আপনি এই বিজয়ের সুসংবাদ যাদের জানাবেন, তাদেরকে আমার সালাম জানাবেন এবং আমাদের অব্যাহত বিজয়ের জন্য দোয়া করতে বলবেন।
৯৩ হিজরী মোতাবেক ৭১২ খ্রিস্টাব্দের শাওয়াল মাসে বিন কাসিম হাজ্জাজের কাছে এই পয়গাম ও গণীমতের সম্পদ পাঠিয়েছিলেন।
এদিকে যখন আল্লাহর মদদ ও নুসরতের জন্য আবেদন করা হচ্ছিল ওদিকে জয়সেনা তখন হিন্দুস্তানের রাজা মহারাজাদের কাছে সহযোগিতা ও সাহায্যের জন্য দূত পাঠাচ্ছিল। দাহিরপুত্র জয়সেনা হিন্দুস্তানের সব রাজা মহারাজার কাছে তার সাহায্যের জন্য দূত পাঠাল। সবাইকে জয়সেনা লিখল, তার পিতা ইসলামের অগ্রাভিযান রুখতে জীবন উৎসর্গ করেছে। জানা গেছে, আরব বাহিনীর সেনাপতি তার মাথা কেটে আরব পাঠিয়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, আরব সেনাপতি স্বর্গবাসী রাজার এক কুমারী ভাগ্নিকেও আরব পাঠিয়ে দিয়েছে। সে কয়েকজন পুরোহিতকেও হত্যা করেছে। এখনও যদি এই তুফান রুখে দিতে আমরা ঐক্যবদ্ধ না হই তাহলে আপনাদের সবার মাথাও আরব পৌছবে। সেই সাথে আপনাদের কুমারী কন্যারাও আরবদের দাসী হবে। আর আবহমান কাল থেকে চলে আসা আমাদের দেবদেবীদের সত্য ধর্মের পূজা অর্চনা চিরদিনের জন্য ভারতের মাটি থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
জয়সেনার পয়গাম ছিল খুবই উত্তেজনা ও প্ররোচনাদায়ক। অন্যান্য রাজাদের কাছে পয়গাম পাঠানোর পাশাপাশি সে তার জ্ঞাতি ভাই গোপীর কাছেও পয়গাম পাঠাল। গোপী ছিল রাওয়া দুর্গের শাসক। দুর্গ মুসলিম বাহিনীর কব্জায় চলে যাওয়ার পর গোপীও সেখান থেকে অন্যত্র পালিয়ে যায়। জয়সেনা তার এক ভাতিজা বীরসেনাকেও পয়গাম পাঠাল। বীরসেনা ছিল বাটিয়া দুর্গের শাসক। আপন ও আত্মীয় সম্পর্ক যাদের সাথে ছিল জয়সেনা সকল শাসকদের কাছে পয়গাম পাঠাল। আপন আত্মীয়রা তার ডাকে সাড়া দিলেও অনাত্মীয় অনেক শাসক জয়সেনার ডাকে সাড়া না দিয়ে তার সহযোগিতায় না এসে বরং রাওয়া দুর্গে গিয়ে বিন কাসিমের কাছে আত্মসমর্পণ করল। বাহরার ও দাহলিলা দুর্গের শাসকরা একসাথে মিলিত হয়ে জয়সেনার পরাজয়ের জবাবে লিখল, আরব বাহিনী আমাদের খুব কাছে পৌঁছে গেছে। এমতাবস্থায় দুর্গ খালি রেখে সেনাবাহিনী নিয়ে আপনার সাহায্যে বাইরে যাওয়া যৌক্তিক মনে হয় না। এরচেয়ে আমরা দুর্গের ভিতরে থেকে অবরোধ দীর্ঘায়িত এবং দুর্গের বাইরে আরব বাহিনীকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করব। সেই সাথে আমরা ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে আরব বাহিনীর জনবল হ্রাসের চেষ্টা করব যাতে ব্রাহ্মণাবাদ পৌছার আগে আরব বাহিনীর জনবল কমে যায়।
গনীমতের সম্পদ এবং যুদ্ধবন্দীদেরকে নিয়ে বিন কাসিমের পাঠানো কাফেলার প্রধান কাব বিন মুখারিক যখন কুফায় প্রবেশ করলেন, তখন মানুষ মুখে মুখে সিন্ধু বিজয়ের খবর শুনে দৌড়ে রাস্তায় নেমে এলো। সিন্ধু বিজয়ের জন্য বিজয়ী বাহিনীকে মোবারকবাদ এবং তাকবীর ধ্বনী দিতে লাগল। ফিরে আসা আরব সৈন্যদের কাছে দৌড়ে এলো নারীরাও।
