হাজ্জাজ তার মুখের কথা শেষ করতে পারলেন না, সমবেত জনতা চিল্কার করে বলতে শুরু করল, লাব্বাইকা লাব্বাইক! ইয়া হাজ্জাজ। লাব্বাইক! শত শত লোক দাঁড়িয়ে লাব্বাইক বলে চিৎকার করতে লাগল। বিন কাসিমকে সহযোগিতার জন্য সিন্ধু অভিযানে শরীক হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করল। হাজ্জাজ তার সেনা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিলেন, সক্ষম তরুণদের তালিকা তৈরি করে তাদের সামরিক ট্রেনিং শুরু করে দেয়া হোক। এরপর গণীমতের সম্পদ থেকে কানাকড়িও না রেখে পুরোটাই হাজ্জাজ দামেস্কে কেন্দ্রীয় খলিফা ওয়ালীদ বিন আব্দুল মালেকের কাছে পৌছানোর নির্দেশ দিলেন। গণীমতের সম্পদের সাথে বিশেষভাবে প্রেরিত দাহিরের ভাগ্নী হিন্দাকেও তিনি খলিফার উদ্দেশ্যে পাঠালেন। গণীমতের সম্পদের সাথে হাজ্জাজ খলিফা ওয়ালীদ বিন মালিকের নামে একটি পয়গামও পাঠালেন। হাজ্জাজ লিখলেন- “আমি জানি সিন্ধু অভিযানে আপনার ইচ্ছা ছিল না।
কিন্তু আমি আপনাকে এই অভিযানে সম্মত করিয়ে নিয়েছিলাম। আমি আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম সিন্ধু অভিযানের সম্পূর্ণ খরচের ব্যবস্থা আমি করবো এবং আপনাকে এই খরচের চেয়ে অনেক বেশি উপঢৌকন দেবো। আপনি ইতোমধ্যেই দেখেছেন, সিন্ধু থেকে এ পর্যন্ত কততবার গণীমতের সম্পদ এসেছে এবং একেকবার কি পরিমাণ সম্পদ ও সোনাদানা এসেছে। এ তো গেল ধন-সম্পদের কথা। এই ধনসম্পদ তো শুধু জাগতিক জাকজমক বজায় রাখে। কিন্তু আখেরাতের কথা চিন্তা করুন, সেখানে সোনাদানা, দিনার দিরহাম সৈন্য সামন্ত হাতি ঘোড়া কোন কাজে আসবে না। আমার কিশোর ভাতিজা ইসলামের অন্যতম দুশমন রাজা দাহিরকে শুধু পরাজিতই করেনি, মাখা ছিন্ন করে আপনার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। এটি
সেই অহংকারী মুশরিকের মাথা যে শুধু আল্লাহর একত্ববাদ ও রাসূল সাঃ-এর রিসালতকেই অস্বীকার করেনি, ইসলামকে দুনিয়ার বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের অপচেষ্টা করেছে। পরিশেষে হাজ্জাজ তার পয়গামে বিন কাসিমের একেরপর এক বিজয়ের কাহিনী বিস্তারিত লিখলেন। তিনি এও লিখলেন, সামনে বিন কাসিমের পরিকল্পনা কি এবং সে কোন্ দিকে অগ্রসর হবে।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, গণীমতের বিপুল সম্পদসহ বহু যুদ্ধবন্দিকে নিয়ে বিশাল কাফেলা যখন কুফা থেকে দামেশকে প্রবেশ করল, তখন কুফার মতো দামেশকের লোকজনও কাফেলাকে দেখার জন্যে রাস্তায় নেমে এলো। তারা বিজয়ের আনন্দে তাকবীর ধনী দেয়ার সাথে সাথে যুদ্ধবন্দীদের প্রতি তিরস্কার কটুক্তি করছিল। দামেশকের পথে পথে একই আওয়াজ ধ্বনীত হতে লাগল মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু রাজা দাহিরকে হত্যা করে বিজয়ী হয়েছে। সর্বক্ষেত্রে সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল বিন কাসিমের নাম। সবাই বিন কাসিমের অভাবনীয় সাফল্যে তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
