণ করিয়ে আনা হলো। প্রদর্শন করানো হলো শহর জুড়ে।
হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কাব বিন মুখারিকের মাধ্যমে পুনরায় বিন কাসিমের কাছে পয়গাম পাঠালেন। পয়গামের শুরুতে তিনি বিন কাসিম কিভাবে অগ্রসর হবেন এজন্য তাঁকে দিক নির্দেশনা এবং উজ্জীবনীমূলক উপদেশ দিলেন। সেই সাথে পূর্বের মতোই তিনি বিন কাসিমকে তেলাওয়াত যিকির ও
ইবাদত বন্দেগীতে লিপ্ত থেকে আল্লাহর মদদ ও নুসরতের জন্যে কায়মনো বাক্যে প্রার্থনা করার উপদেশ দিলেন।
বিন কাসিম ততো দিনে রাওয়া দুর্গে প্রশাসক নিয়োগ করে সেখানকার প্রশাসনিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন কাজ সম্পন্ন করেছেন। এদিকে দুর্গের স্থাপত্য কাঠামো ও দুর্বলতা পর্যবেক্ষণ করার জন্য গোয়েন্দা প্রধান তার বেশ বদল করে দুর্গের চারপাশ ঘুরে দেখতে বের হলেন। শা’বান ছাকাফী স্থানীয় বহু লোককে গোয়েন্দা কাজে নিযুক্ত করেছিলেন। তাদের ঘুরে বেড়ানোতে কোন জটিলতা ছিল না। এরা স্থানীয় আশ্রয়প্রার্থী হিসাবে সারা দুর্গের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াতো। আবার সময় সময় দুর্গের বাইরেও চলে যেত। স্থানীয় অধিবাসী হওয়ায় তাদের কেউ সন্দেহের চোখে দেখার অবকাশ ছিল না।
উরুঢ় থেকে কিছু দুরে বাহ্মণবাদের পথে বাহরু নামের একটি দুর্গ ছিল। গোয়েন্দারা বিন কাসিমকে খবর দিলো, সেই দুর্গে প্রায় ষোল হাজার হিন্দু সৈন্য জমায়েত হয়েছে। বিন কাসিমের পরবর্তী টার্গেট ছিল ব্রাহ্মণাবাদ। তিনি এ দুর্গ এড়িয়ে ঘোর পথে ব্রাহ্মণাবাদ আক্রমণ করতে পারতেন কিন্তু এতো বিপুল বাহিনীর সমাগমকে এড়িয়ে যাওয়া ছিল সামরিক বিবেচেনায় মারাত্মক ভুল। ফলে এই দুর্গের সৈন্যদের পরাস্ত করা জরুরী হয়ে পড়ল। ৯৩ হিজরী সনের শাওয়াল মাসের শেষ সপ্তাহে বিন কাসিম রাওয়া দুর্গ থেকে রওয়ানা হলেন। বিন কাসিম ভেবে ছিলেন পূর্বের মতো তিনি হয়তো শত্রুবাহিনীর অজ্ঞাতে বাহরু পৌছে যাবেন। কিন্তু তার এই ধারণা ছিল ভুল। কারণ বাহরু দুর্গ অবরোধের সাথে সাথে সেখানকার নওজোয়ান সৈন্যরা তাঁর বাহিনীর ওপর প্রচণ্ড তীর বৃষ্টি নিক্ষেপ করতে শুরু করে।
মুসলমানরা যখন অবরোধে লিপ্ত ঠিক সেই সময় অভাবনীয় ভাবে শত্রু বাহিনীর পক্ষ থেকে তীর বৃষ্টি শুরু হয়। দৃশ্যত দুর্গপ্রাচীরে অবস্থান নেয়া সৈন্যদের দেখে মনে হচ্ছিল তারা আতঙ্কিত ভীত। আর দুর্গের ভিতরে লোকজনের অবস্থান আছে। বলেও মনে হচ্ছিল না। দুর্গপ্রাচীরের সৈন্যদের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল তারা মুসলিম সৈন্যদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করতে ভয় পাচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে মুসলিম সৈন্যরা দুর্গপ্রাচীরের একেবারে কাছে চলে গিয়ে ছিল। এই সুযোগে শত্রুসেনারা তাদের ওপর তীরের তুফান বয়ে দিল। ফলে বহু সংখ্যক মুসলিম যোদ্ধা তীরবিদ্ধ হয়ে পড়ল এবং অবরোধ চেষ্টা ভেঙে পড়ল। মুসলমানদের মধ্যে দেখা দিল বিশৃঙ্খলা। এই সুযোগে শত্রু সৈন্যরা দুর্গের প্রধান ফটক ও আরো একটি ফটক খুলে বিদ্যুৎ বেগে মুসলিম সৈন্যদের ওপর হামলে পড়ল।