তারা পরম আনন্দে তাদের আপনজনদের খোঁজখবর জিজ্ঞেস করছিল গণীমতের কাফেলায় ফিরে আসা যোদ্ধাদের কাছে। হাজ্জাজ তখন কুফায় অবস্থান করছিলেন। গনীমতের সম্পদ রাজধানী দামেশক পাঠানোর রীতি থাকলেও এগুলো হাজ্জাজের কাছেই আগে পৌছানোর নির্দেশ ছিল। কারণ সিন্ধু অভিযান ছিল হাজ্জাজের একান্ত উদ্যোগের ফসল। কেন্দ্রীয় খলিফা এই অভিযানে মোটেও আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু হাজ্জাজের দৃঢ়তার মুখে কেন্দ্রীয় খলিফার তা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা ছিল না। বাইরে অসংখ্য মানুষের শোরগোল শুনে দ্বাররক্ষীর কাছে হাজ্জাজ শোরগোলের কারণ জানতে চাইলে দ্বাররক্ষী জানালো, সিন্ধু থেকে গণীমতের সম্পদ ও বিপুল যুদ্ধবন্দি নিয়ে বিশাল কাফেলা এসেছে। একথা শোনামাত্র হাজ্জাজ দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন এবং একটি ঘোড়ায় চেপে কাফেলাকে অভ্যর্থনা জানাতে নিজেই এগিয়ে গেলেন। আবেগের আতিশয্যে তিনি কাফেলার নেতা কাব বিন মুখারিককে জড়িয়ে ধরলেন।
কাফেলা শহরে প্রবেশ করতেই তিনি সারা শহর জুড়ে ঘোষণা করিয়ে দিলেন, সকল মানুষকে কেন্দ্রীয় মসজিদে জমায়েত হতে বলল। নামাযের পর সবাইকে সিন্ধু বিজয়ের বিস্তারিত খবর জানানো হবে।
তখন যোহরের ওয়াক্ত ছিল। কুফার ছোট বড় সকল লোক জামে মসজিদে জমায়েত হলো। নামায শেষে হাজ্জাজের নির্দেশে রাজা দাহিরের ছিন্নমস্তক একটি বল্পমে বিদ্ধ করে তার হাতে দেয়া হলো। হাজ্জাজ নিজে বল্লম উঁচু করে রাজা দাহিরের ছিন্নমস্তক উপস্থিত সবাইকে দেখালেন। হাজ্জাজ সমবেত জনতার উদ্দেশে বললেন, হে কুফাবাসী! এই ছিন্নমস্তক সেই দাম্ভিক ও অপরাধী বেঈমানের, যে আমাদের নারী শিশু ও হজযাত্রীদেরকে ধরে নিয়ে ডাভেলের কারাগারে বন্দি করে রেখেছিল। সে এতোটাই হিংস্র ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে, আমাদের কোন কথাই সে শুনতে রাজি ছিল না। সে নাকি মুসলমানদের নিঃশ্চিহ্ন করে কাবা শরীফকেও মূর্তীর মন্দিরে পরিণত করার স্বপ্নে বিভোর ছিল। আজ এই দাম্ভিকের ছিন্ন মাথা তোমরা দেখো। হে
কুফাবাসী! মুহাম্মদ বিন কাসিম ও মুজাহিদীনের জন্য দোয়া করতে থাকো। এই বিজয় তোমাদের দোয়া ও ত্যাগের ফসল। হে কুফার নওজোয়ানরা! তোমরা কি জানো, আমাদের যোদ্ধাদের অভিযান চূড়ান্ত করতে তাদের আরো সহযোগিতার প্রয়োজন। তোমরা কি তাদের সহযোগিতা করতে আগ্রহী নও? আমরা যদি সময়মতো তাদের সহযোগিতায় সাড়া না দেই, তাহলে এই বিজয়ের পরও তাদের মন ভেঙে যাবে। আমার বিশ্বাস, বিশাল বিজয়ের পর শুধু সহযোগিতার অভাবে চুড়ান্ত বিজয়ের পথে তারা ব্যর্থ হয়ে যাক তা কোন মানুষই ভাবতে পারে না। তোমরা জানো একাধারে যুদ্ধ করতে করতে তাদের লোকবলও অনেক কমে গেছে এবং অনেকেই ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে পড়েছে।