এই বিজয়বার্তা দামেশকের অধিবাসীদের এতোটাই আবেগাপ্লুত ও উৎফুল্ল। করল যে, আনন্দিত লোকজন বিজয় উৎসবে মেতে উঠল। অনেকেই ডাক পেটাতে শুরু করল।
কিন্তু দামেশক জুড়ে এতো আনন্দ উচ্ছাসের মধ্যেও একজনের মনে এই বিজয় কোন প্রভাব সৃষ্টি করল না। উচ্ছ্বাসের বদলে তার চেহারা ছিল গম্ভীর। তার গাম্ভীর্য কখনো বিমর্ষতার রূপ ধারণ করছিল।
তার চেহারা দেখে যে কারো পক্ষে বলে দেয়া সম্ভব ছিল, বিন কাসিমের এই অভাবনীয় বিজয়ে যেন তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, বরং এই বিজয় তার জন্যে পীড়াদায়ক। বিমর্ষ এই লোকটি ছিল তৎকালীন খলিফার ভাই সুলায়মান বিন আব্দুল মালেক। সে কাফেলার যাত্রা পথে অনিহামাখা বিমর্ষ মনে দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। কা’ব বিন মুখারিক খলিফা ওয়ালীদ বিন মালেকের দরবারে উপস্থিত হলেন। দরবারে খালীফা ছাড়াও তার অন্যান্য আমত্যবর্গ উপস্থিত ছিলেন। কা’ব প্রথমেই খলিফার কাছে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের লিখিত পয়গাম পেশ করলেন। খলিফা কাবের হাত থেকে সেটি নিয়ে পড়তে শুরু করলেন। হাজ্জাজের পয়গাম যতোই পড়ছিলেন, তার চেহারা সন্তুষ্টিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠছিল। তিনি পয়গাম পড়ে কাবকে বললেন, বিস্তারিত আমি তোমার মুখে
পড়ে শুনবো। অতঃপর দরবার কক্ষ থেকে তিনি বাইরে বেরিয়ে এসে গনিমতের ধনসম্পদ ও যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যক্ষ করে গোটা ধনসম্পদ স্তরে স্তরে ভাগ করার নির্দেশ দিলেন। সবশেষে কাবকে বললেন, রাজা দাহিরের। ভাগ্নী কোথায়? তাকে হাজির করো। দাহিরের ভাগ্নীকে যখন খলিফা ওয়ালীদের সামনে হাজির করা হলো, দীর্ঘক্ষণ তিনি অপলক দৃষ্টিতে তরুণির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার চেহারায় এক ধরনের উৎফুল্লভাব ফুটে উঠল। খলিফার দৃষ্টি দেখে তরুণির দুচোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
খলিফা দুভাষীর মাধ্যমে তরুণির উদ্দেশ্যে বললেন, হে তরুণী! তোমার সৌভাগ্যকে তুমি এখনো অনুধাবন করতে পারোনি। যার ফলে তোমার চেহারায় এর কোন প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। তুমি যদি সিন্ধুতেই রয়ে যেতে তাহলে তোমার পরিণতি খুবই ভয়ানক হতো।
আমার এই বন্দিত্বের মধ্যে সৌভাগ্যের কি আছে মহারাজ? এটা কি কোন সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো? এখানে আমি যে কারো রক্ষিতা হয়ে থাকবো। নারীর জীবনে এর চেয়ে অবমানোকর আর কী আছে? আমি তো মুসলমানদের ব্যাপারে ভিন্নরকম গল্প শুনেছি। কিন্তু আপনি অসহায় এক ভাগ্য বিড়ম্বিতা মেয়ের দুর্ভাগ্য দেখে আনন্দবোধ করছেন? তুমি ভুল বুঝেছো তরুণী! তোমার মামা দাহির যেভাবে আমাদের অসহায় নারী শিশুদেরকে কয়েদখানায় বন্দী করে রেখেছিল, আমি তোমাকে সেভাবে বন্দী করে রাখবো না।
